শিরোনাম

প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন করে ঢাকার উপকণ্ঠে নদীতে ইকোপার্ক

রাসেল আহমেদ-রূপগঞ্জ (নারায়গঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন করে ঢাকার উপকণ্ঠে নদীতে ইকোপার্ক
শীতলক্ষ্যা-বালু নদের মধ্যে চনপাড়া চর। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের শীতলক্ষ্যা-বালু নদের মধ্য চনপাড়া চরের সবুজ বিনাশ করে নির্মাণ করা হচ্ছে ইকোপার্ক। চরের ১৩৩ বিঘা জমিতে নির্মাণ কাজ পুরোদমে চলছে। একসময় চরের জমিতে স্থানীয় কৃষকরা ফসল ফলাতেন, এখন সে অবস্থা আর নেই।

জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার কাছে ডেমরার সুলতানা কামাল সেতুর উত্তর দিকে অবস্থিত চনপাড়া চর। লম্বায় ৯০০ আর প্রস্থে ২০০ মিটার। চরটির পশ্চিমে রয়েছে বালু নদ এবং পূর্বে শীতলক্ষ্যা নদী।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, চনপাড়ার চরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারাচ্ছে। তবু কোথায় কোনো প্রতিবাদ নেই। ইকোপার্কের ছোঁয়ায় চনপাড়ার নিসর্গ চাপা পড়ছে কংক্রিটে। এক্সকেভেটর দিয়ে মাটি খোদাই করা হচ্ছে। চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রের উত্তর পাশে ঢাকা ওয়াসার প্রায় ৯০ বিঘা জমি রয়েছে। ওই জমি রেখে চরে নির্মিত হচ্ছে ইকোপার্ক।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন গত বছর শীতলক্ষ্যা নদী পরিদর্শনে গেলে চরটি তার নজরে আসে। ওই সময় কর্মকর্তারা পরামর্শ দেন ইকোপার্ক নির্মাণের মাধ্যমে চরটি সংরক্ষণ করা যাবে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ‘নদীপাড় সংরক্ষণ, ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের আওতায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ইকোপার্ক প্রকল্পটি নির্মিত হচ্ছে। এই প্রকল্পে বিতর্কিতভাবে চরটিকে ‘ফোরশোর’ (তীরভূমি) হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এটি তীরভূমি নয় বলে দাবি পরিবেশবিদদের।

বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়্যারম্যান মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেছেন, ‘চরটি কোনোভাবেই ফোরশোর নয়। এটি একটি জেগে ওঠা চর, যার আশপাশে কোনো তীর বা মানুষের বসতি নেই। সুতরাং, এটিকে ফোরশোর হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই।’

চনপাড়া চরে চলছে ইকোপার্ক নির্মাণের কাজ। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
চনপাড়া চরে চলছে ইকোপার্ক নির্মাণের কাজ। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চনপাড়া চরটি পলি জমে সৃষ্ট; যা নদীর প্রাকৃতিক চ্যানেলের জন্য ক্ষতিকর। পরিবেশগত দিক থেকে এ ধরনের পলি অপসারণ করে নৌ-চলাচলের জন্য উপযুক্ত নাব্য ফিরিয়ে আনা ছিল পরিবেশবান্ধব এবং যৌক্তিক পদক্ষেপ। ইকোপার্ক নির্মাণ না করে চরটি খনন করে নৌ-চলাচলের উপযোগী করে তোলাই হবে নদী রক্ষা।

পরিবেশবিদদের মতে, এটি হলে বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ স্থায়ীভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। নদীর চ্যানেল সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় স্রোতের স্বাভাবিক পথ পরিবর্তন হচ্ছে, যা পলির প্রবাহকেও বাধাগ্রস্ত করে। কয়েক বছরের মধ্যেই চরের আশপাশের জায়গা বেদখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন নদী সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্পের আইনগত দুর্বলতা স্পষ্ট করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি-বেলা ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল চার মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ মোট ১১ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে আইনি নোটিস পাঠায়। নোটিসে উল্লেখ করা হয়, নদীর মাঝখানে পলি জমে তৈরি হওয়া স্থানে ইকোপার্ক নির্মাণ হলে শীতলক্ষ্যা ও বালু নদের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে।

আইনি নোটিসে দাবি জানানো হয়, নদী ধ্বংসকারী এই নির্মাণ কাজ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। নদীর সংযোগ সচল করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

আইনি নোটিস পাওয়ার পরও নির্মাণ কাজ অব্যাহত থাকা প্রশাসনিক জবাবদিহির ঘাটতি এবং আইনের শাসন প্রয়োগে সরকারের দ্বিচারিতাকে ইঙ্গিত করেন সংশ্লিষ্টরা।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক শারাফাত ইসলাম কায়েস ও রজব আলী জানিয়েছেন, সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মাহমুদুল হাসান পলিন ও শাহিন দীর্ঘদিন ধরে তাদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছিলেন। তারা কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি।

বিআইডব্লিউটিএর দাবি, ইকোপার্ক নির্মাণ করা হলে চরটি সংরক্ষিত থাকবে। এখানে সংঘটিত অপরাধও দমন করা যাবে। এই প্রকল্পটিকে শুধু পরিবেশগত উন্নয়ন হিসেবে না দেখে চনপাড়া পুনর্বাসনের অপরাধ চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি কৌশল বলা যেতে পারে।

স্থানীয়রা বলেন, প্রকল্পের উদ্দেশ্য যদি সামাজিক নিয়ন্ত্রণ হয়, তবে সেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য নদীর স্বাস্থ্যকে উৎসর্গ করা হয়েছে। উপরন্তু, যদি ইকোপার্ক নির্মিত হয়, তবে পার্কের অভ্যন্তরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড (দোকানপাট, ইজারা) নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় ক্ষমতাবলয়ের মধ্যে নতুন করে আধিপত্যের লড়াই শুরু হতে পারে, যা বিদ্যমান সংঘাতকে আরও জটিল করবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পরিবেশ অধিদপ্তর ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের পক্ষ থেকে এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

স্থানীয়দের মতে, নদীর মধ্যে একটি বিনোদন পার্ক তৈরি করা কেবল স্থানীয় ক্ষমতাবলয়কে নতুন করে নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা হতে পারে, কিন্তু এটি মূল সামাজিক সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখবে না।

চনপাড়া চড়
চনপাড়া চড়

বিআইডব্লিউটিএর দাবি, এই চরটিকে বালু ও শীতলক্ষ্যার ‘ফোরশোর (তীরভূমি) বিবেচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, হাইকোর্ট নদীর ফোরশোরে ইকোপার্ক নির্মাণের নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই নির্দেশনার আলোকেই ইকোপার্কটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ইকোপার্ক নির্মিত হলে শীতলক্ষ্যা নদী ও বালু নদের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ভয়াবহভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। বিআইডব্লিউটিএ প্রকল্পটিকে ‘নদীপাড় সংরক্ষণ’ প্রকল্প হিসেবে দেখালেও তারা প্রকৃতপক্ষে নদী ভরাটের মাধ্যমে প্রবেশপথ তৈরি করছে এবং নদীর সীমানা লঙ্ঘন করছে।

নারায়ণগঞ্জ জজকোর্টের আইনজীবী আবুল বাশার রুবেল বলেন, ‘নদীরক্ষার বিষয়ে হাইকোর্টের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রায় রয়েছে। রায়ের মূল চেতনা হলো– নদীকে অবৈধ দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা। বিআইডব্লিউটিএ বলছে, তারা হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকেই পার্কটি নির্মাণ করছে।

স্থানীয়রা জানান, ঐতিহাসিকভাবে চনপাড়া চরটি খাসজমি হলেও দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় দরিদ্র কৃষকরা সেখানে মৌসুমি সবজি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, নদী ভরাটের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

নারায়ণগঞ্জের বিআইডব্লিটিএর যুগ্ম পরিচালক ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই। নারায়ণগঞ্জ পোর্ট (বন্দর) অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’

বিআইডব্লিউটিএ’র অতিরিক্ত পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমি নতুন এসেছি। বিস্তারিত জানি না। পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেন।

ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক (তীরভূমি শাখা, বন্দর ও পরিবহন বিভাগ) মো. আবু ছালেহ কাইয়ুমের সঙ্গে যোগাযোগ হলে বলেন, ‘এ ব্যাপারে কিছু জানি না।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রাহয়ান কবীর বলেন, ‘আমি সবেমাত্র জয়েন করেছি। খোঁজখবর নেবো। তারপর দেখি কী করা যায়।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা নোটিস পেয়েছি। বিষয়টি দেখছি।’

নদীরক্ষা কমিশনের সহকারী পরিচালক তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘বেলার উকিল নোটিস পাঠানোর পর আমরা বিআইডব্লিউকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলেছিলাম। কিন্ত তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’

/এসআর/