শিরোনাম

স্নায়ুরোগে বাড়ছে মৃত্যু, প্রতি ৫ লাখ মানুষের জন্য একজন চিকিৎসক

স্নায়ুরোগে বাড়ছে মৃত্যু, প্রতি ৫ লাখ মানুষের জন্য একজন চিকিৎসক
বাংলাদেশে স্নায়বিক রোগের প্রকোপ ও সংকট (ছবি: সিটিজেন জার্নাল গ্রাফিক্স)

ডায়াবেটিস, ক্যানসার ও হৃদরোগের মতো স্নায়ুরোগ জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকির সৃষ্টি করেছে। রোগটির ব্যাপকতা জনস্বাস্থ্যবিদদের দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। চিকিৎসক সংকট, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা, পরিবেশদূষণ, শহর ও গ্রামে চিকিৎসা সেবায় বৈষম্যসহ নানা কারণে এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশের ১৭-১৯ লাখ মানুষ স্নায়ুজনিত নানা রোগে আক্রান্ত।

সম্প্রতি চিকিৎসাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘হেলথ সায়েন্স রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেশে স্নায়ুরোগের চিকিৎসার এই উদ্বেগজনক চিত্রই ফুটে উঠেছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (স্ট্রোক), মৃগী (এপিলেপসি), পার্কিনসন এবং মেনিনজাইটিসের মতো রোগগুলো দেশে মৃত্যুহার, পঙ্গুত্ব এবং চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (স্ট্রোক), মৃগী (এপিলেপসি), পার্কিনসন এবং মেনিনজাইটিসের মতো রোগগুলো দেশে মৃত্যুহার, পঙ্গুত্ব এবং চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করছে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতি হাজার মানুষের জন্য একজন চিকিৎসক থাকা দরকার। অথচ বাংলাদেশে ১৮ কোটি মানুষের জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা এক লাখ ৪১ হাজার ৪৯৯ জন। এর মধ্যে স্নায়ূরোগ বিশেষজ্ঞ মাত্র ৩৫০ জন। অর্থাৎ পাঁচ লাখ ১৪ হাজার মানুষের জন্য মাত্র একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। দেশে প্রতি লাখে একজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল সূত্র এ তথ্য জানা গেছে।

স্নায়ুজনিত নানা রোগের মধ্যে শীর্ষে স্ট্রোক

বাংলাদেশে স্নায়ুজনিত নানা রোগের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে স্ট্রোক এই বিষয়ে ‘হেলথ সায়েন্স রিপোর্টস’-এর ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্নায়ুজনিত জটিলতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৭৪ শতাংশই স্ট্রোকে আক্রান্ত। দেশে প্রতি লাখ মানুষের মধ্যে বছরে প্রায় ১৪৫ দশমিক ৩ জন নতুন করে স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন। বর্তমানে প্রতি লাখে প্রায় ৫৮৫ জন স্ট্রোকের সমস্যা নিয়ে বেঁচে আছেন। স্ট্রোক দীর্ঘমেয়াদি প্রতিবন্ধিতা—পক্ষাঘাত, কথা বলার সমস্যা এবং স্মৃতিশক্তি হ্রাসের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশে প্রতি লাখ মানুষের মধ্যে বছরে প্রায় ১৪৫ দশমিক ৩ জন নতুন করে স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন।

মৃগী রোগও বড় হুমকি

স্ট্রোকের পাশাপাশি মৃগী রোগও দেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকির সৃষ্টি করছে। প্রতি লাখে প্রায় ৪১২ দশমিক ৩ জন এই রোগে আক্রান্ত। এ ছাড়া পার্কিনসন এবং মেনিনজাইটিসের প্রকোপও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে পার্কিনসন রোগে আক্রান্তের হার প্রতি লাখে প্রায় ৮৬ জন। মেনিনজাইটিসের ক্ষেত্রে এই হার ৩৪ দশমিক ৭।

স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের সংকট যে কারণে

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর হিমু বলেন, ‘দেশে অপরিকল্পিতভাবে চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে। উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগে চিকিৎসক অনেক। অথচ জটিল রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বেশি তৈরি হচ্ছে না। এ ছাড়া চিকিৎসাও ঢাকা কেন্দ্রিক। অথচ এই চিকিৎসা বিভাগীয় পর্যায়ে সুযোগ থাকলে ভালো হতো।’

দেশে অপরিকল্পিতভাবে চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে। উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগে চিকিৎসক অনেক। অথচ জটিল রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বেশি তৈরি হচ্ছে না। এ ছাড়া চিকিৎসাও ঢাকা কেন্দ্রিক। অথচ এই চিকিৎসা বিভাগীয় পর্যায়ে সুযোগ থাকলে ভালো হতো
হুমায়ুন কবীর হিমু সহযোগী অধ্যাপক ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল

স্ট্রোকের রোগী বাড়লেও একমাত্র ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল ছাড়া কোথাও সঠিক চিকিৎসা পাওয়া যায় না। ফলে অধিকাংশ স্নায়ুরোগী যথাযথ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

স্নায়ুরোগের অন্যতম কারণ উচ্চ রক্তচাপ

বাংলাদেশের মানুষ যেসব কারণে স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হচ্ছে সেসব বিশ্লেষণ করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ বিএমআই (বডি মাস ইনডেক্স) বা দেহের ভর সূচক এবং রক্তে শর্করার আধিক্য ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫৭ দশমিক ৫০ শতাংশ মানুষের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। ২০১৯ সালে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষের হার ছিল ৫৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। একইভাবে উচ্চ বিএমআই ২০ দশমিক ৮৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ শতাংশে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা ২০ দশমিক ৬৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ দশমিক ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। এ কারণে মানুষ স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

দেশের ৩৮ শতাংশ মানুষ স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।

পরিবেশদূষণ, বিশেষ করে বায়ুমণ্ডলের বস্তুকণাদূষণও স্নায়ুরোগের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বর্তমানে এটির হার ৪ শতাংশ। দেখা গেছে, দেশের ৩৮ শতাংশ মানুষ স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।

চিকিৎসা সেবায় গ্রাম-শহরের বৈষম্যে বাড়ছে রোগী

স্নায়ুরোগের চিকিৎসায় গ্রাম ও শহরের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য লক্ষ্য করা গেছে। স্নায়ুরোগীদের ৭৪ শতাংশই গ্রামাঞ্চলের। যেখানে শহরের রোগীর হার মাত্র ২৬ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে অবকাঠামোর সংকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুপস্থিতি এবং রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে রোগীরা সঠিক সময়ে চিকিৎসা পাচ্ছেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় বিলম্ব হওয়ায় রোগীরা স্থায়ীভাবে প্রতবিন্ধী হয়ে যাচ্ছেন।

পুরুষই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে

লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৭ শতাংশ নারী। তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে লিঙ্গ ও পেশাভেদে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। যেমন—বাংলাদেশে তরুণ পুরুষ শ্রমিকদের মধ্যে ঘাড়ের মেরুদণ্ডে আঘাত বা ‘সার্ভিকাল স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি’ হওয়ার প্রবণতা বেশি।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস ও হাসপাতাল (সংগৃহীত)
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস ও হাসপাতাল (সংগৃহীত)

স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের সংকটে মিলছে না সেবা

দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের জন্য মাত্র ৩৫০ জন্ স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য দেশে মাত্র দুটি মেডিকেল কলেজে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে কোর্স চালু রয়েছে। ২০১২ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হওয়া একটি বড় অগ্রগতি হলেও রোগীর সংখ্যার তুলনায় তা পর্যাপ্ত নয়।

গ্রামের রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছে না যেসব কারণে

গ্রামাঞ্চলে প্রয়োজনীয় ওষুধের দুষ্প্রাপ্যতা এবং উচ্চমূল্য চিকিৎসার পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মৃগী রোগের মতো সমস্যায় সামাজিক কুসংস্কার এখনও প্রকট, যার ফলে রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দ্বিধা বোধ করেন। এছাড়া স্ট্রোকে আক্রান্তদের জন্য আধুনিক রিহ্যাবিলিটেশন বা পুনর্বাসন সেবার অভাবও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জিনগত কারণেও হচ্ছে স্নায়ুরোগ

বংশগতি ও জিনগত কারণেও অনেকে স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের উচ্চ হারের কারণে অটিজম, বুদ্ধি প্রতিবন্ধীতার মতো বংশগত স্নায়ুরোগের প্রকোপ বাড়ছে।

ওষুধের উচ্চমূল্যে চিকিৎসা ব্যাহত

ওষুধেরও উচ্চমূল্যের কারণে অনেক স্নায়ুরোগী চিকিৎসা করাতে পারছেন না। স্ট্রোকের রোগীদের আধুনিক চিকিৎসার অন্যতম পদ্ধতি হলো আইভি থ্রোম্বোলাইসিস ইনজেকশন। ইনজেকশনটির মূল্য ৫০ হাজার থেকে ৫৫ হাজার টাকা। স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার তিন থেকে সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে এই ইনজেকশন দেওয়া হলে মস্তিষ্কের কোষগুলো রক্ষা পায়। যথাসময়ে এই ইনজেকশন না দিলে রোগীর জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ওষুধেরও উচ্চমূল্যের কারণে অনেক স্নায়ুরোগী চিকিৎসা করাতে পারছেন না। স্ট্রোকের রোগীদের আধুনিক চিকিৎসার অন্যতম পদ্ধতি হলো আইভি থ্রোম্বোলাইসিস ইনজেকশন। ইনজেকশনটির মূল্য ৫০ হাজার থেকে ৫৫ হাজার টাকা।

ওষুধের চড়া দামের বিষয়ে জানতে চাইলে হেলথকেয়ার ফার্মাসিটিক্যাল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হালিমুর রশিদ এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘স্বল্প মাত্রার একটি ইনজেকশন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এটি তৈরি করতে পারলে বাজারে দাম কমে আসবে।’

স্নায়ুরোগ প্রতিরোধে করণীয়

দেশে স্নায়ুরোগের ব্যাপকতা ও ভয়াবহতার চিত্র বিশ্লেষণ করে এই রোগ প্রতিরোধে কিছু সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এসব সুপারিশের মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন; বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় স্নায়ুরোগের আধুনিক চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টির ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং ধূমপান নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা বাড়ানো, মৃগী রোগ বা পার্কিনসনের মতো রোগ নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার দূর এবং রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সম্পর্কে গণশিক্ষা কাযক্রম চালু করা। এর পাশাপাশি সাশ্রয়ী মূল্যে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ রোগীদের কাছে বিক্রি এবং জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে স্নায়ুরোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং গবেষণা ও অর্থায়ন বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

/টিই/