পাকিস্তানের সাবেক আইএসআই প্রধানের ১৪ বছরের কারাদণ্ড

পাকিস্তানের সাবেক আইএসআই প্রধানের ১৪ বছরের কারাদণ্ড
সিটিজেন-ডেস্ক

পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সাবেক প্রধান ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামিদকে ১৪ বছরের কঠোর কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির সামরিক আদালত।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর জনসংযোগ শাখা আইএসপিআর বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানায়, আর্মি অ্যাক্ট অনুযায়ী ১৫ মাসব্যাপী বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এই রায় ঘোষণা করা হয়েছে। গত বছরের ১২ আগস্ট ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্শালের কার্যক্রম শুরু হয়।
ইমরান খানের শাসনামলে ফয়েজ হামিদ আইএসআই মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগ আনা হয়— রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা, রাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট লঙ্ঘন, সরকারি ক্ষমতা ও সম্পদের অপব্যবহার এবং সাধারণ নাগরিকদের ক্ষতিসাধন। আইএসপিআর জানিয়েছে, প্রতিটি অভিযোগেই তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
পাকিস্তানে এই প্রথম কোনো সাবেক আইএসআই প্রধানকে কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি হতে হলো। সেনাবাহিনী বলেছে, বিচার প্রক্রিয়ায় সব আইনি নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে এবং ফয়েজ হামিদ তার পছন্দের আইনজীবীর সহায়তা পেয়েছেন। রায়ের বিরুদ্ধে তিনি সংশ্লিষ্ট ফোরামে আপিল করতে পারবেন।
তবে বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি এবং কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে তার সম্ভাব্য ‘যোগসাজশ’ সংক্রান্ত বিষয় এখনো তদন্তাধীন। এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি সেনাবাহিনী। ২০২৩ সালের ৯ মে পিটিআই আন্দোলনের সময় সহিংসতার ঘটনায়ও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ রায় নিয়ে ফয়েজ হামিদের আইনজীবী দল এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতা তারার বলেছেন, 'দীর্ঘ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই রায় দেওয়া হয়েছে। যিনি সীমা ছাড়িয়েছিলেন, আজ তিনি তার শাস্তি পেয়েছেন।'
টপ সিটি মামলার পটভূমি
ফয়েজ হামিদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আসে ইসলামাবাদের টপ সিটি হাউজিং সোসাইটির মালিক মুইজ আহমেদ খানের করা এক আবেদনের মাধ্যমে। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে তিনি সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে দাবি করেন, ২০১৭ সালের ১২ মে আইএসআই সদস্যরা সন্ত্রাসবাদ– সংক্রান্ত একটি মামলার অজুহাতে তার অফিস ও বাসায় অভিযান চালান। অভিযানের সময় বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ, হীরা, নগদ অর্থসহ মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া হয়।
আবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, ফয়েজ হামিদের ভাই সরদার নাজাফ মধ্যস্থতা করেন এবং এক পর্যায়ে ফয়েজ হামিদ নিজে মুইজ আহমেদ খানকে আশ্বস্ত করেন যে জব্দ হওয়া স্বর্ণ ও কিছু জিনিস ফিরিয়ে দেওয়া হবে, তবে নগদ অর্থ নয়। অভিযুক্ত অবসরপ্রাপ্ত দুই ব্রিগেডিয়ার— নাঈম ফখর ও গফফার তার কাছ থেকে জোরপূর্বক চার কোটি রুপি আদায় এবং একটি বেসরকারি চ্যানেল স্পনসর করতে বাধ্য করেন।
প্রধান বিচারপতি কাজী ফায়েজ ঈসার নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ আবেদনটি শুনে আবেদনকারীকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট ফোরামে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। ওই নির্দেশের পর ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে সেনাবাহিনী এক মেজর জেনারেলের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে।
শুনানিতে আরেকটি তথ্য আলোচনায় আসে— সুপ্রিম কোর্টের মানবাধিকার সেলের একটি পুরনো মামলা নিষ্পত্তির নথি সাবেক প্রধান বিচারপতি সাকিব নিসারের নির্দেশে নষ্ট করা হয়েছিল। বেঞ্চ এ ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করে জানায়, হাউজিং সোসাইটির মতো মামলার চেম্বারে শুনানি সাংবিধানিক নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আদালত আরও মত দেয়, মুইজ আহমেদ খান চাইলে ফয়েজ হামিদ ও সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি আদালতে মামলা করতে পারবেন।
তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া
অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ইনাম–উর–রহিম জানান, কোর্ট অব ইনকোয়ারি মূলত তদন্ত কমিটির মতো একটি প্রক্রিয়া, যেটির সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে কোর্ট মার্শাল শুরু হয়। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অভিযোগ উঠলে সেক্টর কমান্ডার ইনকোয়ারির নির্দেশ দেন।
কোর্ট মার্শালের কার্যক্রম পরিচালনা করেন একজন কর্মরত লেফটেন্যান্ট জেনারেল। তার সঙ্গে থাকেন দুই সদস্য এবং জাজ অ্যাডভোকেট জেনারেল শাখার একজন কর্মকর্তা। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চার্জশিট দেওয়া হয়। তিনি নিজের পছন্দের আইনজীবী রাখতে পারেন এবং সাক্ষী হাজিরের অধিকারও থাকে। কোর্ট অব ইনকোয়ারিতে সংগৃহীত প্রমাণও আদালতে গ্রহণ করা হয়।
আর্মি অ্যাক্ট অনুযায়ী, অবসরের ছয় মাস পর কোনো সেনা কর্মকর্তাকে সাধারণ অপরাধে কোর্ট মার্শাল করা যায় না। তবে আইনটির ৩১ ও ৪০ ধারা যথাক্রমে বিদ্রোহে প্ররোচনা ও আর্থিক দুর্নীতি—অবসরের পরও কার্যকর থাকে। ফয়েজ হামিদের অভিযোগগুলো এ ধারার আওতাতেই বিচার হয়েছে।
রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ
২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আইএসআই-এর ডি-জিসি ছিলেন ফয়েজ হামিদ। এ সময় থেকেই রাজনীতিতে তার হস্তক্ষেপ নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠে। পিএমএল-কিউ নেতা চৌধুরী পারভেজ এলাহী এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আইএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক শুজা পাশা ও জহিরুল ইসলাম পিটিআইকে রাজনৈতিকভাবে সহায়তা করেছিলেন এবং পরে ফয়েজ হামিদের সময় সেই প্রভাব আরো প্রকাশ্য হয়ে ওঠে।
পিএমএল–এন নেতা মুহাম্মদ জুবায়েরও একই অভিযোগ সমর্থন করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইমরান খান ও পিটিআই কর্মীরা ফয়েজ হামিদের ভূমিকা প্রকাশ্যে তুলে ধরায় তার নাম রাজনৈতিক মেরুকরণের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যায়। নতুন আইএসআই প্রধান নিয়োগের সময় ইমরান খানের তাকে আরো কিছুদিন রাখার আগ্রহ সেনাবাহিনী ও সরকারের মধ্যে উত্তেজনার কারণ হয়ে ওঠে।
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাঈম খালিদ লোধির মতে, অতীতে সামরিক হস্তক্ষেপ গোপন থাকলেও ফয়েজ হামিদের সময় তা প্রকাশ্যে চলে আসে এবং কিছুটা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সাবেক প্রধান ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামিদকে ১৪ বছরের কঠোর কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির সামরিক আদালত।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর জনসংযোগ শাখা আইএসপিআর বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানায়, আর্মি অ্যাক্ট অনুযায়ী ১৫ মাসব্যাপী বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এই রায় ঘোষণা করা হয়েছে। গত বছরের ১২ আগস্ট ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্শালের কার্যক্রম শুরু হয়।
ইমরান খানের শাসনামলে ফয়েজ হামিদ আইএসআই মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগ আনা হয়— রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা, রাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট লঙ্ঘন, সরকারি ক্ষমতা ও সম্পদের অপব্যবহার এবং সাধারণ নাগরিকদের ক্ষতিসাধন। আইএসপিআর জানিয়েছে, প্রতিটি অভিযোগেই তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
পাকিস্তানে এই প্রথম কোনো সাবেক আইএসআই প্রধানকে কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি হতে হলো। সেনাবাহিনী বলেছে, বিচার প্রক্রিয়ায় সব আইনি নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে এবং ফয়েজ হামিদ তার পছন্দের আইনজীবীর সহায়তা পেয়েছেন। রায়ের বিরুদ্ধে তিনি সংশ্লিষ্ট ফোরামে আপিল করতে পারবেন।
তবে বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি এবং কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে তার সম্ভাব্য ‘যোগসাজশ’ সংক্রান্ত বিষয় এখনো তদন্তাধীন। এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি সেনাবাহিনী। ২০২৩ সালের ৯ মে পিটিআই আন্দোলনের সময় সহিংসতার ঘটনায়ও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ রায় নিয়ে ফয়েজ হামিদের আইনজীবী দল এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতা তারার বলেছেন, 'দীর্ঘ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই রায় দেওয়া হয়েছে। যিনি সীমা ছাড়িয়েছিলেন, আজ তিনি তার শাস্তি পেয়েছেন।'
টপ সিটি মামলার পটভূমি
ফয়েজ হামিদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আসে ইসলামাবাদের টপ সিটি হাউজিং সোসাইটির মালিক মুইজ আহমেদ খানের করা এক আবেদনের মাধ্যমে। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে তিনি সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে দাবি করেন, ২০১৭ সালের ১২ মে আইএসআই সদস্যরা সন্ত্রাসবাদ– সংক্রান্ত একটি মামলার অজুহাতে তার অফিস ও বাসায় অভিযান চালান। অভিযানের সময় বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ, হীরা, নগদ অর্থসহ মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া হয়।
আবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, ফয়েজ হামিদের ভাই সরদার নাজাফ মধ্যস্থতা করেন এবং এক পর্যায়ে ফয়েজ হামিদ নিজে মুইজ আহমেদ খানকে আশ্বস্ত করেন যে জব্দ হওয়া স্বর্ণ ও কিছু জিনিস ফিরিয়ে দেওয়া হবে, তবে নগদ অর্থ নয়। অভিযুক্ত অবসরপ্রাপ্ত দুই ব্রিগেডিয়ার— নাঈম ফখর ও গফফার তার কাছ থেকে জোরপূর্বক চার কোটি রুপি আদায় এবং একটি বেসরকারি চ্যানেল স্পনসর করতে বাধ্য করেন।
প্রধান বিচারপতি কাজী ফায়েজ ঈসার নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ আবেদনটি শুনে আবেদনকারীকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট ফোরামে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। ওই নির্দেশের পর ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে সেনাবাহিনী এক মেজর জেনারেলের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে।
শুনানিতে আরেকটি তথ্য আলোচনায় আসে— সুপ্রিম কোর্টের মানবাধিকার সেলের একটি পুরনো মামলা নিষ্পত্তির নথি সাবেক প্রধান বিচারপতি সাকিব নিসারের নির্দেশে নষ্ট করা হয়েছিল। বেঞ্চ এ ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করে জানায়, হাউজিং সোসাইটির মতো মামলার চেম্বারে শুনানি সাংবিধানিক নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আদালত আরও মত দেয়, মুইজ আহমেদ খান চাইলে ফয়েজ হামিদ ও সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি আদালতে মামলা করতে পারবেন।
তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া
অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ইনাম–উর–রহিম জানান, কোর্ট অব ইনকোয়ারি মূলত তদন্ত কমিটির মতো একটি প্রক্রিয়া, যেটির সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে কোর্ট মার্শাল শুরু হয়। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অভিযোগ উঠলে সেক্টর কমান্ডার ইনকোয়ারির নির্দেশ দেন।
কোর্ট মার্শালের কার্যক্রম পরিচালনা করেন একজন কর্মরত লেফটেন্যান্ট জেনারেল। তার সঙ্গে থাকেন দুই সদস্য এবং জাজ অ্যাডভোকেট জেনারেল শাখার একজন কর্মকর্তা। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চার্জশিট দেওয়া হয়। তিনি নিজের পছন্দের আইনজীবী রাখতে পারেন এবং সাক্ষী হাজিরের অধিকারও থাকে। কোর্ট অব ইনকোয়ারিতে সংগৃহীত প্রমাণও আদালতে গ্রহণ করা হয়।
আর্মি অ্যাক্ট অনুযায়ী, অবসরের ছয় মাস পর কোনো সেনা কর্মকর্তাকে সাধারণ অপরাধে কোর্ট মার্শাল করা যায় না। তবে আইনটির ৩১ ও ৪০ ধারা যথাক্রমে বিদ্রোহে প্ররোচনা ও আর্থিক দুর্নীতি—অবসরের পরও কার্যকর থাকে। ফয়েজ হামিদের অভিযোগগুলো এ ধারার আওতাতেই বিচার হয়েছে।
রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ
২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আইএসআই-এর ডি-জিসি ছিলেন ফয়েজ হামিদ। এ সময় থেকেই রাজনীতিতে তার হস্তক্ষেপ নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠে। পিএমএল-কিউ নেতা চৌধুরী পারভেজ এলাহী এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আইএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক শুজা পাশা ও জহিরুল ইসলাম পিটিআইকে রাজনৈতিকভাবে সহায়তা করেছিলেন এবং পরে ফয়েজ হামিদের সময় সেই প্রভাব আরো প্রকাশ্য হয়ে ওঠে।
পিএমএল–এন নেতা মুহাম্মদ জুবায়েরও একই অভিযোগ সমর্থন করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইমরান খান ও পিটিআই কর্মীরা ফয়েজ হামিদের ভূমিকা প্রকাশ্যে তুলে ধরায় তার নাম রাজনৈতিক মেরুকরণের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যায়। নতুন আইএসআই প্রধান নিয়োগের সময় ইমরান খানের তাকে আরো কিছুদিন রাখার আগ্রহ সেনাবাহিনী ও সরকারের মধ্যে উত্তেজনার কারণ হয়ে ওঠে।
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাঈম খালিদ লোধির মতে, অতীতে সামরিক হস্তক্ষেপ গোপন থাকলেও ফয়েজ হামিদের সময় তা প্রকাশ্যে চলে আসে এবং কিছুটা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

পাকিস্তানের সাবেক আইএসআই প্রধানের ১৪ বছরের কারাদণ্ড
সিটিজেন-ডেস্ক

পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সাবেক প্রধান ও অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামিদকে ১৪ বছরের কঠোর কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির সামরিক আদালত।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর জনসংযোগ শাখা আইএসপিআর বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানায়, আর্মি অ্যাক্ট অনুযায়ী ১৫ মাসব্যাপী বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এই রায় ঘোষণা করা হয়েছে। গত বছরের ১২ আগস্ট ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্শালের কার্যক্রম শুরু হয়।
ইমরান খানের শাসনামলে ফয়েজ হামিদ আইএসআই মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগ আনা হয়— রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা, রাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট লঙ্ঘন, সরকারি ক্ষমতা ও সম্পদের অপব্যবহার এবং সাধারণ নাগরিকদের ক্ষতিসাধন। আইএসপিআর জানিয়েছে, প্রতিটি অভিযোগেই তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
পাকিস্তানে এই প্রথম কোনো সাবেক আইএসআই প্রধানকে কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি হতে হলো। সেনাবাহিনী বলেছে, বিচার প্রক্রিয়ায় সব আইনি নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে এবং ফয়েজ হামিদ তার পছন্দের আইনজীবীর সহায়তা পেয়েছেন। রায়ের বিরুদ্ধে তিনি সংশ্লিষ্ট ফোরামে আপিল করতে পারবেন।
তবে বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি এবং কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে তার সম্ভাব্য ‘যোগসাজশ’ সংক্রান্ত বিষয় এখনো তদন্তাধীন। এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি সেনাবাহিনী। ২০২৩ সালের ৯ মে পিটিআই আন্দোলনের সময় সহিংসতার ঘটনায়ও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ রায় নিয়ে ফয়েজ হামিদের আইনজীবী দল এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতা তারার বলেছেন, 'দীর্ঘ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই রায় দেওয়া হয়েছে। যিনি সীমা ছাড়িয়েছিলেন, আজ তিনি তার শাস্তি পেয়েছেন।'
টপ সিটি মামলার পটভূমি
ফয়েজ হামিদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আসে ইসলামাবাদের টপ সিটি হাউজিং সোসাইটির মালিক মুইজ আহমেদ খানের করা এক আবেদনের মাধ্যমে। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে তিনি সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে দাবি করেন, ২০১৭ সালের ১২ মে আইএসআই সদস্যরা সন্ত্রাসবাদ– সংক্রান্ত একটি মামলার অজুহাতে তার অফিস ও বাসায় অভিযান চালান। অভিযানের সময় বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ, হীরা, নগদ অর্থসহ মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া হয়।
আবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, ফয়েজ হামিদের ভাই সরদার নাজাফ মধ্যস্থতা করেন এবং এক পর্যায়ে ফয়েজ হামিদ নিজে মুইজ আহমেদ খানকে আশ্বস্ত করেন যে জব্দ হওয়া স্বর্ণ ও কিছু জিনিস ফিরিয়ে দেওয়া হবে, তবে নগদ অর্থ নয়। অভিযুক্ত অবসরপ্রাপ্ত দুই ব্রিগেডিয়ার— নাঈম ফখর ও গফফার তার কাছ থেকে জোরপূর্বক চার কোটি রুপি আদায় এবং একটি বেসরকারি চ্যানেল স্পনসর করতে বাধ্য করেন।
প্রধান বিচারপতি কাজী ফায়েজ ঈসার নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ আবেদনটি শুনে আবেদনকারীকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট ফোরামে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। ওই নির্দেশের পর ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে সেনাবাহিনী এক মেজর জেনারেলের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে।
শুনানিতে আরেকটি তথ্য আলোচনায় আসে— সুপ্রিম কোর্টের মানবাধিকার সেলের একটি পুরনো মামলা নিষ্পত্তির নথি সাবেক প্রধান বিচারপতি সাকিব নিসারের নির্দেশে নষ্ট করা হয়েছিল। বেঞ্চ এ ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করে জানায়, হাউজিং সোসাইটির মতো মামলার চেম্বারে শুনানি সাংবিধানিক নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আদালত আরও মত দেয়, মুইজ আহমেদ খান চাইলে ফয়েজ হামিদ ও সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি আদালতে মামলা করতে পারবেন।
তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া
অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ইনাম–উর–রহিম জানান, কোর্ট অব ইনকোয়ারি মূলত তদন্ত কমিটির মতো একটি প্রক্রিয়া, যেটির সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে কোর্ট মার্শাল শুরু হয়। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অভিযোগ উঠলে সেক্টর কমান্ডার ইনকোয়ারির নির্দেশ দেন।
কোর্ট মার্শালের কার্যক্রম পরিচালনা করেন একজন কর্মরত লেফটেন্যান্ট জেনারেল। তার সঙ্গে থাকেন দুই সদস্য এবং জাজ অ্যাডভোকেট জেনারেল শাখার একজন কর্মকর্তা। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চার্জশিট দেওয়া হয়। তিনি নিজের পছন্দের আইনজীবী রাখতে পারেন এবং সাক্ষী হাজিরের অধিকারও থাকে। কোর্ট অব ইনকোয়ারিতে সংগৃহীত প্রমাণও আদালতে গ্রহণ করা হয়।
আর্মি অ্যাক্ট অনুযায়ী, অবসরের ছয় মাস পর কোনো সেনা কর্মকর্তাকে সাধারণ অপরাধে কোর্ট মার্শাল করা যায় না। তবে আইনটির ৩১ ও ৪০ ধারা যথাক্রমে বিদ্রোহে প্ররোচনা ও আর্থিক দুর্নীতি—অবসরের পরও কার্যকর থাকে। ফয়েজ হামিদের অভিযোগগুলো এ ধারার আওতাতেই বিচার হয়েছে।
রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ
২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আইএসআই-এর ডি-জিসি ছিলেন ফয়েজ হামিদ। এ সময় থেকেই রাজনীতিতে তার হস্তক্ষেপ নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠে। পিএমএল-কিউ নেতা চৌধুরী পারভেজ এলাহী এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আইএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক শুজা পাশা ও জহিরুল ইসলাম পিটিআইকে রাজনৈতিকভাবে সহায়তা করেছিলেন এবং পরে ফয়েজ হামিদের সময় সেই প্রভাব আরো প্রকাশ্য হয়ে ওঠে।
পিএমএল–এন নেতা মুহাম্মদ জুবায়েরও একই অভিযোগ সমর্থন করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইমরান খান ও পিটিআই কর্মীরা ফয়েজ হামিদের ভূমিকা প্রকাশ্যে তুলে ধরায় তার নাম রাজনৈতিক মেরুকরণের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যায়। নতুন আইএসআই প্রধান নিয়োগের সময় ইমরান খানের তাকে আরো কিছুদিন রাখার আগ্রহ সেনাবাহিনী ও সরকারের মধ্যে উত্তেজনার কারণ হয়ে ওঠে।
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাঈম খালিদ লোধির মতে, অতীতে সামরিক হস্তক্ষেপ গোপন থাকলেও ফয়েজ হামিদের সময় তা প্রকাশ্যে চলে আসে এবং কিছুটা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা




