শিরোনাম

ফিরে দেখা: ২০২৫

অর্থনীতিতে সংকট কাটেনি, বেড়েছে উৎকণ্ঠা

অর্থনীতিতে সংকট কাটেনি, বেড়েছে উৎকণ্ঠা

নানা চড়াই-উতরাই, নীতি-নির্ধারণী বিতর্ক এবং আইনি সংস্কারের ডামাডোলে শেষ হয়েছে আরেকটি বছর। টালমাটাল অর্থনীতি আর নিত্যপণ্যের পাগলা ঘোড়ার লাগাম টানতে টানতে চলে এসেছে ক্যালেন্ডারের শেষ পৃষ্ঠা। দেশে মূল্যস্ফীতি, জিডিপি, রপ্তানি, বিনিয়োগ, খেলাপি ঋণ আদায়ের চ্যালেঞ্জ, প্রায় তিন শতাধিক শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়ার বছর ছিল ২০২৫।

তবে রেমিট্যান্সে সুবাতাস ছিল, অপর দিকে, দেশের বাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে। ফলে রিজার্ভ কিছুটা স্বাস্থ্যবান হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি তথ্যে এমন চিত্র ফুটে উঠেছে।

সার্বিকভাবে বিদায়ী বছরে অর্থনীতির রক্তক্ষরণ কিছুটা থেমেছে। লুটপাটে লাগাম পড়েছে। নিম্নমুখী যাত্রা রোধ হয়েছে। ডলার সংকট কেটেছে। টাকার মানে স্থিতিশীলতা ফিরেছে। মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করেছে কিন্তু তা এখনো ঝুঁকির পর্যায়ে আছে। বিদায়ী বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি একদিকে যেমন সংস্কারের পথে হেঁটেছে, অন্যদিকে পুরনো সংকট ও নতুন কিছু সিদ্ধান্তে অস্থিরতাও বিরাজ করেছে।

ঊর্ধ্বমুখী দ্রব্যমূল্যকে বাগে এনে সাধারণের মধ্যে স্বস্তি আনা আর কর্মসংস্থান ও সরকারি ব্যয় বাড়ানোর পথ খুঁজতে গিয়ে খেই হারিয়েছে সরকার। বছরজুড়ে অর্থনীতিকে পেছনে টেনে ধরা অন্য সব সূচকের পাশাপাশি পোশাকসহ শিল্প-কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ, বিদ্যুৎ-জ্বালানির সরবরাহ সংকট, ব্যাংকে তারল্য সংকট, উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণে উল্লম্ফনের ধারাবাহিকতা অর্থনীতিকে আরো বেশি দুর্বল করেছে। তবে এত কিছুর পরেও অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরেও দেশের সার্বিক অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। অর্থনীতিতে আস্থার সংকট কাটেনি। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা কমেনি। ঋণের সুদহার এখনো বেশি। বেসরকারি খাতের মন্দা কাটছে না। ফলে বিনিয়োগ বাড়ছে না। কর্মসংস্থানের গতি খুবই ধীর।

ছোট উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে বড় উদ্যোক্তা– কারো মুখেই যেন হাসি নেই। হোটেল, রেস্তোরাঁতেও নেই কাঙ্ক্ষিত ভিড়। শিল্পোদ্যোক্তা, কলকারখানার মালিক ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রায় সবাই রয়েছেন পর্যবেক্ষকের ভূমিকায়। শেয়ারবাজারে চলছে রক্তক্ষরণ। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অনেকেই নিঃস্ব হয়ে পথে ঘুরছেন। গত এক বছরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার জেরে বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেক শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা যায়নি। রেমিট্যান্স বাড়লেও ডলারের দাম কমেনি। বছরের শুরুতে প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি থাকা মূল্যস্ফীতি বছর শেষেও ৮ শতাংশের ওপরেই অবস্থান করছে। কোটি টাকা ব্যয়ে সম্মেলন করেও কাঙ্ক্ষিত বিদেশি বিনিয়োগ মেলেনি এবং আর্থিক খাতের সংস্কার আটকে আছে কেবল ৫টি ব্যাংকে।

ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধের প্রভাবে শেষ কয়েক মাসে রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। অর্থনীতিবিদরা বলেন, বাংলাদেশ এখনো পূর্ণাঙ্গ মন্দার মধ্যে না পড়লেও স্থায়ী মূল্যস্ফীতি, স্থবির মজুরি, কর্মসংস্থান হ্রাস– বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এবং দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ মিলিয়ে একটি অর্থনৈতিক দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা এখন নির্বাচিত সরকারের দিকেই তাকিয়ে আছেন অর্থনীতির চাকা সচল করার আশায়।

ড. মুস্তফা কে মুজেরী। ছবি: সংগৃহীত
ড. মুস্তফা কে মুজেরী। ছবি: সংগৃহীত

জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী সিটিজেন জার্নালকে বলেন, এককথায় বলতে গেলে, অর্থনীতিতে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়েছে– এমন কথা বলা যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, ব্যাংক খাতের সংস্কার করতে গিয়ে যেসব পদক্ষেপ বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়েছে তার কতটা বাস্তবায়িত হবে সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।

পাঁচ দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার বিষয়ে একটি বড় পদক্ষেপ ছিল, কিন্তু বর্তমানে একীভূত করার পদক্ষেপ অনেকটা থমকে গেছে। তাছাড়া এই পাঁচ ব্যাংক এক করে আদৌ কোনো শক্তিশালী ব্যাংক হবে কি না– তা বোঝা যাচ্ছে না। সরকারি বা স্বায়ত্বশাসিত কোনো ব্যাংকই ভালো অবস্থানে নেই। এটিও সরকারের একটি ব্যাংক হতে যাচ্ছে। সুতরাং আগের ব্যাংকগুলোই সরকার ভালো করতে পারছে না, নতুন করে এটা নিয়ে সরকার কী করবে তা বুঝতে পারছি না।

আর্থিকখাতের সংস্কার নিয়ে ড. মুজেরী আরো বলেন, ব্যাংকখাতের অন্যান্য যে সংস্কারগুলো হয়েছে– তাও লক্ষণীয় কোনো দৃশ্যমান নয় বা কোনো অগ্রগতিও নেই। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সরকার অনেকটাই ব্যর্থ। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির বড় একটি অংশ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু দেড় বছরে সেই জায়গাতে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ঘরে অবস্থান করছে। সামনে নির্বাচন, ফলে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, আগামী দিনে অর্থনীতি আরো খারাপের দিকে যাবে বলে মনে হয়। অর্থাৎ ২০২৬ সালে অর্থনীতি আরো বেশি চাপের মধ্যে পড়বে। একদিকে নির্বাচনের প্রভাব, অন্যদিকে রমজান কেন্দ্রিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার চাপ– সবকিছু মিলিয়ে আগামী মাসগুলোতে স্বস্তি ফিরবে বলে মনে হচ্ছে না। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিতে আরো অবনতি হতে পারে। বর্তমান সময়ে যেসব ঘটনা ঘটছে, তাতে শুধু ব্যবসায়ী-ই নন, সাধারণ মানুষও আতঙ্কিত। কাজেই সবকিছু মিলিয়ে স্বস্তির জায়গা তৈরি হয়নি, বরং অস্বস্তির জায়গাই বেশি বেড়েছে বলে মনে করেন ড. মুজেরী।

মূল্যস্ফীতিতে অস্বস্তি

২০২৫ সাল জুড়েই বেসামাল দ্রব্যমূল্য ভুগিয়েছে সাধারণ মানুষকে। বছরের শুরুতেই অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে প্রায় ১০ শতাংশ বা ডাবল ডিজিট দাঁড়ায় মূল্যস্ফীতি। অর্থাৎ ২০২৪ সালের ১০০ টাকার পণ্য ২০২৫ সালে ১১০ টাকায় কিনতে হয়েছে ভোক্তাদের। এরপর ফেব্রুয়ারি মাসে রোজা শুরু হলে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে নিত্যপণ্যের দাম। বিশেষ করে সয়াবিন তেলের দাম অনেক বেড়ে যায়। ফল-সবজির দামও লাগামহীন হয়ে পড়ে। প্রতি মাসের মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি ভুগিয়েছে মানুষকে।

গত অর্থবছরের মতো চলতি অর্থবছরেও (২০২৫-২৬) বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্য ঘোষণা করেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তারপরও দাম কমানো সম্ভব হয়নি। চাল, আটা, মশুর ডাল, সয়াবিন তেল, মাছ, মাংস, বেগুনসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে সোয়া ৬ থেকে ২০ শতাংশ। অন্তর্বর্তী সরকার মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর তিন দফায় নীতিসুদ (রেপো) হার বাড়ান।

তারপরও বাগে আসেনি মূল্যস্ফীতি। কারণ আলু ছাড়া প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে বছরজুড়ে। সয়াবিন তেলের দাম গত ১৫ এপ্রিল, ৩ আগস্ট ও ৫ ডিসেম্বর মোট তিন দফায় বাড়ানো হয়েছে। ১৭৫ টাকার তেল ১৯৫ টাকা লিটার হয়েছে। এভাবে প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে ২০২৫ সালে। প্রায় সব সবজির কেজি ১০০ টাকার ওপরে বিক্রি হয়।

পেঁয়াজ সংগ্রহে শ্রমিক। ছবি: সংগৃহীত
পেঁয়াজ সংগ্রহে শ্রমিক। ছবি: সংগৃহীত

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এবং কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যও বলছে, ২০২৫ সালে চালের মূল্য বেড়েছে গড়ে সোয়া ৬ শতাংশ, আটায় ১০ শতাংশ, মশুর ডালে প্রায় ১৫ শতাংশ, সয়াবিন তেলে ১১ শতাংশ। এমনকী দেশে চাহিদার তুলনায় বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও কয়েক দফায় মূল্য বেড়েছে ২০ শতাংশ। সবজির মধ্যে বেগুনের দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ। বছরের অধিকাংশ সময় করলা, টমেটো, কাঁচামরিচ, শসাসহ প্রায় সবজি ১০০ টাকার ওপরে কিনতে হয়েছে ভোক্তাদের। শুধু তা-ই নয়, মাছ, মাংসের দামও চড়া ছিল বছরজুড়ে।

তলানিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাবে গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে। ২০২০ সালের করোনা মহামারী সংকটের পর এই প্রথম প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নামল। অর্থ মন্ত্রণালয়ও এখন বাস্তবতা মেনে নিয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। সরকার কৃষি ও শিল্প খাতের ওপর ভরসা রাখলেও বিশ্বব্যাংক ও এডিবি মনে করছে, প্রবৃদ্ধি ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যেই থাকবে।

রপ্তানি খাতে নিম্নগতি

চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের ধারা বিলীন হতে শুরু করে। বছরের শুরুতে রপ্তানি ভালো থাকলেও গত চার মাসে তা অনেকটাই কমে গেছে। সবশেষ নভেম্বরে দেশের রপ্তানি আয় কমেছে সাড়ে ৫ শতাংশের বেশি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্যে এ চিত্র দেখা গেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমলের শুল্কনীতির কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রপ্তানি খাতে। নভেম্বরে রপ্তানি আয় ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার।

ইপিবির তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নভেম্বরে দেশ থেকে ৩৮৯ কোটি ১৫ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই মাসে ছিল ৪১১ কোটি ৯৭ লাখ ডলার। এ হিসাবে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় নভেম্বরে রপ্তানি আয় কমেছে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এর আগে আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেও রপ্তানি কমেছে। আগস্টে এ হার ছিল ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ৪ দশমিক ৬১ ও অক্টোবরে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ রপ্তানি খাতে অর্থবছরের শুরুতে প্রায় ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও পাঁচ মাস পর এসে তা কমে দশমিক ৬২ শতাংশে ঠেকেছে।

এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, রপ্তানি খাতে আগামী দুই-তিন মাস নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে। কারণ এখনো পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। সবচেয়ে বেশি সমস্যার কারণ ব্যাংক খাত, এছাড়া রয়েছে কাস্টমসের নানা সমস্যা।

স্মরণকালের সবচেয়ে নিচে বেসরকারি বিনিয়োগ

দেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ খরা দিন দিন প্রকট হওয়ার কারণে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি স্মরণকালের সবচেয়ে নিচে নেমে এসেছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিনিয়োগ নেমে এসেছে মাত্র দশমিক ১ শতাংশে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একেবারে সর্বনিম্ন। এমনকী কোভিড মহামারীর সময় লকডাউনে শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তখন প্রবৃদ্ধি ছিল দশমিক ২ শতাংশ। বাস্তবে অর্থনীতি স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি বিনিয়োগের এমন পতন চলমান স্থবিরতার গভীর সংকেত বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এরপর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এটি ৮ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে যায়। কোভিডের কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র দশমিক ২ শতাংশ। তবে লকডাউন তুলে নেয়ার পর অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করলে ২০২০-২১ অর্থবছরে বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৭ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়ায়। এর পরের ২০২১-২২ অর্থবছরে এটি আরো বেড়ে হয় ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। অবশ্য ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিতে বড় ধস নামে। সেই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ। এর পরের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কিছুটা বেড়ে প্রবৃদ্ধি হয় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে মাত্র দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে প্রাক্কলন করেছে বিশ্বব্যাংক।

ব্যবসায়ীদের দাবি, রড-সিমেন্ট, টেক্সটাইল, কোমল পানীয়সহ বিভিন্ন খাতে চাহিদা নেই; গ্রামে-গঞ্জে বিদ্যুৎ ঘাটতি; স্থানীয় বাজারে কেনাকাটা কমে গেছে; মূল্যস্ফীতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দোকান-পাট, রেস্তোরাঁ, পোশাক বিক্রি সবখানেই খরচ কমছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বিক্রি কমে যাওয়ায় কারখানাগুলো ধুঁকছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই ঋণ স্থিতি ঋণাত্মক ধারায় নেমে গেছে। ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে অনীহা, বরং সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগকেই নিরাপদ ও লাভজনক মনে করছে। নীতি সুদহার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে নেয়া এবং ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশে ওঠায় উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে আগ্রহ হারিয়েছেন। ব্যাংকাররা বলছেন, অনেকে শিল্প সম্প্রসারণ বা নতুন কারখানা তৈরির ঝুঁকি নিতে চাইছেন না; আবার যারা ঋণ নিতে চান তারাও উচ্চ সুদের চাপে পিছিয়ে আসছেন। এতে বেসরকারি খাতে প্রকৃত ঋণপ্রবাহ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

রাজস্ব আহরণে লক্ষমাত্রায় ঘাটতি

রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে এনবিআর। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) রাজস্ব আহরণে ঘাটতি ২৪ হাজার ৪৭ কোটি টাকা। প্রতি বছরের মতো শুল্ক-কর আদায়ে এবার পেছনে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি এনবিআর।

এনবিআরের হিসাব অনুসারে, গত জুলাই-নভেম্বর সময়ে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৭৩ হাজার ২৩ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় ১ লাখ ৪৮ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। এ সময়ে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি।

এনবিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে শ্লথগতি থাকায় রাজস্ব আদায় তুলনামূলক কম হয়েছে। তবে বছরের শেষদিকে রাজস্ব আদায়ে গতি বাড়বে বলে মনে করেন তারা। কর্মকর্তারা বলেন, করের আওতা বৃদ্ধি, কর পরিপালন নিশ্চিতকরণ, কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পুনরুদ্ধারের কাজ করছে এনবিআর।

খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জে ব্যাংক খাত

বিদায়ী বছরে ব্যাংকিং খাতের জন্য ছিল বড় ধরনের সংস্কারের বছর। পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ পরিবর্তন করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বছর শেষেও এসব ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকেরা তাদের আমানত ফেরত পাননি। পাহাড়সম খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের বিশাল চ্যালেঞ্জ এখনো ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরেই খেলাপি ঋণের ভারে নুয়ে আছে এ খাত। সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরিত ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূতকরণ নীতিতে জোর দেয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল অকার্যকর ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করে আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষা দেয়া। এর অংশ হিসেবে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হয়। তবে গ্রাহকদের অর্থ ফেরতের বিষয়ে এখনো পুরোপুরি স্বস্তি দিতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

সাভারের পলাশবাড়ী এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বিক্ষোভ। ছবি: সংগৃহীত
সাভারের পলাশবাড়ী এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বিক্ষোভ। ছবি: সংগৃহীত

একে একে বন্ধ হচ্ছে শিল্প-কারখানা

নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনের অন্যতম নির্দেশক মূলধনি যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমদানির এলসির পরিমাণ গত অর্থবছরে ২৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি স্পষ্টই দেখাচ্ছে যে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন না, বরং উৎপাদন টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছেন।

পুঁজিবাজার-নির্ভর বিনিয়োগও কমে গেছে। গত এক বছরে তালিকাভুক্ত উৎপাদন খাতের মাত্র ১২টি কোম্পানি নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে, যা এক দশকে সর্বনিম্ন। সিমেন্ট শিল্পের সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে; কারণ সরকারি প্রকল্প নেই, অবকাঠামোগত নির্মাণ কমে গেছে, আবাসন স্থবির। রড-সিমেন্ট কারখানাও একই সমস্যায়। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ জানায়, অর্ধেকের বেশি শিল্প কারখানা অর্ধক্ষমতায় চলছে, অনেকে একেবারেই বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ঐতিহাসিকভাবে এত কম প্রবৃদ্ধি অপ্রত্যাশিত, তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এলে আগামী বছরে কিছু উন্নতি হতে পারে। তিনি মনে করেন, জ্বালানি ঘাটতি দূর করা এবং আর্থিক খাতকে সুশৃঙ্খল না করলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।

সিপিডি পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। ছবি: সংগৃহীত
সিপিডি পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। ছবি: সংগৃহীত

বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বেড়েছে

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পরিচালক ফাহমিদা খাতুন শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য তুলে ধরে কর্মসংস্থানের উদ্বেগজনক সংকোচনের কথা বলেন। জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট কর্মসংস্থান কমেছে ১৭ লাখ ৪০ হাজার, যার মধ্যে ১৬ লাখ ৪০ হাজার অর্থাৎ প্রায় ৯৪ শতাংশই হলেন নারী। তিনি বলেন, এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। বৈষম্য কমাতে মানসম্মত ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান অপরিহার্য বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বিশ্বব্যাংক ও পিপিআরসির জরিপের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য উভয়ই বেড়েছে। তিনি বলেন, এখানে প্যারাডক্স বা বিরোধাভাস হলো– যত বেশি শিক্ষিত, চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা তত কমে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে তীব্র অসামঞ্জস্য এর প্রধান কারণ।

প্রবাসী আয়ে উল্লম্ফন

বছরজুড়ে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লম্ফন দেখা গেছে। চলতি মাস ডিসেম্বরের প্রথম ২৮ দিনে দেশে এসেছে প্রায় ২৯৪ কোটি (২৯৩ কোটি ৬০ লাখ) ডলারের প্রবাসী আয়। দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ৩৫ হাজার (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে) ৮১৯ কোটি ২০ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই থেকে ডিসেম্বরের ২৮ তারিখ পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৫৯৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪১ কোটি ৬০ লাখ ডলার বেশি। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ১ হাজার ৩৫৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্স আসার প্রবৃদ্ধি ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ।

এদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বরের ৬ তারিখ পর্যন্ত ১ হাজার ৩৬৭ কোটি ১০ লাখ ডলার এসেছে। গত বছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৭৩ কোটি ২০ লাখ ডলার। সেই হিসাবে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৯৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার বেশি এসেছে। অর্থবছর হিসাবে রেমিট্যান্স আসার প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

রিজার্ভ বেড়েছে

প্রবাসী আয়ের উপরে ভর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরো বেড়েছে। গত ২৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যালেন্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল (বিপিএম-৬) পদ্ধতি অনুযায়ী, দেশের নিট রিজার্ভ বর্তমানে ২৮ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। গত ১১ ডিসেম্বর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার। আর আইএমএফের নির্ধারিত বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে যা ছিল ২৭ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।

নিট রিজার্ভ গণনা করা হয় আইএমএফের বিপিএম-৬ পরিমাপ অনুসারে। মোট রিজার্ভ থেকে স্বল্পমেয়াদি দায় বিয়োগ করলে নিট বা প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ পাওয়া যায়।