এডিপির আকার কমল ১৩%
বাদ গেল ৩০ হাজার কোটি টাকা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বড় আঘাত

বাদ গেল ৩০ হাজার কোটি টাকা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বড় আঘাত
জ্যেষ্ঠ-প্রতিবেদক

চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বড় অঙ্কের কাটছাঁট করা হয়েছে। অর্থবছরের অর্ধেকের মাথায় এসে টাকার অঙ্কে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। মূলত, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত প্রকল্প না পাওয়ায় এবং সরকারের ধীরে চলা নীতিতে বাস্তবায়ন গতি মন্থর হওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারএকমাত্র বাজেট দেয় গত বছরের জুনে। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া উন্নয়ন নীতিতে কাটছাঁট করে চলতি অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এডিপি নির্ধারণ করা হয়। জানুয়ারিতে এসে কাটছাঁটের পর সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়াল ২ লাখ কোটি টাকায়। সবচেয়ে বড় কাটছাঁট হয়েছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বরাদ্দে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ কমেছে ৭৩ শতাংশ; আর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় কমেছে ৫৫ শতাংশ।
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় সংশোধিত এডিপি (আরএডিপি) অনুমোদন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
পরে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, "এমনিতেই মূল এডিপি যেটা ছিল, সেটাকেই কম ধরা হয়েছিল। অনেক বছরের মধ্যে মূল এডিপি তার আগের বছরের চেয়ে কম ছিল ২০২৩-২৪ সালে। সেখানেও বাস্তবায়ন হার কম ছিল বলে আমরা এ বছরের মূল এডিপি ধরেছিলাম ২ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা।”
তিনি বলেন, "এখন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে যে চাহিদা এসেছে, সেই চাহিদা পূরণ করার পরও কিছু বাকি রয়ে গেছে, তাই না? আসলে রাজনৈতিক সরকারের আমলে যেমন অসংখ্য প্রকল্পের ভিড় থাকে, আমাদের সময়ে প্রকল্প বরং চেয়ে চেয়ে আনতে হয়। প্রকল্পের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সেক্ষেত্রে আমরা প্রকল্পগুলো, যেগুলো একদমই গ্রহণযোগ্য না, সেগুলো বাদ দিয়ে বাকি প্রকল্পগুলো সব গ্রহণ করার পরও কিছু থোক বরাদ্দ রয়ে গেছে এবং সেগুলো মিলিয়ে আমাদের এখন যে... ২ লাখ আরএডিপি ২ লাখ কোটি টাকায়।"
পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, “খাতওয়ারিভাবে একদম পুরো আমরা বলতে চাই না, কারণ এগুলো পরে যখন বাজেট ঘোষণা হবে, তখন বলা হবে। তবে আমি এমনিতে দেখছি, আমার নিজের জানার জন্যই আমি দেখছিলাম যে কিছু কিছু মন্ত্রণালয় যারা সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পায়, সেগুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ যেমন। এটা যা এডিপিতে মূল বরাদ্দ ছিল তা থেকে তো কমানো হয়নি বরং তার থেকেও কিছু বাড়ানো হয়েছে। মহাসড়ক আর সড়ক যেগুলোর রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজ-এর সেগুলো আবার জমি অধিগ্রহণ এসব কিছু আছে এসবের কারণে তারা মূল বরাদ্দ থেকে বেশ কমানো হয়েছে। অন্য বিদ্যুৎ বিভাগ সামান্য, যা ১৫ শতাংশ, ওরকমই কমানো হয়েছে; বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কমাতে হয়নি, আগের মতই আছে।”
২০২৪-২৫ অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৮১ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। তার চেয়ে ৩৫ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা কমিয়ে চলতি অর্থবছরের বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয় ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয় কামানোর মধ্যে শুধু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) খাতেই চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে কমেছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। আর সংশোধিত এডিপির চেয়ে কমেছে ১৪ হাজার কোটি টাকা।
বিদায়ী অর্থবছরে এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। সংশোধন করে তা ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়। চলতি অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এখন সংশোধনে তা ৩০ হাজার কোটি টাকা কমে ২ লাখ কোটি টাকা।
আর স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান বা কর্পোরেশনের প্রকল্প ধরে এর আকার দাঁড়ায় ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাঁচ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে টাকার অঙ্কে ১ লাখ ২১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৬০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। পরিবহন ও যোগাযোগ; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি; গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধাবলী; শিক্ষা ও স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নে রয়েছে এ বরাদ্দ।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১১ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ কমিয়ে ৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা খাতের ১৩ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ ৬ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে বলে জানান উপদেষ্টা।
উপদেষ্টা বলেন, “এগুলোই উল্লেখযোগ্য ছিল; মানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেশি কমেছে এই রিভাইজড বাজেটে। আর স্থানীয় সরকার আর পল্লী উন্নয়নে রিভাইজড বাজেটে বরাদ্দ থেকেও অরিজিনাল বরাদ্দ থেকেও বেশি বেড়েছে।”
মেট্রোরেল প্রকল্পে বরাদ্দ কমেছে
উপদেষ্টা বলেন, মেট্রো রেলের এমআরটি-৬ প্রকল্পের মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের বরাদ্দও ‘২-৩ হাজার কোটি টাকা’ কমানো হয়েছে। কেন প্রকল্পগুলো আগে এত বেশি থাকে এবং দেখলেই কেন কমানো যায়, আমি জানি না। তিনি বলেন, মেট্রোরেলের অন্যান্য লাইন করার ক্ষেত্রে বিদেশি ঋণ সহায়তা নিশ্চিত হলেও পরের সরকার যাতে এসব বিষয় বিবেচনা করে, সেজন্য মতামত দিয়ে রাখা হয়েছে।”
“এখন এই সবগুলো লাইন একত্রে শুরু করলে সারা ঢাকাতে যে কাটাছেঁড়া করতে হবে, আন্ডারগ্রাউন্ডে সব ইউটিলিটি বদলাতে হয়, তারপরে উপরে সব আটকাতে হয়, এখান থেকে ওখান থেকে এটা করতে হয়—এই এক মেট্রোরেল করার সময় তো দেখা গেছে। আমার মতামত যেটা লিখে রেখেছি, আগামী সরকার সেটা বিবেচনা করবে, সেটা হল, ঢাকা শহরে কতগুলো মেট্রোরেল আসলে প্রয়োজন হবে? এগুলো কখন কোনটা শুরু করা হবে? এবং যেগুলো চালু হয়েছে বা এখন তৈরি হচ্ছে, সেগুলোতে আমাদের অভিজ্ঞতা কী? এগুলো একটু মূল্যায়ন না করে হঠাৎ করে একত্রে সব প্রকল্প শুরু করে দেওয়া খুব সমীচীন ব্যাপার না।”
দেশে বিনিয়োগে খরা ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণ হিসেবে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ‘রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে’ চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, “এডিপির আকার ছোট হয়েছে বলেই যে অর্থনীতির যে মন্দাভাব একটু দেখা যাচ্ছে, সেটা যে শুধু এই কারণেই তা না, অর্থনীতির মন্দাভাব দেখা যাচ্ছে যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে, যে কারণে বিনিয়োগ হচ্ছে না। বিনিয়োগ যদি হত, তাহলে এই এডিপি ছোট হলেও কোনো অসুবিধা হত না। বিনিয়োগ বাড়লে এমনিতেই অনেক কর্মসংস্থান বাড়তে পারত।
“একমাত্র আমাদের যেটা সুবিধা হয়েছে, আগের থেকে এখন অনেক বেশি রেমিটেন্স বিদেশ থেকে আসছে। এই রেমিটেন্সগুলো সবই যায় গ্রামে। তবে যেসব জায়গায় রেমিটেন্স যাচ্ছে, সেখানে দোকানপাট, বাড়িঘর তৈরি হলেও দারিদ্র্য যে সেই অর্থে কমে না। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণের যে সুদ হার, তাকে বিনিয়োগে ‘সবচেয়ে বড় বাধা’ হিসেবে বলেন তিনি।”
কোথায় কত বরাদ্দ
সূত্র অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আরএডিপিতে যে বরাদ্দ ধরা হয়েছে এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে এক লাখ ২৮ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে ৭২ হাজার কোটি টাকা। ফলে মূল এডিপির তুলনায় সরকারি তহবিলের ১৬ হাজার কোটি টাকা কমছে। এছাড়া বৈদেশিক ঋণ থেকে কমছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এদিকে মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে সরবচেয়ে বেশি কমছে মেট্রোরেল লাইন-১ (এমআরটি লাইন-১) প্রকল্পের বরাদ্দ।
চলমান এডিপিতে এ প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ৬৩১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। কিন্তু সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৮০১ কোটি টাকা। ফলে বাদ যাচ্ছে ৭ হাজার ৮৩০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, বা ৯১ শতাংশ বরাদ্দ কমছে। এছাড়া বরাদ্দ কমার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প। এটিতে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ থেকে ২ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা কাঁটছাট করে এখন ধরা হচ্ছে ১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৭৩ শতাংশ।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে কমছে ৭৩২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এটিতে বরাদ্দ আছে ১ হাজার ৩৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এখন সংশোধিত বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩০৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, ফলে বরাদ্দ কমছে ৭১ শতাংশ।
পরিকল্পনা কমিশন জানায়, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পে ৪২৫ কোটি টাকা থেকে ২৫৬ কোটি ৪ লাখ টাকা কমিয়ে সংশোধিত বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ১৬৮ কোটি ৬ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ৬০ শতাংশ। এছাড়া মেট্রোরেল লাইন-৫ (এমআরটি লাইন-৫) প্রকল্পে ১ হাজার ৪৯০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা থেকে ৮৯৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা কমিয়ে সংশোধিত বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ৫৯২ কোটি ৮ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ৬০ শতাংশ। মেট্রেরেলে লাইন-৬ (এমআরটি লাইন-৬) প্রকল্পে ১ হাজার ৩৪৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা থেকে ৩২৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা কমিয়ে বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ১ হাজার ২৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ২৪ শতাংশ। আপগ্রেডিং অব হাটিকুমরুল-রংপুর হাইওয়ে টু ৪ লেন প্রকল্পে ১ হাজার ৮৭২ কোটি ৫ লাখ টাকা থেকে ৩০৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা কমিয়ে বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ১ হাজার ৫৬২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ১৭ শতাংশ। এছাড়া ঢাকা সিলেট মহাসড়ক ৪ লেন প্রকল্পে ১ হাজার ৭২৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকা করেছে।
সংশোধিত এডিপিতে সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এর পরেই রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, যেখানে বরাদ্দ হয়েছে ২৬ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। এছাড়া বাসস্থান ও কমিউনিটি সুবিধা, শিক্ষা এবং স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ উন্নয়ন খাতও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ পেয়েছে।
তবে সংশোধিত এডিপিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে স্বাস্থ্যখাত। দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতার কারণে এই খাতে বরাদ্দ প্রায় ৭৪ শতাংশ কমানো হয়েছে। মূল এডিপিতে যেখানে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা, সেখানে সংশোধনের পর তা নেমে এসেছে মাত্র ৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকায়। শিক্ষা খাতেও বড় ধরনের কাটছাঁট হয়েছে। এই খাতে বরাদ্দ কমানো হয়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ।
এই সংশোধিত এডিপিতে মোট ১ হাজার ৩৩০টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্পের সংখ্যাই বেশি। পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে এসব প্রকল্পের মধ্য থেকে ২৮৬টি প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বড় অঙ্কের কাটছাঁট করা হয়েছে। অর্থবছরের অর্ধেকের মাথায় এসে টাকার অঙ্কে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। মূলত, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত প্রকল্প না পাওয়ায় এবং সরকারের ধীরে চলা নীতিতে বাস্তবায়ন গতি মন্থর হওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারএকমাত্র বাজেট দেয় গত বছরের জুনে। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া উন্নয়ন নীতিতে কাটছাঁট করে চলতি অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এডিপি নির্ধারণ করা হয়। জানুয়ারিতে এসে কাটছাঁটের পর সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়াল ২ লাখ কোটি টাকায়। সবচেয়ে বড় কাটছাঁট হয়েছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বরাদ্দে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ কমেছে ৭৩ শতাংশ; আর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় কমেছে ৫৫ শতাংশ।
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় সংশোধিত এডিপি (আরএডিপি) অনুমোদন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
পরে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, "এমনিতেই মূল এডিপি যেটা ছিল, সেটাকেই কম ধরা হয়েছিল। অনেক বছরের মধ্যে মূল এডিপি তার আগের বছরের চেয়ে কম ছিল ২০২৩-২৪ সালে। সেখানেও বাস্তবায়ন হার কম ছিল বলে আমরা এ বছরের মূল এডিপি ধরেছিলাম ২ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা।”
তিনি বলেন, "এখন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে যে চাহিদা এসেছে, সেই চাহিদা পূরণ করার পরও কিছু বাকি রয়ে গেছে, তাই না? আসলে রাজনৈতিক সরকারের আমলে যেমন অসংখ্য প্রকল্পের ভিড় থাকে, আমাদের সময়ে প্রকল্প বরং চেয়ে চেয়ে আনতে হয়। প্রকল্পের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সেক্ষেত্রে আমরা প্রকল্পগুলো, যেগুলো একদমই গ্রহণযোগ্য না, সেগুলো বাদ দিয়ে বাকি প্রকল্পগুলো সব গ্রহণ করার পরও কিছু থোক বরাদ্দ রয়ে গেছে এবং সেগুলো মিলিয়ে আমাদের এখন যে... ২ লাখ আরএডিপি ২ লাখ কোটি টাকায়।"
পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, “খাতওয়ারিভাবে একদম পুরো আমরা বলতে চাই না, কারণ এগুলো পরে যখন বাজেট ঘোষণা হবে, তখন বলা হবে। তবে আমি এমনিতে দেখছি, আমার নিজের জানার জন্যই আমি দেখছিলাম যে কিছু কিছু মন্ত্রণালয় যারা সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পায়, সেগুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ যেমন। এটা যা এডিপিতে মূল বরাদ্দ ছিল তা থেকে তো কমানো হয়নি বরং তার থেকেও কিছু বাড়ানো হয়েছে। মহাসড়ক আর সড়ক যেগুলোর রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজ-এর সেগুলো আবার জমি অধিগ্রহণ এসব কিছু আছে এসবের কারণে তারা মূল বরাদ্দ থেকে বেশ কমানো হয়েছে। অন্য বিদ্যুৎ বিভাগ সামান্য, যা ১৫ শতাংশ, ওরকমই কমানো হয়েছে; বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কমাতে হয়নি, আগের মতই আছে।”
২০২৪-২৫ অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৮১ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। তার চেয়ে ৩৫ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা কমিয়ে চলতি অর্থবছরের বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয় ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয় কামানোর মধ্যে শুধু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) খাতেই চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে কমেছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। আর সংশোধিত এডিপির চেয়ে কমেছে ১৪ হাজার কোটি টাকা।
বিদায়ী অর্থবছরে এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। সংশোধন করে তা ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়। চলতি অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এখন সংশোধনে তা ৩০ হাজার কোটি টাকা কমে ২ লাখ কোটি টাকা।
আর স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান বা কর্পোরেশনের প্রকল্প ধরে এর আকার দাঁড়ায় ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাঁচ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে টাকার অঙ্কে ১ লাখ ২১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৬০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। পরিবহন ও যোগাযোগ; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি; গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধাবলী; শিক্ষা ও স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নে রয়েছে এ বরাদ্দ।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১১ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ কমিয়ে ৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা খাতের ১৩ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ ৬ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে বলে জানান উপদেষ্টা।
উপদেষ্টা বলেন, “এগুলোই উল্লেখযোগ্য ছিল; মানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেশি কমেছে এই রিভাইজড বাজেটে। আর স্থানীয় সরকার আর পল্লী উন্নয়নে রিভাইজড বাজেটে বরাদ্দ থেকেও অরিজিনাল বরাদ্দ থেকেও বেশি বেড়েছে।”
মেট্রোরেল প্রকল্পে বরাদ্দ কমেছে
উপদেষ্টা বলেন, মেট্রো রেলের এমআরটি-৬ প্রকল্পের মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের বরাদ্দও ‘২-৩ হাজার কোটি টাকা’ কমানো হয়েছে। কেন প্রকল্পগুলো আগে এত বেশি থাকে এবং দেখলেই কেন কমানো যায়, আমি জানি না। তিনি বলেন, মেট্রোরেলের অন্যান্য লাইন করার ক্ষেত্রে বিদেশি ঋণ সহায়তা নিশ্চিত হলেও পরের সরকার যাতে এসব বিষয় বিবেচনা করে, সেজন্য মতামত দিয়ে রাখা হয়েছে।”
“এখন এই সবগুলো লাইন একত্রে শুরু করলে সারা ঢাকাতে যে কাটাছেঁড়া করতে হবে, আন্ডারগ্রাউন্ডে সব ইউটিলিটি বদলাতে হয়, তারপরে উপরে সব আটকাতে হয়, এখান থেকে ওখান থেকে এটা করতে হয়—এই এক মেট্রোরেল করার সময় তো দেখা গেছে। আমার মতামত যেটা লিখে রেখেছি, আগামী সরকার সেটা বিবেচনা করবে, সেটা হল, ঢাকা শহরে কতগুলো মেট্রোরেল আসলে প্রয়োজন হবে? এগুলো কখন কোনটা শুরু করা হবে? এবং যেগুলো চালু হয়েছে বা এখন তৈরি হচ্ছে, সেগুলোতে আমাদের অভিজ্ঞতা কী? এগুলো একটু মূল্যায়ন না করে হঠাৎ করে একত্রে সব প্রকল্প শুরু করে দেওয়া খুব সমীচীন ব্যাপার না।”
দেশে বিনিয়োগে খরা ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণ হিসেবে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ‘রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে’ চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, “এডিপির আকার ছোট হয়েছে বলেই যে অর্থনীতির যে মন্দাভাব একটু দেখা যাচ্ছে, সেটা যে শুধু এই কারণেই তা না, অর্থনীতির মন্দাভাব দেখা যাচ্ছে যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে, যে কারণে বিনিয়োগ হচ্ছে না। বিনিয়োগ যদি হত, তাহলে এই এডিপি ছোট হলেও কোনো অসুবিধা হত না। বিনিয়োগ বাড়লে এমনিতেই অনেক কর্মসংস্থান বাড়তে পারত।
“একমাত্র আমাদের যেটা সুবিধা হয়েছে, আগের থেকে এখন অনেক বেশি রেমিটেন্স বিদেশ থেকে আসছে। এই রেমিটেন্সগুলো সবই যায় গ্রামে। তবে যেসব জায়গায় রেমিটেন্স যাচ্ছে, সেখানে দোকানপাট, বাড়িঘর তৈরি হলেও দারিদ্র্য যে সেই অর্থে কমে না। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণের যে সুদ হার, তাকে বিনিয়োগে ‘সবচেয়ে বড় বাধা’ হিসেবে বলেন তিনি।”
কোথায় কত বরাদ্দ
সূত্র অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আরএডিপিতে যে বরাদ্দ ধরা হয়েছে এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে এক লাখ ২৮ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে ৭২ হাজার কোটি টাকা। ফলে মূল এডিপির তুলনায় সরকারি তহবিলের ১৬ হাজার কোটি টাকা কমছে। এছাড়া বৈদেশিক ঋণ থেকে কমছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এদিকে মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে সরবচেয়ে বেশি কমছে মেট্রোরেল লাইন-১ (এমআরটি লাইন-১) প্রকল্পের বরাদ্দ।
চলমান এডিপিতে এ প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ৬৩১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। কিন্তু সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৮০১ কোটি টাকা। ফলে বাদ যাচ্ছে ৭ হাজার ৮৩০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, বা ৯১ শতাংশ বরাদ্দ কমছে। এছাড়া বরাদ্দ কমার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প। এটিতে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ থেকে ২ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা কাঁটছাট করে এখন ধরা হচ্ছে ১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৭৩ শতাংশ।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে কমছে ৭৩২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এটিতে বরাদ্দ আছে ১ হাজার ৩৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এখন সংশোধিত বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩০৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, ফলে বরাদ্দ কমছে ৭১ শতাংশ।
পরিকল্পনা কমিশন জানায়, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পে ৪২৫ কোটি টাকা থেকে ২৫৬ কোটি ৪ লাখ টাকা কমিয়ে সংশোধিত বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ১৬৮ কোটি ৬ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ৬০ শতাংশ। এছাড়া মেট্রোরেল লাইন-৫ (এমআরটি লাইন-৫) প্রকল্পে ১ হাজার ৪৯০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা থেকে ৮৯৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা কমিয়ে সংশোধিত বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ৫৯২ কোটি ৮ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ৬০ শতাংশ। মেট্রেরেলে লাইন-৬ (এমআরটি লাইন-৬) প্রকল্পে ১ হাজার ৩৪৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা থেকে ৩২৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা কমিয়ে বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ১ হাজার ২৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ২৪ শতাংশ। আপগ্রেডিং অব হাটিকুমরুল-রংপুর হাইওয়ে টু ৪ লেন প্রকল্পে ১ হাজার ৮৭২ কোটি ৫ লাখ টাকা থেকে ৩০৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা কমিয়ে বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ১ হাজার ৫৬২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ১৭ শতাংশ। এছাড়া ঢাকা সিলেট মহাসড়ক ৪ লেন প্রকল্পে ১ হাজার ৭২৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকা করেছে।
সংশোধিত এডিপিতে সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এর পরেই রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, যেখানে বরাদ্দ হয়েছে ২৬ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। এছাড়া বাসস্থান ও কমিউনিটি সুবিধা, শিক্ষা এবং স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ উন্নয়ন খাতও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ পেয়েছে।
তবে সংশোধিত এডিপিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে স্বাস্থ্যখাত। দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতার কারণে এই খাতে বরাদ্দ প্রায় ৭৪ শতাংশ কমানো হয়েছে। মূল এডিপিতে যেখানে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা, সেখানে সংশোধনের পর তা নেমে এসেছে মাত্র ৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকায়। শিক্ষা খাতেও বড় ধরনের কাটছাঁট হয়েছে। এই খাতে বরাদ্দ কমানো হয়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ।
এই সংশোধিত এডিপিতে মোট ১ হাজার ৩৩০টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্পের সংখ্যাই বেশি। পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে এসব প্রকল্পের মধ্য থেকে ২৮৬টি প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাদ গেল ৩০ হাজার কোটি টাকা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বড় আঘাত
জ্যেষ্ঠ-প্রতিবেদক

চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বড় অঙ্কের কাটছাঁট করা হয়েছে। অর্থবছরের অর্ধেকের মাথায় এসে টাকার অঙ্কে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। মূলত, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত প্রকল্প না পাওয়ায় এবং সরকারের ধীরে চলা নীতিতে বাস্তবায়ন গতি মন্থর হওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারএকমাত্র বাজেট দেয় গত বছরের জুনে। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া উন্নয়ন নীতিতে কাটছাঁট করে চলতি অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এডিপি নির্ধারণ করা হয়। জানুয়ারিতে এসে কাটছাঁটের পর সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়াল ২ লাখ কোটি টাকায়। সবচেয়ে বড় কাটছাঁট হয়েছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বরাদ্দে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ কমেছে ৭৩ শতাংশ; আর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় কমেছে ৫৫ শতাংশ।
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় সংশোধিত এডিপি (আরএডিপি) অনুমোদন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
পরে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, "এমনিতেই মূল এডিপি যেটা ছিল, সেটাকেই কম ধরা হয়েছিল। অনেক বছরের মধ্যে মূল এডিপি তার আগের বছরের চেয়ে কম ছিল ২০২৩-২৪ সালে। সেখানেও বাস্তবায়ন হার কম ছিল বলে আমরা এ বছরের মূল এডিপি ধরেছিলাম ২ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা।”
তিনি বলেন, "এখন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে যে চাহিদা এসেছে, সেই চাহিদা পূরণ করার পরও কিছু বাকি রয়ে গেছে, তাই না? আসলে রাজনৈতিক সরকারের আমলে যেমন অসংখ্য প্রকল্পের ভিড় থাকে, আমাদের সময়ে প্রকল্প বরং চেয়ে চেয়ে আনতে হয়। প্রকল্পের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সেক্ষেত্রে আমরা প্রকল্পগুলো, যেগুলো একদমই গ্রহণযোগ্য না, সেগুলো বাদ দিয়ে বাকি প্রকল্পগুলো সব গ্রহণ করার পরও কিছু থোক বরাদ্দ রয়ে গেছে এবং সেগুলো মিলিয়ে আমাদের এখন যে... ২ লাখ আরএডিপি ২ লাখ কোটি টাকায়।"
পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, “খাতওয়ারিভাবে একদম পুরো আমরা বলতে চাই না, কারণ এগুলো পরে যখন বাজেট ঘোষণা হবে, তখন বলা হবে। তবে আমি এমনিতে দেখছি, আমার নিজের জানার জন্যই আমি দেখছিলাম যে কিছু কিছু মন্ত্রণালয় যারা সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পায়, সেগুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ যেমন। এটা যা এডিপিতে মূল বরাদ্দ ছিল তা থেকে তো কমানো হয়নি বরং তার থেকেও কিছু বাড়ানো হয়েছে। মহাসড়ক আর সড়ক যেগুলোর রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজ-এর সেগুলো আবার জমি অধিগ্রহণ এসব কিছু আছে এসবের কারণে তারা মূল বরাদ্দ থেকে বেশ কমানো হয়েছে। অন্য বিদ্যুৎ বিভাগ সামান্য, যা ১৫ শতাংশ, ওরকমই কমানো হয়েছে; বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কমাতে হয়নি, আগের মতই আছে।”
২০২৪-২৫ অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৮১ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। তার চেয়ে ৩৫ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা কমিয়ে চলতি অর্থবছরের বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয় ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয় কামানোর মধ্যে শুধু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) খাতেই চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে কমেছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। আর সংশোধিত এডিপির চেয়ে কমেছে ১৪ হাজার কোটি টাকা।
বিদায়ী অর্থবছরে এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। সংশোধন করে তা ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়। চলতি অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এখন সংশোধনে তা ৩০ হাজার কোটি টাকা কমে ২ লাখ কোটি টাকা।
আর স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান বা কর্পোরেশনের প্রকল্প ধরে এর আকার দাঁড়ায় ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাঁচ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে টাকার অঙ্কে ১ লাখ ২১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৬০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। পরিবহন ও যোগাযোগ; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি; গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধাবলী; শিক্ষা ও স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নে রয়েছে এ বরাদ্দ।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১১ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ কমিয়ে ৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা খাতের ১৩ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ ৬ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে বলে জানান উপদেষ্টা।
উপদেষ্টা বলেন, “এগুলোই উল্লেখযোগ্য ছিল; মানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেশি কমেছে এই রিভাইজড বাজেটে। আর স্থানীয় সরকার আর পল্লী উন্নয়নে রিভাইজড বাজেটে বরাদ্দ থেকেও অরিজিনাল বরাদ্দ থেকেও বেশি বেড়েছে।”
মেট্রোরেল প্রকল্পে বরাদ্দ কমেছে
উপদেষ্টা বলেন, মেট্রো রেলের এমআরটি-৬ প্রকল্পের মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের বরাদ্দও ‘২-৩ হাজার কোটি টাকা’ কমানো হয়েছে। কেন প্রকল্পগুলো আগে এত বেশি থাকে এবং দেখলেই কেন কমানো যায়, আমি জানি না। তিনি বলেন, মেট্রোরেলের অন্যান্য লাইন করার ক্ষেত্রে বিদেশি ঋণ সহায়তা নিশ্চিত হলেও পরের সরকার যাতে এসব বিষয় বিবেচনা করে, সেজন্য মতামত দিয়ে রাখা হয়েছে।”
“এখন এই সবগুলো লাইন একত্রে শুরু করলে সারা ঢাকাতে যে কাটাছেঁড়া করতে হবে, আন্ডারগ্রাউন্ডে সব ইউটিলিটি বদলাতে হয়, তারপরে উপরে সব আটকাতে হয়, এখান থেকে ওখান থেকে এটা করতে হয়—এই এক মেট্রোরেল করার সময় তো দেখা গেছে। আমার মতামত যেটা লিখে রেখেছি, আগামী সরকার সেটা বিবেচনা করবে, সেটা হল, ঢাকা শহরে কতগুলো মেট্রোরেল আসলে প্রয়োজন হবে? এগুলো কখন কোনটা শুরু করা হবে? এবং যেগুলো চালু হয়েছে বা এখন তৈরি হচ্ছে, সেগুলোতে আমাদের অভিজ্ঞতা কী? এগুলো একটু মূল্যায়ন না করে হঠাৎ করে একত্রে সব প্রকল্প শুরু করে দেওয়া খুব সমীচীন ব্যাপার না।”
দেশে বিনিয়োগে খরা ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণ হিসেবে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ‘রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে’ চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, “এডিপির আকার ছোট হয়েছে বলেই যে অর্থনীতির যে মন্দাভাব একটু দেখা যাচ্ছে, সেটা যে শুধু এই কারণেই তা না, অর্থনীতির মন্দাভাব দেখা যাচ্ছে যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে, যে কারণে বিনিয়োগ হচ্ছে না। বিনিয়োগ যদি হত, তাহলে এই এডিপি ছোট হলেও কোনো অসুবিধা হত না। বিনিয়োগ বাড়লে এমনিতেই অনেক কর্মসংস্থান বাড়তে পারত।
“একমাত্র আমাদের যেটা সুবিধা হয়েছে, আগের থেকে এখন অনেক বেশি রেমিটেন্স বিদেশ থেকে আসছে। এই রেমিটেন্সগুলো সবই যায় গ্রামে। তবে যেসব জায়গায় রেমিটেন্স যাচ্ছে, সেখানে দোকানপাট, বাড়িঘর তৈরি হলেও দারিদ্র্য যে সেই অর্থে কমে না। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণের যে সুদ হার, তাকে বিনিয়োগে ‘সবচেয়ে বড় বাধা’ হিসেবে বলেন তিনি।”
কোথায় কত বরাদ্দ
সূত্র অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আরএডিপিতে যে বরাদ্দ ধরা হয়েছে এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে এক লাখ ২৮ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে ৭২ হাজার কোটি টাকা। ফলে মূল এডিপির তুলনায় সরকারি তহবিলের ১৬ হাজার কোটি টাকা কমছে। এছাড়া বৈদেশিক ঋণ থেকে কমছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এদিকে মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে সরবচেয়ে বেশি কমছে মেট্রোরেল লাইন-১ (এমআরটি লাইন-১) প্রকল্পের বরাদ্দ।
চলমান এডিপিতে এ প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ৬৩১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। কিন্তু সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৮০১ কোটি টাকা। ফলে বাদ যাচ্ছে ৭ হাজার ৮৩০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, বা ৯১ শতাংশ বরাদ্দ কমছে। এছাড়া বরাদ্দ কমার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প। এটিতে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ থেকে ২ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা কাঁটছাট করে এখন ধরা হচ্ছে ১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৭৩ শতাংশ।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে কমছে ৭৩২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এটিতে বরাদ্দ আছে ১ হাজার ৩৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এখন সংশোধিত বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩০৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, ফলে বরাদ্দ কমছে ৭১ শতাংশ।
পরিকল্পনা কমিশন জানায়, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পে ৪২৫ কোটি টাকা থেকে ২৫৬ কোটি ৪ লাখ টাকা কমিয়ে সংশোধিত বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ১৬৮ কোটি ৬ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ৬০ শতাংশ। এছাড়া মেট্রোরেল লাইন-৫ (এমআরটি লাইন-৫) প্রকল্পে ১ হাজার ৪৯০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা থেকে ৮৯৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা কমিয়ে সংশোধিত বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ৫৯২ কোটি ৮ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ৬০ শতাংশ। মেট্রেরেলে লাইন-৬ (এমআরটি লাইন-৬) প্রকল্পে ১ হাজার ৩৪৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা থেকে ৩২৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা কমিয়ে বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ১ হাজার ২৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ২৪ শতাংশ। আপগ্রেডিং অব হাটিকুমরুল-রংপুর হাইওয়ে টু ৪ লেন প্রকল্পে ১ হাজার ৮৭২ কোটি ৫ লাখ টাকা থেকে ৩০৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা কমিয়ে বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ১ হাজার ৫৬২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ১৭ শতাংশ। এছাড়া ঢাকা সিলেট মহাসড়ক ৪ লেন প্রকল্পে ১ হাজার ৭২৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকা করেছে।
সংশোধিত এডিপিতে সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এর পরেই রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, যেখানে বরাদ্দ হয়েছে ২৬ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। এছাড়া বাসস্থান ও কমিউনিটি সুবিধা, শিক্ষা এবং স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ উন্নয়ন খাতও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ পেয়েছে।
তবে সংশোধিত এডিপিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে স্বাস্থ্যখাত। দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতার কারণে এই খাতে বরাদ্দ প্রায় ৭৪ শতাংশ কমানো হয়েছে। মূল এডিপিতে যেখানে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা, সেখানে সংশোধনের পর তা নেমে এসেছে মাত্র ৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকায়। শিক্ষা খাতেও বড় ধরনের কাটছাঁট হয়েছে। এই খাতে বরাদ্দ কমানো হয়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ।
এই সংশোধিত এডিপিতে মোট ১ হাজার ৩৩০টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্পের সংখ্যাই বেশি। পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে এসব প্রকল্পের মধ্য থেকে ২৮৬টি প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।




