জনতার এক শাখাতেই শীর্ষ ২০ খেলাপি পোশাক খাতের

জনতার এক শাখাতেই শীর্ষ ২০ খেলাপি পোশাক খাতের
মরিয়ম সেঁজুতি

তৈরি পোশাক খাতের খেলাপি ঋণ আদায়ে চাপে পড়েছে জনতা ব্যাংক পিএলসি। রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকের একটি শাখাতেই শীর্ষ ২০ ঋণগ্রহীতার কাছে ব্যাংকটির পাওনা প্রায় ৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। তাদের প্রত্যেকেই তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ী। প্রায় সবার ঋণই পুনঃতফসিল করা হয়েছে।
জনতা ব্যাংক সূত্র জানা গেছে, ব্যাংকটির ঢাকার মতিঝিলের লোকাল অফিস শাখায় এই ঋণ পুনঃতফসিলের ঘটনা ঘটেছে। এই শাখায় একই প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক ঋণ হিসাব রয়েছে। এর সবই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা কর্মসূচির আওতায় নেওয়া মেয়াদি ঋণ, যা পুনঃতফসিল হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা না থাকলেও পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ওই ঋণ কাগজে-কলমে ‘চলমান’ রাখা হয়েছে। তবে খেলাপিদের ঋণ পুনঃতফসিল করার বিষয়টি ওই শাখা থেকে করা হয়নি বলে জানিয়েছেন শাখা ব্যবস্থাপক ডিজিএম আবদুল মালেক।
পুনঃতফসিলের আড়ালে ‘নিয়মিত’ ঋণ
মতিঝিলের লোকাল অফিস শাখায় এই ঘটনা ঘটেছে। একটি শাখায় একই খাতের পুনঃতফসিলকৃত ঋণ এমনভাবে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় নিয়ন্ত্রকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রস্তুত করা ব্যাংকটির ওই শাখার অভ্যন্তরীণ নথির তথ্য অনুযায়ী, শাখাটির ঋণ খেলাপির তালিকায় শীর্ষে ক্রিসেন্ট ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ঋণের পরিমাণ ৫৮৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৬ হাজার ৮৪৯ টাকা। এরপরেই রয়েছে হোয়াইট বে অ্যাপারেলস লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ৫৩০ কোটি ৯২ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭৩ টাকা। ইন্ট নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেডের ঋণের পরিমাণ ৪৭৯ কোটি ৯৪ লাখ ৪১ হাজার ১৯ টাকা। নাইস ফেব্রিকস প্রসেসিং লিমিটেডের ঋণ ৪৭০ কোটি ০৯ লাখ ৬৪ হাজার ২৬৩ টাকা।
কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে একাধিক হিসাব নম্বরে ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এর মধ্য আছে উইন্টার স্প্রিন্ট গার্মেন্টস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির একটি হিসাব নম্বরে ঋণ ৩৮৫ কোটি ৭০ লাখ ৯৬ হাজার ৫১৬ টাকা, আরেকটিতে ৩৭৯ কোটি ২১ লাখ ৮৯ হাজার ২৫৬ টাকা। পিয়ারলেস গার্মেন্টস লিমিটেডের একটি হিসাবে ঋণ ৩৬৯ কোটি ১২ লাখ ৩৪ হাজার ৯৯৮ টাকা, আরেকটিতে ৩৫৮ কোটি ৬৮ লাখ ৯১ হাজার ৪৫৭ টাকা। মিডওয়েস্ট গার্মেন্টস লিমিটেডের একটি হিসাবে ৩৭৪ কোটি ৩৩ হাজার ৫৫৫ টাকা, আরেকটিতে ৩৫০ কোটি ৮৪ লাখ ২১ হাজার ৯১২ টাকা ঋণ।
এ ছাড়া পিংক মেকার গার্মেন্টস লিমিটেডের ঋণ ৩৯৪ কোটি ২৩ লাখ ৫২ হাজার ৩১৩ টাকা, প্লাটিনাম গার্মেন্টস লিমিটেডের ৩৮০ কোটি ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৯২ টাকা, কাঁচপুর অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৩৭৮ কোটি ৯৮ লাখ ১৯ হাজার ৬৮৫ টাকা, কোজি অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৩৭২ কোটি ৯৯ লাখ ৬৯ হাজার ৩২৪ টাকা, স্প্রিং ফুল অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৩৭২ কোটি ৫০ লাখ ১৮ হাজার ৪৬৪ টাকা, কসমোপলিটান অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৩৪৬ কোটি ৪৯ লাখ ২৯ হাজার ২৬১ টাকা, নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ৩৩৭ কোটি ২১ লাখ ১৪ হাজার ৭৭৫ টাকা, অটম লুপ অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৩২৯ কোটি ৪৯ লাখ ৫ হাজার ৩০১ টাকা, এমএস লামিসা স্পিনিং লিমিটেডের ৩২৯ কোটি ৩১ লাখ ৫৯ হাজার ৩৮১ টাকা ও বেক্সিমকো ফ্যাশনস লিমিটেডের ৩২৭ কোটি ৯৫ লাখ ৮২ হাজার ৮২৫ টাকা।

ঋণের বিষয়ে জানার জন্য ক্রিসেন্ট ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু নাইম সালেহীনের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। তার মোবাইল নম্বরে খুদেবার্তা পাঠালেও কোনো সাড়া দেননি।
আমি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী না। আমাদের ল’ইয়ার (আইনজীবি) রয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা বিষয়টি দেখছেন, তারাই কথা বলবেন
শাজিয়া জামান ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্প্রিন্ট গার্মেন্টস লিমিটেড
স্প্রিন্ট গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাজিয়া জামান। জনতা ব্যাংকের ঋণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী না। আমাদের ল’ইয়ার (আইনজীবি) রয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা বিষয়টি দেখছেন, তারাই কথা বলবেন।’
অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বেশিরভাগের মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, 'বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানা ছিল ৭ হাজারের বেশি। গত নির্বাচনে তা কমে হয়েছে ২০০০। গত এক বছরে আড়াই থেকে তিনশ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। এজন্য অনেকগুলো কারণ রয়েছে। অন্যতম কারণ হচ্ছে রানা প্লাজা ধ্বসের পর অ্যাকর্ড- অ্যালায়েন্সের নিয়মের মধ্যে পড়ে বিল্ডিং কোডে পড়ে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান এক্সিট করতে বাধ্য হয়েছে'
বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানা ছিল ৭ হাজারের বেশি। গত নির্বাচনে তা কমে হয়েছে ২০০০। গত এক বছরে আড়াই থেকে তিনশ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। এজন্য অনেকগুলো কারণ রয়েছে। অন্যতম কারণ হচ্ছে রানা প্লাজা ধ্বসের পর অ্যাকর্ড- অ্যালায়েন্সের নিয়মের মধ্যে পড়ে বিল্ডিং কোডে পড়ে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান এক্সিট করতে বাধ্য হয়েছে
সেলিম রহমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিজিএমইএ
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পোশাক খাতে যুক্ত না, কিন্তু কোনোভাবে একটা কারখানা দেখিয়ে বড় ঋণ নিয়েছে। সে তো প্রথমেই চিন্তা করেছে- এই টাকা পরিশোধ করবে না। অর্থাৎ ইচ্ছাকৃত খেলাপি। পোশাক খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের মালিক কিন্তু খেলাপি না। বা তাদের কোনো সমস্যাও হয়নি।’
তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অংশ রপ্তানি খাত, তথা পোশাক খাত। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে পোশাক খাতের লেনদেনই বেশি। পোশাক খাতের ব্যবসা মূলত ব্যাংক নির্ভর। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি পোশাক খাত ভালো নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ৪-৫ হাজার কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করছি বলেই যে ভালো আছি– বিষয়টি তেমন নয়। আমি কি লাভ করছি, নাকি কোনোরকম ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি– সেটিও দেখতে হবে। করোনা মহামারি থেকেই মূলত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায়। কোভিডের একটি বড় দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা এসেছে, যা আমরা এখন অনুভব করছি। এ ছাড়া বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অস্থিরতা, ট্রাম্প সরকারের পাল্টা শুল্ক– সব নিয়েই খারাপ অবস্থায় আছি।’

ব্যাংকের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাতের এই ২০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৮টিরই ঋণ হিসাবের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ক্যাটাগরি ১৭৫৪ উল্লেখ রয়েছে, যা স্পষ্ট করে- ঋণগ্রহীতারা তৈরি পোশাক খাতের। সূত্র বলছে, এই হিসাব এখনো চূড়ান্ত নয়। নিরীক্ষা শেষ হলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।
জনতা ব্যাংকের তিনটি শাখায় ঋণ খেলাপির বড় ঘটনা ঘটেছে। এগুলো হলো– জনতা ভবন, লোকাল অফিস এবং চট্টগ্রামের একটি শাখা
মজিবর রহমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনতা ব্যাংক
এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, জনতা ব্যাংকের তিনটি শাখায় ঋণ খেলাপির বড় ঘটনা ঘটেছে। এগুলো হলো– জনতা ভবন, লোকাল অফিস এবং চট্টগ্রামের একটি শাখা।’
তিনি আরও বলেন, ‘জনতা ব্যাংকে ঋণ খেলাপির বড় একটি অংশ দখল করে আছে বেক্সিমকো। ফলে পোশাক খাতে প্রভাব পড়ার এটিও একটি বড় কারণ। এনন টেক্সও প্রভাব ফেলছে।’
খেলাপি ঋণ আদায়ের বিষয়ে মজিবর রহমান বলেন, ‘খেলাপি ঋণ আদায়ে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। অনেকের সম্পদ ক্রোক করছি। মামলার ক্ষেত্রে ফলোআপ করছি। মাঠপর্যায়েও খেলাপি ঋণ আদায়ে জোর প্রচেষ্টা চলছে।’
জনতা ব্যাংকে ঋণ খেলাপির বড় একটি অংশ দখল করে আছে বেক্সিমকো। ফলে পোশাক খাতে প্রভাব পড়ার এটিও একটি বড় কারণ। এনন টেক্সও প্রভাব ফেলছে
মজিবর রহমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনতা ব্যাংক
তিনি আরও বলেন, ‘এরপরও গত বছর আমদানি-রপ্তানি নানা ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছে। এসব কারণে রপ্তানিখাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সেভাবে বিনিয়োগ করতে পারেনি। ডলারের দর ওঠা-নামাও একটা প্রভাব ফেলেছে। বিদেশি ক্রেতারাও বর্তমানে হাত খুলে বিনিয়োগ করছে না।’ নির্বাচনের পর পরিস্থিতি হয়তো স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে এ ব্যাপারে জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিসের শাখা ব্যবস্থাপক ডিজিএম আবদুল মালেক সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমাদের এ শাখা থেকে কোনো ঋণ পুনঃতফসিল করানো হয়নি। জনতা ব্যাংকের প্রধান শাখার ক্রেডিট ডিভিশন এ বিষয়গুলো দেখছে। তারা ভালো বলতে পারবে।’
পুনঃতফসিল ঋণ কী?
সহজভাবে বলতে গেলে যখন কোনো ঋণগ্রহীতা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারেন না, তখন সেই ঋণ খেলাপি হয়ে যায়। খেলাপি ঋণকে নতুন করে পরিশোধের সুবিধার জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী মেয়াদ বাড়ানো, কিস্তি পুনর্বিন্যাস বা এককালীন পরিশোধের সুযোগ দেয়; একেই পুনঃতফসিল বা রিশিডিউলিং বলে।
পরস্পর যোগসাজশে পুনঃতফসিল
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, পুনঃতফসিল একটি ব্যতিক্রমী সহায়তা, এটি নিয়ম নয়। কিন্তু এখন পুনঃতফসিলই যেন হয়ে উঠেছে ঋণ ব্যবস্থাপনার মূল হাতিয়ার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, যখন একটি শাখার শীর্ষ ঋণগ্রহীতাদের প্রায় সবাই পুনঃতফসিল সুবিধাভোগী, তখন সেটি আর সহায়তা থাকে না– এটি হয়ে ওঠে খেলাপি আড়াল করার কৌশল।
ওই তালিকার অধিকাংশ ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ব্যাক-টু-ব্যাক লেটার অব ক্রেডিটের (বিবিএলসি) বিপরীতে দেওয়া হয়েছে। মূলত, রপ্তানি বাণিজ্যে সাপ্লায়ারকে (কাঁচামাল সরবরাহকারী) অর্থ পরিশোধের জন্য মূল ঋণপত্রের (এলসি) অধীনে এক বা একাধিক ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়। এটি একটি নির্দিষ্ট (যেমন ৪৫ থেকে ১৪৫ দিন) সময়ের জন্য ইস্যু করা হয়। এর ভিত্তিতে সরবরাহকারীরা তাদের কাঁচামাল বা অন্যান্য খরচ মেটানোর জন্য ব্যাংক থেকে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের ঋণ (টার্ম লোন) পান, যা মূল চুক্তির ভিত্তিতে পরিশোধিত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তা কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল উৎপাদন ও কর্মসংস্থান রক্ষা। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলছেন, এই অর্থ কি আদৌ উৎপাদন ধরে রাখতে ব্যবহৃত হয়েছে, নাকি পুরোনো দায় মেটাতেই ঘুরে-ফিরে ব্যবহৃত হয়েছে?
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হওয়ায় জনতা ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রমের ওপর অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি নজরদারি করার কথা। তবে একটি শাখায় একই খাতের পুনঃতফসিলকৃত ঋণ এমনভাবে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় নিয়ন্ত্রকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘নির্ধারিতভাবে পোশাক খাতেই খেলাপি ঋণ বেশি-এমনটা বলা যাবে না। নির্ধারিত কিছু ব্যাংকের গ্রাহক হিসেবে পোশাক খাত রয়েছে। তবে তারা কেন ঋণখেলাপি হচ্ছে- এ বিষয় ওই প্রতিষ্ঠানগুলো এবং নির্ধারিত ব্যাংকই বলতে পারবে।’
পুনঃতফসিল তখনই হবে যখন তা খেলাপিতে পরিণত হবে। অনেক প্রতিষ্ঠানই আছে, যারা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও হয়তো ভালোভাবে ব্যবসায় লাভ করতে পারেননি। ফলে যে সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করার কথা, সেই সময়ে দিতে পারেনি
আরিফ হোসেন খান মুখপাত্র বাংলাদেশ ব্যাংক
ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়ে মুখপাত্র বলেন, ‘পুনঃতফসিল তখনই হবে যখন তা খেলাপিতে পরিণত হবে। অনেক প্রতিষ্ঠানই আছে, যারা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও হয়তো ভালোভাবে ব্যবসায় লাভ করতে পারেননি। ফলে যে সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করার কথা, সেই সময়ে দিতে পারেনি।’
একই প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক হিসাবের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টি বৈধ এবং একটি প্রতিষ্ঠান একাধিক হিসাব খুলতে পারে। ওই প্রতিষ্ঠানের পোর্টফোলিও হিসাব করলে সবগুলো অ্যাকাউন্ট একত্র করেই হিসাব করা হবে।’
ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়টিকে যেভাবে দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা খেলাপিদের ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়টিকে ব্যাংকিং খাতের বড় দুর্বলতা বা অনিয়ম হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, এটি শুধু একটি শাখার চিত্র নয়, বরং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ‘লুকোচুরি’র নগ্ন উদাহরণ।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বিগত দিনে বড় ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের যাচাই করা হয়নি। আবার ব্যাংকের ভেতরেও এক ধরনের গ্রুপ থাকে যারা এ ধরনের অনৈতিক কাজে সহযোগিতা করেছে। কখনো কখনো ব্যাংকের বোর্ডও এর সঙ্গে যুক্ত থাকে। আবার এসব ব্যাংক অন্য ব্যাংকের ঋণখেলাপিকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করেছে, যেমন– হাবিব হোটেল। সুতরাং, উভয় পক্ষই এজন্য দায়ী।’

তৈরি পোশাক খাতের খেলাপি ঋণ আদায়ে চাপে পড়েছে জনতা ব্যাংক পিএলসি। রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকের একটি শাখাতেই শীর্ষ ২০ ঋণগ্রহীতার কাছে ব্যাংকটির পাওনা প্রায় ৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। তাদের প্রত্যেকেই তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ী। প্রায় সবার ঋণই পুনঃতফসিল করা হয়েছে।
জনতা ব্যাংক সূত্র জানা গেছে, ব্যাংকটির ঢাকার মতিঝিলের লোকাল অফিস শাখায় এই ঋণ পুনঃতফসিলের ঘটনা ঘটেছে। এই শাখায় একই প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক ঋণ হিসাব রয়েছে। এর সবই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা কর্মসূচির আওতায় নেওয়া মেয়াদি ঋণ, যা পুনঃতফসিল হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা না থাকলেও পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ওই ঋণ কাগজে-কলমে ‘চলমান’ রাখা হয়েছে। তবে খেলাপিদের ঋণ পুনঃতফসিল করার বিষয়টি ওই শাখা থেকে করা হয়নি বলে জানিয়েছেন শাখা ব্যবস্থাপক ডিজিএম আবদুল মালেক।
পুনঃতফসিলের আড়ালে ‘নিয়মিত’ ঋণ
মতিঝিলের লোকাল অফিস শাখায় এই ঘটনা ঘটেছে। একটি শাখায় একই খাতের পুনঃতফসিলকৃত ঋণ এমনভাবে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় নিয়ন্ত্রকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রস্তুত করা ব্যাংকটির ওই শাখার অভ্যন্তরীণ নথির তথ্য অনুযায়ী, শাখাটির ঋণ খেলাপির তালিকায় শীর্ষে ক্রিসেন্ট ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ঋণের পরিমাণ ৫৮৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৬ হাজার ৮৪৯ টাকা। এরপরেই রয়েছে হোয়াইট বে অ্যাপারেলস লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ৫৩০ কোটি ৯২ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭৩ টাকা। ইন্ট নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেডের ঋণের পরিমাণ ৪৭৯ কোটি ৯৪ লাখ ৪১ হাজার ১৯ টাকা। নাইস ফেব্রিকস প্রসেসিং লিমিটেডের ঋণ ৪৭০ কোটি ০৯ লাখ ৬৪ হাজার ২৬৩ টাকা।
কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে একাধিক হিসাব নম্বরে ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এর মধ্য আছে উইন্টার স্প্রিন্ট গার্মেন্টস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির একটি হিসাব নম্বরে ঋণ ৩৮৫ কোটি ৭০ লাখ ৯৬ হাজার ৫১৬ টাকা, আরেকটিতে ৩৭৯ কোটি ২১ লাখ ৮৯ হাজার ২৫৬ টাকা। পিয়ারলেস গার্মেন্টস লিমিটেডের একটি হিসাবে ঋণ ৩৬৯ কোটি ১২ লাখ ৩৪ হাজার ৯৯৮ টাকা, আরেকটিতে ৩৫৮ কোটি ৬৮ লাখ ৯১ হাজার ৪৫৭ টাকা। মিডওয়েস্ট গার্মেন্টস লিমিটেডের একটি হিসাবে ৩৭৪ কোটি ৩৩ হাজার ৫৫৫ টাকা, আরেকটিতে ৩৫০ কোটি ৮৪ লাখ ২১ হাজার ৯১২ টাকা ঋণ।
এ ছাড়া পিংক মেকার গার্মেন্টস লিমিটেডের ঋণ ৩৯৪ কোটি ২৩ লাখ ৫২ হাজার ৩১৩ টাকা, প্লাটিনাম গার্মেন্টস লিমিটেডের ৩৮০ কোটি ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৯২ টাকা, কাঁচপুর অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৩৭৮ কোটি ৯৮ লাখ ১৯ হাজার ৬৮৫ টাকা, কোজি অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৩৭২ কোটি ৯৯ লাখ ৬৯ হাজার ৩২৪ টাকা, স্প্রিং ফুল অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৩৭২ কোটি ৫০ লাখ ১৮ হাজার ৪৬৪ টাকা, কসমোপলিটান অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৩৪৬ কোটি ৪৯ লাখ ২৯ হাজার ২৬১ টাকা, নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ৩৩৭ কোটি ২১ লাখ ১৪ হাজার ৭৭৫ টাকা, অটম লুপ অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৩২৯ কোটি ৪৯ লাখ ৫ হাজার ৩০১ টাকা, এমএস লামিসা স্পিনিং লিমিটেডের ৩২৯ কোটি ৩১ লাখ ৫৯ হাজার ৩৮১ টাকা ও বেক্সিমকো ফ্যাশনস লিমিটেডের ৩২৭ কোটি ৯৫ লাখ ৮২ হাজার ৮২৫ টাকা।

ঋণের বিষয়ে জানার জন্য ক্রিসেন্ট ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু নাইম সালেহীনের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। তার মোবাইল নম্বরে খুদেবার্তা পাঠালেও কোনো সাড়া দেননি।
আমি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী না। আমাদের ল’ইয়ার (আইনজীবি) রয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা বিষয়টি দেখছেন, তারাই কথা বলবেন
শাজিয়া জামান ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্প্রিন্ট গার্মেন্টস লিমিটেড
স্প্রিন্ট গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাজিয়া জামান। জনতা ব্যাংকের ঋণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী না। আমাদের ল’ইয়ার (আইনজীবি) রয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা বিষয়টি দেখছেন, তারাই কথা বলবেন।’
অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বেশিরভাগের মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, 'বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানা ছিল ৭ হাজারের বেশি। গত নির্বাচনে তা কমে হয়েছে ২০০০। গত এক বছরে আড়াই থেকে তিনশ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। এজন্য অনেকগুলো কারণ রয়েছে। অন্যতম কারণ হচ্ছে রানা প্লাজা ধ্বসের পর অ্যাকর্ড- অ্যালায়েন্সের নিয়মের মধ্যে পড়ে বিল্ডিং কোডে পড়ে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান এক্সিট করতে বাধ্য হয়েছে'
বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানা ছিল ৭ হাজারের বেশি। গত নির্বাচনে তা কমে হয়েছে ২০০০। গত এক বছরে আড়াই থেকে তিনশ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। এজন্য অনেকগুলো কারণ রয়েছে। অন্যতম কারণ হচ্ছে রানা প্লাজা ধ্বসের পর অ্যাকর্ড- অ্যালায়েন্সের নিয়মের মধ্যে পড়ে বিল্ডিং কোডে পড়ে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান এক্সিট করতে বাধ্য হয়েছে
সেলিম রহমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিজিএমইএ
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পোশাক খাতে যুক্ত না, কিন্তু কোনোভাবে একটা কারখানা দেখিয়ে বড় ঋণ নিয়েছে। সে তো প্রথমেই চিন্তা করেছে- এই টাকা পরিশোধ করবে না। অর্থাৎ ইচ্ছাকৃত খেলাপি। পোশাক খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের মালিক কিন্তু খেলাপি না। বা তাদের কোনো সমস্যাও হয়নি।’
তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অংশ রপ্তানি খাত, তথা পোশাক খাত। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে পোশাক খাতের লেনদেনই বেশি। পোশাক খাতের ব্যবসা মূলত ব্যাংক নির্ভর। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি পোশাক খাত ভালো নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ৪-৫ হাজার কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করছি বলেই যে ভালো আছি– বিষয়টি তেমন নয়। আমি কি লাভ করছি, নাকি কোনোরকম ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি– সেটিও দেখতে হবে। করোনা মহামারি থেকেই মূলত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায়। কোভিডের একটি বড় দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা এসেছে, যা আমরা এখন অনুভব করছি। এ ছাড়া বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অস্থিরতা, ট্রাম্প সরকারের পাল্টা শুল্ক– সব নিয়েই খারাপ অবস্থায় আছি।’

ব্যাংকের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাতের এই ২০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৮টিরই ঋণ হিসাবের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ক্যাটাগরি ১৭৫৪ উল্লেখ রয়েছে, যা স্পষ্ট করে- ঋণগ্রহীতারা তৈরি পোশাক খাতের। সূত্র বলছে, এই হিসাব এখনো চূড়ান্ত নয়। নিরীক্ষা শেষ হলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।
জনতা ব্যাংকের তিনটি শাখায় ঋণ খেলাপির বড় ঘটনা ঘটেছে। এগুলো হলো– জনতা ভবন, লোকাল অফিস এবং চট্টগ্রামের একটি শাখা
মজিবর রহমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনতা ব্যাংক
এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, জনতা ব্যাংকের তিনটি শাখায় ঋণ খেলাপির বড় ঘটনা ঘটেছে। এগুলো হলো– জনতা ভবন, লোকাল অফিস এবং চট্টগ্রামের একটি শাখা।’
তিনি আরও বলেন, ‘জনতা ব্যাংকে ঋণ খেলাপির বড় একটি অংশ দখল করে আছে বেক্সিমকো। ফলে পোশাক খাতে প্রভাব পড়ার এটিও একটি বড় কারণ। এনন টেক্সও প্রভাব ফেলছে।’
খেলাপি ঋণ আদায়ের বিষয়ে মজিবর রহমান বলেন, ‘খেলাপি ঋণ আদায়ে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। অনেকের সম্পদ ক্রোক করছি। মামলার ক্ষেত্রে ফলোআপ করছি। মাঠপর্যায়েও খেলাপি ঋণ আদায়ে জোর প্রচেষ্টা চলছে।’
জনতা ব্যাংকে ঋণ খেলাপির বড় একটি অংশ দখল করে আছে বেক্সিমকো। ফলে পোশাক খাতে প্রভাব পড়ার এটিও একটি বড় কারণ। এনন টেক্সও প্রভাব ফেলছে
মজিবর রহমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনতা ব্যাংক
তিনি আরও বলেন, ‘এরপরও গত বছর আমদানি-রপ্তানি নানা ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছে। এসব কারণে রপ্তানিখাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সেভাবে বিনিয়োগ করতে পারেনি। ডলারের দর ওঠা-নামাও একটা প্রভাব ফেলেছে। বিদেশি ক্রেতারাও বর্তমানে হাত খুলে বিনিয়োগ করছে না।’ নির্বাচনের পর পরিস্থিতি হয়তো স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে এ ব্যাপারে জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিসের শাখা ব্যবস্থাপক ডিজিএম আবদুল মালেক সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমাদের এ শাখা থেকে কোনো ঋণ পুনঃতফসিল করানো হয়নি। জনতা ব্যাংকের প্রধান শাখার ক্রেডিট ডিভিশন এ বিষয়গুলো দেখছে। তারা ভালো বলতে পারবে।’
পুনঃতফসিল ঋণ কী?
সহজভাবে বলতে গেলে যখন কোনো ঋণগ্রহীতা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারেন না, তখন সেই ঋণ খেলাপি হয়ে যায়। খেলাপি ঋণকে নতুন করে পরিশোধের সুবিধার জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী মেয়াদ বাড়ানো, কিস্তি পুনর্বিন্যাস বা এককালীন পরিশোধের সুযোগ দেয়; একেই পুনঃতফসিল বা রিশিডিউলিং বলে।
পরস্পর যোগসাজশে পুনঃতফসিল
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, পুনঃতফসিল একটি ব্যতিক্রমী সহায়তা, এটি নিয়ম নয়। কিন্তু এখন পুনঃতফসিলই যেন হয়ে উঠেছে ঋণ ব্যবস্থাপনার মূল হাতিয়ার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, যখন একটি শাখার শীর্ষ ঋণগ্রহীতাদের প্রায় সবাই পুনঃতফসিল সুবিধাভোগী, তখন সেটি আর সহায়তা থাকে না– এটি হয়ে ওঠে খেলাপি আড়াল করার কৌশল।
ওই তালিকার অধিকাংশ ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ব্যাক-টু-ব্যাক লেটার অব ক্রেডিটের (বিবিএলসি) বিপরীতে দেওয়া হয়েছে। মূলত, রপ্তানি বাণিজ্যে সাপ্লায়ারকে (কাঁচামাল সরবরাহকারী) অর্থ পরিশোধের জন্য মূল ঋণপত্রের (এলসি) অধীনে এক বা একাধিক ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়। এটি একটি নির্দিষ্ট (যেমন ৪৫ থেকে ১৪৫ দিন) সময়ের জন্য ইস্যু করা হয়। এর ভিত্তিতে সরবরাহকারীরা তাদের কাঁচামাল বা অন্যান্য খরচ মেটানোর জন্য ব্যাংক থেকে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের ঋণ (টার্ম লোন) পান, যা মূল চুক্তির ভিত্তিতে পরিশোধিত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তা কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল উৎপাদন ও কর্মসংস্থান রক্ষা। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলছেন, এই অর্থ কি আদৌ উৎপাদন ধরে রাখতে ব্যবহৃত হয়েছে, নাকি পুরোনো দায় মেটাতেই ঘুরে-ফিরে ব্যবহৃত হয়েছে?
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হওয়ায় জনতা ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রমের ওপর অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি নজরদারি করার কথা। তবে একটি শাখায় একই খাতের পুনঃতফসিলকৃত ঋণ এমনভাবে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় নিয়ন্ত্রকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘নির্ধারিতভাবে পোশাক খাতেই খেলাপি ঋণ বেশি-এমনটা বলা যাবে না। নির্ধারিত কিছু ব্যাংকের গ্রাহক হিসেবে পোশাক খাত রয়েছে। তবে তারা কেন ঋণখেলাপি হচ্ছে- এ বিষয় ওই প্রতিষ্ঠানগুলো এবং নির্ধারিত ব্যাংকই বলতে পারবে।’
পুনঃতফসিল তখনই হবে যখন তা খেলাপিতে পরিণত হবে। অনেক প্রতিষ্ঠানই আছে, যারা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও হয়তো ভালোভাবে ব্যবসায় লাভ করতে পারেননি। ফলে যে সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করার কথা, সেই সময়ে দিতে পারেনি
আরিফ হোসেন খান মুখপাত্র বাংলাদেশ ব্যাংক
ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়ে মুখপাত্র বলেন, ‘পুনঃতফসিল তখনই হবে যখন তা খেলাপিতে পরিণত হবে। অনেক প্রতিষ্ঠানই আছে, যারা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও হয়তো ভালোভাবে ব্যবসায় লাভ করতে পারেননি। ফলে যে সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করার কথা, সেই সময়ে দিতে পারেনি।’
একই প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক হিসাবের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টি বৈধ এবং একটি প্রতিষ্ঠান একাধিক হিসাব খুলতে পারে। ওই প্রতিষ্ঠানের পোর্টফোলিও হিসাব করলে সবগুলো অ্যাকাউন্ট একত্র করেই হিসাব করা হবে।’
ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়টিকে যেভাবে দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা খেলাপিদের ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়টিকে ব্যাংকিং খাতের বড় দুর্বলতা বা অনিয়ম হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, এটি শুধু একটি শাখার চিত্র নয়, বরং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ‘লুকোচুরি’র নগ্ন উদাহরণ।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বিগত দিনে বড় ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের যাচাই করা হয়নি। আবার ব্যাংকের ভেতরেও এক ধরনের গ্রুপ থাকে যারা এ ধরনের অনৈতিক কাজে সহযোগিতা করেছে। কখনো কখনো ব্যাংকের বোর্ডও এর সঙ্গে যুক্ত থাকে। আবার এসব ব্যাংক অন্য ব্যাংকের ঋণখেলাপিকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করেছে, যেমন– হাবিব হোটেল। সুতরাং, উভয় পক্ষই এজন্য দায়ী।’

জনতার এক শাখাতেই শীর্ষ ২০ খেলাপি পোশাক খাতের
মরিয়ম সেঁজুতি

তৈরি পোশাক খাতের খেলাপি ঋণ আদায়ে চাপে পড়েছে জনতা ব্যাংক পিএলসি। রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকের একটি শাখাতেই শীর্ষ ২০ ঋণগ্রহীতার কাছে ব্যাংকটির পাওনা প্রায় ৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। তাদের প্রত্যেকেই তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ী। প্রায় সবার ঋণই পুনঃতফসিল করা হয়েছে।
জনতা ব্যাংক সূত্র জানা গেছে, ব্যাংকটির ঢাকার মতিঝিলের লোকাল অফিস শাখায় এই ঋণ পুনঃতফসিলের ঘটনা ঘটেছে। এই শাখায় একই প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক ঋণ হিসাব রয়েছে। এর সবই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা কর্মসূচির আওতায় নেওয়া মেয়াদি ঋণ, যা পুনঃতফসিল হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা না থাকলেও পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ওই ঋণ কাগজে-কলমে ‘চলমান’ রাখা হয়েছে। তবে খেলাপিদের ঋণ পুনঃতফসিল করার বিষয়টি ওই শাখা থেকে করা হয়নি বলে জানিয়েছেন শাখা ব্যবস্থাপক ডিজিএম আবদুল মালেক।
পুনঃতফসিলের আড়ালে ‘নিয়মিত’ ঋণ
মতিঝিলের লোকাল অফিস শাখায় এই ঘটনা ঘটেছে। একটি শাখায় একই খাতের পুনঃতফসিলকৃত ঋণ এমনভাবে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় নিয়ন্ত্রকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রস্তুত করা ব্যাংকটির ওই শাখার অভ্যন্তরীণ নথির তথ্য অনুযায়ী, শাখাটির ঋণ খেলাপির তালিকায় শীর্ষে ক্রিসেন্ট ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ঋণের পরিমাণ ৫৮৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৬ হাজার ৮৪৯ টাকা। এরপরেই রয়েছে হোয়াইট বে অ্যাপারেলস লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ৫৩০ কোটি ৯২ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭৩ টাকা। ইন্ট নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেডের ঋণের পরিমাণ ৪৭৯ কোটি ৯৪ লাখ ৪১ হাজার ১৯ টাকা। নাইস ফেব্রিকস প্রসেসিং লিমিটেডের ঋণ ৪৭০ কোটি ০৯ লাখ ৬৪ হাজার ২৬৩ টাকা।
কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে একাধিক হিসাব নম্বরে ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এর মধ্য আছে উইন্টার স্প্রিন্ট গার্মেন্টস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির একটি হিসাব নম্বরে ঋণ ৩৮৫ কোটি ৭০ লাখ ৯৬ হাজার ৫১৬ টাকা, আরেকটিতে ৩৭৯ কোটি ২১ লাখ ৮৯ হাজার ২৫৬ টাকা। পিয়ারলেস গার্মেন্টস লিমিটেডের একটি হিসাবে ঋণ ৩৬৯ কোটি ১২ লাখ ৩৪ হাজার ৯৯৮ টাকা, আরেকটিতে ৩৫৮ কোটি ৬৮ লাখ ৯১ হাজার ৪৫৭ টাকা। মিডওয়েস্ট গার্মেন্টস লিমিটেডের একটি হিসাবে ৩৭৪ কোটি ৩৩ হাজার ৫৫৫ টাকা, আরেকটিতে ৩৫০ কোটি ৮৪ লাখ ২১ হাজার ৯১২ টাকা ঋণ।
এ ছাড়া পিংক মেকার গার্মেন্টস লিমিটেডের ঋণ ৩৯৪ কোটি ২৩ লাখ ৫২ হাজার ৩১৩ টাকা, প্লাটিনাম গার্মেন্টস লিমিটেডের ৩৮০ কোটি ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৯২ টাকা, কাঁচপুর অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৩৭৮ কোটি ৯৮ লাখ ১৯ হাজার ৬৮৫ টাকা, কোজি অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৩৭২ কোটি ৯৯ লাখ ৬৯ হাজার ৩২৪ টাকা, স্প্রিং ফুল অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৩৭২ কোটি ৫০ লাখ ১৮ হাজার ৪৬৪ টাকা, কসমোপলিটান অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৩৪৬ কোটি ৪৯ লাখ ২৯ হাজার ২৬১ টাকা, নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ৩৩৭ কোটি ২১ লাখ ১৪ হাজার ৭৭৫ টাকা, অটম লুপ অ্যাপারেলস লিমিটেডের ৩২৯ কোটি ৪৯ লাখ ৫ হাজার ৩০১ টাকা, এমএস লামিসা স্পিনিং লিমিটেডের ৩২৯ কোটি ৩১ লাখ ৫৯ হাজার ৩৮১ টাকা ও বেক্সিমকো ফ্যাশনস লিমিটেডের ৩২৭ কোটি ৯৫ লাখ ৮২ হাজার ৮২৫ টাকা।

ঋণের বিষয়ে জানার জন্য ক্রিসেন্ট ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু নাইম সালেহীনের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। তার মোবাইল নম্বরে খুদেবার্তা পাঠালেও কোনো সাড়া দেননি।
আমি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী না। আমাদের ল’ইয়ার (আইনজীবি) রয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা বিষয়টি দেখছেন, তারাই কথা বলবেন
শাজিয়া জামান ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্প্রিন্ট গার্মেন্টস লিমিটেড
স্প্রিন্ট গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাজিয়া জামান। জনতা ব্যাংকের ঋণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী না। আমাদের ল’ইয়ার (আইনজীবি) রয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা বিষয়টি দেখছেন, তারাই কথা বলবেন।’
অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বেশিরভাগের মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, 'বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানা ছিল ৭ হাজারের বেশি। গত নির্বাচনে তা কমে হয়েছে ২০০০। গত এক বছরে আড়াই থেকে তিনশ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। এজন্য অনেকগুলো কারণ রয়েছে। অন্যতম কারণ হচ্ছে রানা প্লাজা ধ্বসের পর অ্যাকর্ড- অ্যালায়েন্সের নিয়মের মধ্যে পড়ে বিল্ডিং কোডে পড়ে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান এক্সিট করতে বাধ্য হয়েছে'
বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানা ছিল ৭ হাজারের বেশি। গত নির্বাচনে তা কমে হয়েছে ২০০০। গত এক বছরে আড়াই থেকে তিনশ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। এজন্য অনেকগুলো কারণ রয়েছে। অন্যতম কারণ হচ্ছে রানা প্লাজা ধ্বসের পর অ্যাকর্ড- অ্যালায়েন্সের নিয়মের মধ্যে পড়ে বিল্ডিং কোডে পড়ে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান এক্সিট করতে বাধ্য হয়েছে
সেলিম রহমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিজিএমইএ
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পোশাক খাতে যুক্ত না, কিন্তু কোনোভাবে একটা কারখানা দেখিয়ে বড় ঋণ নিয়েছে। সে তো প্রথমেই চিন্তা করেছে- এই টাকা পরিশোধ করবে না। অর্থাৎ ইচ্ছাকৃত খেলাপি। পোশাক খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের মালিক কিন্তু খেলাপি না। বা তাদের কোনো সমস্যাও হয়নি।’
তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অংশ রপ্তানি খাত, তথা পোশাক খাত। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে পোশাক খাতের লেনদেনই বেশি। পোশাক খাতের ব্যবসা মূলত ব্যাংক নির্ভর। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি পোশাক খাত ভালো নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ৪-৫ হাজার কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করছি বলেই যে ভালো আছি– বিষয়টি তেমন নয়। আমি কি লাভ করছি, নাকি কোনোরকম ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি– সেটিও দেখতে হবে। করোনা মহামারি থেকেই মূলত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায়। কোভিডের একটি বড় দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা এসেছে, যা আমরা এখন অনুভব করছি। এ ছাড়া বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অস্থিরতা, ট্রাম্প সরকারের পাল্টা শুল্ক– সব নিয়েই খারাপ অবস্থায় আছি।’

ব্যাংকের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাতের এই ২০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৮টিরই ঋণ হিসাবের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ক্যাটাগরি ১৭৫৪ উল্লেখ রয়েছে, যা স্পষ্ট করে- ঋণগ্রহীতারা তৈরি পোশাক খাতের। সূত্র বলছে, এই হিসাব এখনো চূড়ান্ত নয়। নিরীক্ষা শেষ হলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।
জনতা ব্যাংকের তিনটি শাখায় ঋণ খেলাপির বড় ঘটনা ঘটেছে। এগুলো হলো– জনতা ভবন, লোকাল অফিস এবং চট্টগ্রামের একটি শাখা
মজিবর রহমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনতা ব্যাংক
এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, জনতা ব্যাংকের তিনটি শাখায় ঋণ খেলাপির বড় ঘটনা ঘটেছে। এগুলো হলো– জনতা ভবন, লোকাল অফিস এবং চট্টগ্রামের একটি শাখা।’
তিনি আরও বলেন, ‘জনতা ব্যাংকে ঋণ খেলাপির বড় একটি অংশ দখল করে আছে বেক্সিমকো। ফলে পোশাক খাতে প্রভাব পড়ার এটিও একটি বড় কারণ। এনন টেক্সও প্রভাব ফেলছে।’
খেলাপি ঋণ আদায়ের বিষয়ে মজিবর রহমান বলেন, ‘খেলাপি ঋণ আদায়ে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। অনেকের সম্পদ ক্রোক করছি। মামলার ক্ষেত্রে ফলোআপ করছি। মাঠপর্যায়েও খেলাপি ঋণ আদায়ে জোর প্রচেষ্টা চলছে।’
জনতা ব্যাংকে ঋণ খেলাপির বড় একটি অংশ দখল করে আছে বেক্সিমকো। ফলে পোশাক খাতে প্রভাব পড়ার এটিও একটি বড় কারণ। এনন টেক্সও প্রভাব ফেলছে
মজিবর রহমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনতা ব্যাংক
তিনি আরও বলেন, ‘এরপরও গত বছর আমদানি-রপ্তানি নানা ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছে। এসব কারণে রপ্তানিখাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সেভাবে বিনিয়োগ করতে পারেনি। ডলারের দর ওঠা-নামাও একটা প্রভাব ফেলেছে। বিদেশি ক্রেতারাও বর্তমানে হাত খুলে বিনিয়োগ করছে না।’ নির্বাচনের পর পরিস্থিতি হয়তো স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে এ ব্যাপারে জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিসের শাখা ব্যবস্থাপক ডিজিএম আবদুল মালেক সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমাদের এ শাখা থেকে কোনো ঋণ পুনঃতফসিল করানো হয়নি। জনতা ব্যাংকের প্রধান শাখার ক্রেডিট ডিভিশন এ বিষয়গুলো দেখছে। তারা ভালো বলতে পারবে।’
পুনঃতফসিল ঋণ কী?
সহজভাবে বলতে গেলে যখন কোনো ঋণগ্রহীতা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারেন না, তখন সেই ঋণ খেলাপি হয়ে যায়। খেলাপি ঋণকে নতুন করে পরিশোধের সুবিধার জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী মেয়াদ বাড়ানো, কিস্তি পুনর্বিন্যাস বা এককালীন পরিশোধের সুযোগ দেয়; একেই পুনঃতফসিল বা রিশিডিউলিং বলে।
পরস্পর যোগসাজশে পুনঃতফসিল
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, পুনঃতফসিল একটি ব্যতিক্রমী সহায়তা, এটি নিয়ম নয়। কিন্তু এখন পুনঃতফসিলই যেন হয়ে উঠেছে ঋণ ব্যবস্থাপনার মূল হাতিয়ার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, যখন একটি শাখার শীর্ষ ঋণগ্রহীতাদের প্রায় সবাই পুনঃতফসিল সুবিধাভোগী, তখন সেটি আর সহায়তা থাকে না– এটি হয়ে ওঠে খেলাপি আড়াল করার কৌশল।
ওই তালিকার অধিকাংশ ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ব্যাক-টু-ব্যাক লেটার অব ক্রেডিটের (বিবিএলসি) বিপরীতে দেওয়া হয়েছে। মূলত, রপ্তানি বাণিজ্যে সাপ্লায়ারকে (কাঁচামাল সরবরাহকারী) অর্থ পরিশোধের জন্য মূল ঋণপত্রের (এলসি) অধীনে এক বা একাধিক ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়। এটি একটি নির্দিষ্ট (যেমন ৪৫ থেকে ১৪৫ দিন) সময়ের জন্য ইস্যু করা হয়। এর ভিত্তিতে সরবরাহকারীরা তাদের কাঁচামাল বা অন্যান্য খরচ মেটানোর জন্য ব্যাংক থেকে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের ঋণ (টার্ম লোন) পান, যা মূল চুক্তির ভিত্তিতে পরিশোধিত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তা কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল উৎপাদন ও কর্মসংস্থান রক্ষা। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলছেন, এই অর্থ কি আদৌ উৎপাদন ধরে রাখতে ব্যবহৃত হয়েছে, নাকি পুরোনো দায় মেটাতেই ঘুরে-ফিরে ব্যবহৃত হয়েছে?
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হওয়ায় জনতা ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রমের ওপর অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি নজরদারি করার কথা। তবে একটি শাখায় একই খাতের পুনঃতফসিলকৃত ঋণ এমনভাবে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় নিয়ন্ত্রকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘নির্ধারিতভাবে পোশাক খাতেই খেলাপি ঋণ বেশি-এমনটা বলা যাবে না। নির্ধারিত কিছু ব্যাংকের গ্রাহক হিসেবে পোশাক খাত রয়েছে। তবে তারা কেন ঋণখেলাপি হচ্ছে- এ বিষয় ওই প্রতিষ্ঠানগুলো এবং নির্ধারিত ব্যাংকই বলতে পারবে।’
পুনঃতফসিল তখনই হবে যখন তা খেলাপিতে পরিণত হবে। অনেক প্রতিষ্ঠানই আছে, যারা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও হয়তো ভালোভাবে ব্যবসায় লাভ করতে পারেননি। ফলে যে সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করার কথা, সেই সময়ে দিতে পারেনি
আরিফ হোসেন খান মুখপাত্র বাংলাদেশ ব্যাংক
ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়ে মুখপাত্র বলেন, ‘পুনঃতফসিল তখনই হবে যখন তা খেলাপিতে পরিণত হবে। অনেক প্রতিষ্ঠানই আছে, যারা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও হয়তো ভালোভাবে ব্যবসায় লাভ করতে পারেননি। ফলে যে সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করার কথা, সেই সময়ে দিতে পারেনি।’
একই প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক হিসাবের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টি বৈধ এবং একটি প্রতিষ্ঠান একাধিক হিসাব খুলতে পারে। ওই প্রতিষ্ঠানের পোর্টফোলিও হিসাব করলে সবগুলো অ্যাকাউন্ট একত্র করেই হিসাব করা হবে।’
ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়টিকে যেভাবে দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা খেলাপিদের ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়টিকে ব্যাংকিং খাতের বড় দুর্বলতা বা অনিয়ম হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, এটি শুধু একটি শাখার চিত্র নয়, বরং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ‘লুকোচুরি’র নগ্ন উদাহরণ।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বিগত দিনে বড় ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের যাচাই করা হয়নি। আবার ব্যাংকের ভেতরেও এক ধরনের গ্রুপ থাকে যারা এ ধরনের অনৈতিক কাজে সহযোগিতা করেছে। কখনো কখনো ব্যাংকের বোর্ডও এর সঙ্গে যুক্ত থাকে। আবার এসব ব্যাংক অন্য ব্যাংকের ঋণখেলাপিকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করেছে, যেমন– হাবিব হোটেল। সুতরাং, উভয় পক্ষই এজন্য দায়ী।’




