শিরোনাম

ভেনেজুয়েলার বিনিময়ে ট্রাম্পের কাছে ইউক্রেন চেয়েছিলো রাশিয়া

সিটিজেন-ডেস্ক
ভেনেজুয়েলার বিনিময়ে ট্রাম্পের কাছে ইউক্রেন চেয়েছিলো রাশিয়া
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। (গেটি ইমেজ)

নজিরবিহীন এক অভিযানে গত শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে একাধিকবার ভেনেজুয়েলার যুদ্ধজাহাজ ও সীমান্তবর্তী এলাকায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, মাদুরোর দীর্ঘদিনের মিত্র ভ্লাদিমির পুতিন সেই সময় অনেকটাই নীরব থাকেন। এমনকি পুতিন নিজে এখনও ভেনেজুয়েলায় মার্কিন পদক্ষেপ নিয়ে মন্তব্য করেননি।

বুধবার (৭ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা সংস্থা এপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের প্রস্তুতি নিয়েছিল। বিনিময়ে তারা চেয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের ওপর থেকে তার সমর্থন সরিয়ে নিক। ঘটনাটি ২০১৯ সালের। ওই সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবারের মতো হোয়াইট হাউসে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন।

ট্রাম্পের তৎকালীন উপদেষ্টা ফিওনা হিলের মতে, ২০১৯ সালে রুশ কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের বিষয়ে নীরব থাকে, তবে ক্রেমলিন ভেনেজুয়েলায় মাদুরোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করতে রাজি।

২০১৯ সালে মার্কিন কংগ্রেসের শুনানিতে ফিওনা হিল জানিয়েছিলেন, রাশিয়ানরা বারবার ‘ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেনের মধ্যে এক অদ্ভুত বিনিময় ব্যবস্থার’ ইঙ্গিত দিয়েছিলো। মাদুরোকে গ্রেপ্তারের মার্কিন গোপন অভিযান সম্পন্ন হওয়ার পর চলতি সপ্তাহে হিলের সেই মন্তব্যগুলো আবারও সামনে এসেছে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে।

হিল জানান, রাশিয়া তাদের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন নিবন্ধের মাধ্যমে এই ধারণাটি প্রচার করেছিল, যেখানে ‘মনরো ডকট্রিন’-এর উল্লেখ ছিল। ১৯ শতকের এই নীতি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে ইউরোপীয় হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছিলো এবং বিনিময়ে ইউরোপীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করতে সম্মত হয়েছিলো। ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপের ন্যায্যতা দিতে এই নীতিটিই ব্যবহার করেছেন।

যদিও রাশিয়ার পক্ষ থেকে কখনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আসেনি, তবে তৎকালীন রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত আনাতোলি আন্তোনোভ হিলকে বহুবার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপে রাশিয়ার ইচ্ছামতো কাজ করতে দেয়, তবে রাশিয়াও যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনেজুয়েলায় অবাধ সুযোগ দিতে রাজি। চলতি সপ্তাহে হিল বলেন, “সে সময় এটা নিয়ে অনেক ইশারা-ইঙ্গিত ও গোপন প্রস্তাব ছিলো, কিন্তু তখন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কেউ তা গ্রহণে আগ্রহী ছিলো না।”

২০১৯ সালের এপ্রিলে ট্রাম্প তাঁর তৎকালীন রাশিয়া ও ইউরোপ বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ফিওনা হিলকে মস্কো পাঠিয়েছিলেন এই বার্তা পৌঁছে দিতে। হিল জানান, তিনি রুশ কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন, “ইউক্রেন এবং ভেনেজুয়েলা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।” তিনি আরও বলেন, সেই সময় হোয়াইট হাউস ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে মিত্রদের সঙ্গে একমত ছিলো।

কিন্তু সাত বছর পর পরিস্থিতি বদলেছে। মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে, তারা এখন থেকে ভেনেজুয়েলার নীতি ‘পরিচালনা’ করবে। এছাড়া, ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে, যা ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং ন্যাটো সামরিক জোটের অংশ, দখল করার হুমকিও দিয়েছেন। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী কোকেন ব্যবসায় সহায়তার অভিযোগে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ারও হুমকি উচ্চারণ করেছেন।

হিল বলেন, এতে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মতো বড় দেশগুলো নিজেদের ‘প্রভাববলয়’ তৈরি করবে—এই ধারণায় ক্রেমলিন ‘রোমাঞ্চিত’ হবে। কারণ, এটি প্রমাণ করে যে ‘জোর যার মুলুক তার।’

হিল বলেন, ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড এখন কিয়েভের মিত্রদের জন্য রাশিয়ার পরিকল্পনাকে ‘অবৈধ’ বলে নিন্দা জানানো কঠিন করে তুলেছে। কারণ ‘আমরা এমন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একটি বানোয়াট অজুহাতে অন্য একটি দেশের ক্ষমতা দখল করেছে অথবা অন্তত সেই দেশের সরকারকে হটিয়ে দিয়েছে।’

ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য ভেনেজুয়েলায় তাদের এই অভিযানকে একটি ‘আইন প্রয়োগকারী অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং জোর দিয়ে বলেছে যে মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা বৈধ ছিলো।

হিলের এই বক্তব্যের বিষয়ে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিজে এখনও ভেনেজুয়েলায় মার্কিন পদক্ষেপ নিয়ে মন্তব্য করেননি। তবে তার কূটনীতিকরা এটিকে ‘স্পষ্ট আগ্রাসনের কাজ’ হিসেবে নিন্দা করেছেন। রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং নিরাপত্তা পরিষদের সহ-সভাপতি দিমিত্রি মেদভেদেভ ওয়াশিংটনকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে দোষারোপ করেছেন। তবে ট্রাম্পকে তার দেশীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রশংসা করেছেন।

‘যদিও ট্রাম্পের পদক্ষেপ সম্পূর্ণ অবৈধ, তবে অস্বীকার করা যায় না যে তিনি এবং তার দল দেশের জাতীয় স্বার্থ খুব আগ্রাসীভাবে রক্ষা করছেন,’ বলেন মেডভেদেভ।

সূত্র: এপি

/জেএইচ/