শিরোনাম

চড়া দামেও মিলছে না গ্যাসের সিলিন্ডার, দিশাহারা মানুষ

চড়া দামেও মিলছে না গ্যাসের সিলিন্ডার, দিশাহারা মানুষ
এক পরিবেশকের গুদামে মজুত করে রাখা এলপিজি সিলিন্ডার। আজ সকালে রাজধানীর মাতুয়াইলে। ছবি:সিটিজেন জার্নাল

রাজধানীর কমলাপুরের বাসিন্দা সোলায়মান হোসেন ও মেরিনা হোসেন দম্পতি। বাসায় তিতাসের লাইন আছে। কিন্তু খুব ভোরে কিংবা রাতে ছাড়া গ্যাস পাওয়া যায় না। এ কারণে তাঁকে প্রতি মাসেই ১২ কেজি এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে হয়। তবে সরবার নির্ধারিত করা দামে তিনি কখনোই তা কিনতে পারেন না। বাড়তি ২০০-৩০০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়। তবে গত সপ্তাহে অনেক দোকান ঘুরেও গ্যাসের সিলিন্ডার পাননি।

কমলাপুরের মতো ঢাকা অন্যান্য এলাকার পরিস্থিতি একই রকম। লাইনের গ্যাসে স্বল্পচাপ, পাইপলাইন মেরামতের কারণে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এলপিজির সংকট ও চড়া দাম। অর্থাৎ ত্রিমুখী সংকটে সাধারণ ভোক্তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। দুই থেকে তিন গুন দাম দিয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাসের অভাবে অনেক বাসায় রান্না হচ্ছে না। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

তিতাস গ‍্যাস ট্রান্সমিশন অ‍্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির কয়েকজন গ্রাহকের অভিযোগ, নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করেও মিলছে না পাইপলাইনের গ্যাস। বাধ্য হয়ে রান্নার জন্য সিলিন্ডার কিনতে হলেও দাম বেশি। কিন্তু এখন তা-ও পাওয়া যায় না।

এই বিষয়ে এলপিজি আমদানি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান, এলপি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসায়ী, পরিবেশক ও দোকান মালিকেরা বলেন, প্রতি বছর শীতের মৌসুমে এলপিজির চাহিদা কিছুটা বেশি হয়। এ বছর শীত বেশি হওয়ায় চাহিদার পরিমানও বেশি। তবে সে অনুপাতে আমদানি বাড়েনি- বরং কমেছে। এর অর্থ হচ্ছে- একদিকে চাহিদা বেড়েছে, অপরদিকে আমদানি কমেছে- সব মিলিয়ে বাজারে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আগামী মাসের মধ্যেই ঠিক হয়ে আসবে।

পরিবেশকের গুদামে এলপিজি সিলিন্ডার সাজিয়ে রাখছেন এক শ্রমিক (ছবি: সিটিজেন জার্নাল)
পরিবেশকের গুদামে এলপিজি সিলিন্ডার সাজিয়ে রাখছেন এক শ্রমিক (ছবি: সিটিজেন জার্নাল)

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুইদিকেই ঘাটতি রয়েছে। সঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহ এবং বাজার তদারকি করত হবে। তাদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থা কীভাবে ঠিক রাখা যায় সেদিকে যেমন নজর দিতে হবে, তেমনি বাজারে নজরদারি খবরদারি বাড়াতে হবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর বিশিষ্ট ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, বাজারে আছে ৭০টি পণ্য, কিন্তু আমার প্রয়োজন ১০০ টি, তার মানে আমার ঘাটতি রয়েছে ৩০ টি। সুতরাং ঠিক সময়ে পণ্য আমদানি না করার কারণে বাজারে পণ্যের ঘাটতি রয়েছে- তা অনুমেয়। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে বাজার ব্যবস্থাপনা। অনেকেই সরকারের এ দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে মজুতদারি করছে, সিন্ডিকেটের সুযোগ নিচ্ছে। দুইদিকেই ঘাটতি রয়েছে।

ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতারা যা বলছেন

ব্যবসায়ীদের দাবি, সরবরাহ সংকটের কারণে বাজারে সিলিন্ডারের ঘাটতি এবং দাম বেড়েছে। কমলাপুর বাজার রোডের আশা স্যানিটারি স্টোরের বিক্রয়কর্মী বেলাল হোসেন বলেন, গত ১৭ দিন ধরে গ্যাসের দেখা মিলছে না বললেই চলে। পাইকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাস আমদানকিারক কোম্পানিগুলো থেকে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার যদি আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করে এবং নীতিগত সহায়তা দেয়, তাহলে আগামী মাসেই সংকট কাটতে পারে।

এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার যদি আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করে এবং নীতিগত সহায়তা দেয়, তাহলে আগামী মাসেই সংকট কাটতে পারে।

এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সদস্য উজ্জ্বল দে সিটিজেন জার্নালকে বলেন, এমনিতেই আমদানি ঘাটতি, শীতকালে বাড়তি চাহিদা এবং লাইনের গ্যাসের ঘাটতি- সব মিলেই বাজারে একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

পাইকারি পর্যায়ে কারসাজি হচ্ছে কী- না জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুই-একজন অসাধু ব্যবসায়ী এমন করতে পারে। আবার অনেক সময় দেখা গেলো, হয়তো ওই ব্যবসায়ীর ঘরে পণ্য আছে ৫ টা, কিন্তু চাহিদা আছে ১৫-২০ টা। সেক্ষেত্রে বাড়তি দাম যেখানে পাচ্ছে সেখানে বিক্রি করছে। তিনি আরো বলেন, এটা এমন একটা পণ্য যেটা লুকিয়ে বা মজুত করে রাখার কোনো সুযোগ নেই।

গ্যাসের সংকট নিয়ে ক্যাবের বক্তব্য

এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারের বাজারের এমন পরিস্থিতির জন্য সরকার ও ব্যবসায়ীদের যোগসাজশকেই দায়ী করছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, বছরের পর বছর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এই সংকটের জন্য সরকার নিজেই দায়ী এবং ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণকে ভোগান্তিতে রেখে ব্যবসায়ীদের সুবিধা করে দিচ্ছে।

ভোক্তা অধিকারের অভিযান চলছে

বাজার তদারকি ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক বিকাশ চন্দ্র দাস জানান, কিছু অসৎ ব্যবসায়ী মজুত গড়ে তুলেছে। যারা বেশি টাকা দিচ্ছে, তারাই গ্যাস পাচ্ছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান আছে।

আমদানিকারকদের বক্তব্য

এলপিজি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন সিটিজেন জার্নালকে বলেন, এখন এলপিজি আমদানি কমেছে। এতে বাজারে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক কোম্পানির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ঋণপত্রের (এলসি) জটিলতার কারণে আমদানি করতে সমস্যা হয়েছে।

যারা প্রকৃত আমদানিকারক, তাদের পক্ষ থেকে কোনো সংকট সৃষ্টি করা হয়নি বা দাম বাড়ানো হয়নি। মূলত মধ্যস্থতাকারীদের পক্ষ থেকে অর্থাৎ ডিলার, সাব ডিলারের পক্ষ থেকে এ ধরনের কারসাজি হয়েছে। তবে এ কথা সত্যি যে চাহিদার তুলনায় আমদানি অনেক কম হয়েছে
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চার লিমিটেড

তিনি আরও বলেন, যারা প্রকৃত আমদানিকারক, তাদের পক্ষ থেকে কোনো সংকট সৃষ্টি করা হয়নি বা দাম বাড়ানো হয়নি। মূলত মধ্যস্থতাকারীদের পক্ষ থেকে অর্থাৎ ডিলার, সাব ডিলারের পক্ষ থেকে এ ধরনের কারসাজি হয়েছে। তবে এ কথা সত্যি যে চাহিদার তুলনায় আমদানি অনেক কম হয়েছে।

আমদানি কম হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বরে আমাদের আমদানি একটু কম ছিল। আমদানি কম হওয়ার অন্যতম কারন ছিল- সরকার পারমিশন দেয়নি। যার যে পরিমান লিমিট ছিল, তা গত জুনের আগেই শেষ হয়ে গেছে। যেমন আমার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা ছিল এক লাখ ৮০ হাজার টন আমদানির। কিন্তু আমি ২ লাখ টনের বেশি আমি আমদানি করেছি। ফলে জুন থেকে আমিও গ্যাস আমদানি কমিয়ে দিয়েছি। ’

এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের ডিস্ট্রিবিউটর, পরিবেশক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাহিদা অনুযায়ী আমদানি না হওয়ায় ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে বাজারে এলপিজির সরবরাহ কমে গেছে।

সাভারে একটি দোকানে বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা গ্যাসের সিলিন্ডার (ছবি:সিটিজেন জার্নাল)
সাভারে একটি দোকানে বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা গ্যাসের সিলিন্ডার (ছবি:সিটিজেন জার্নাল)

কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা হলও তা ২২০০-২৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক স্থানে বেশি দাম দিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।

বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার গ্যাস নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করলে খুচরা ব্যবসায়ীর লাভ হয় মাত্র ৫০ টাকা। প্রতিদিন ২০০ সিলিন্ডার বিক্রি করলে লাভ হয় ১০ হাজার টাকা। কিন্তু সংকট ধরে বিক্রি করলে প্রতিটি সিলিন্ডারে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হয়। এতে লাভ দাঁড়ায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। সারা দেশের ৪ কোটি গ্রাহক ধরে হিসাব করলে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের লাভ প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা।

কমেছে আমদানি

এলপিজি আমদানি নিয়ে পিআইডির তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে ১ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি গ্যাস আমদানি করা হয়েছিল। তখন কোনো সংকট দেখা যায়নি। কিন্তু পরের মাসে আরও ২২ হাজার মেট্রিক টন বেশি আমদানি হলেও কৃত্রিম সংকট শুরু হয়।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালে তুলনায় গত বছর আমদানি কমেছে প্রায় দেড় লাখ টন। বছরের শেষ তিন মাসে আমদানি কমার হার ছিল বেশি। এতে বাজারে এলপিজির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

বর্তমানে এলপিজির যে সংকট, তা সরবরাহজনিত সংকট বলে করেন বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। এলপিজির বাজার নিয়ে গত বৃহস্পতিবার আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি বলেন, গত নভেম্বর পর্যন্ত ১৭০টি জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ছিল। ডিসেম্বরে আরও ২৯টি জাহাজ নিষেধাজ্ঞায় পড়েছে। ইরান থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। চীনের মতো বড় ক্রেতারাও এখন বৈশ্বিক এলপিজি বাজার থেকে কিনছে। তাই এলপিজি কেনা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

বাকি বিল্লাহ