শিরোনাম

৪ ব্যাংক থেকে কেনা হলো আরও ৬ কোটি ডলার

বাড়তি চাহিদার মধ্যে বাজার থেকে ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাড়তি চাহিদার মধ্যে বাজার থেকে ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক
মার্কিন ডলার। ছবি: সংগৃহীত

আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে দেশে আমদানি চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। রমজানকেন্দ্রিক ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের অগ্রিম আমদানির চাপ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের জোর চাহিদা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সরবরাহ বাড়লেও ডলারের দাম যেন অস্বাভাবিকভাবে কমে না যায়, এমন যুক্তি দিয়ে নিয়মিতভাবে বাজার থেকে ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, রবিবার (২১ ডিসেম্বর) চারটি ব্যাংক থেকে প্রায় ৬ কোটি ডলার (৬০ মিলিয়ন ডলার) কেনা হয়েছে। এ সময় প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ দশমিক ৩০ টাকা পর্যন্ত। কাট-অফ রেট ১২২ দশমিক ৩০ টাকা, যা মাল্টিপল প্রাইস নিলাম পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে।

এর আগে গত ১৭ ডিসেম্বর সাতটি ব্যাংক থেকে মোট প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার (৬৭ মিলিয়ন ডলার) কেনা হয়। এ সময় প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ দশমিক ৩০ টাকা পর্যন্ত। কাট-অফ রেট ১২২ দশমিক ৩০ টাকা, যা মাল্টিপল প্রাইস নিলাম পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে।

গত ১৫ ডিসেম্বর ১৩টি ব্যাংক থেকে মোট প্রায় ১৪ কোটি ১৫ লাখ মার্কিন ডলার (১৪১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার) কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ দশমিক ২৯ টাকা থেকে ১২২ দশমিক ৩০ টাকা পর্যন্ত।

এদিকে সব মিলিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পর্যন্ত নিলাম পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক মোট ২৯৩ কোটি ১৫ লাখ (২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার) ডলার কিনেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৩ জুলাই থেকে নিলামের মাধ্যমে ডলার কেনা শুরু করে। ওই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এখন পর্যন্ত এ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, চার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মোট প্রায় ৬ কোটি মার্কিন ডলার (৬০ মিলিয়ন ডলার) কেনা হয়েছে। এ সময় প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ দশমিক ৩০ টাকা পর্যন্ত। কাট-অফ রেট ১২২ দশমিক ৩০ টাকা।

ডলার কিনছে কেন!

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বর্তমানে বাজারে ডলারের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি। ফলে দাম হঠাৎ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ডলারের দর কমে গেলে রপ্তানিকারক ও প্রবাসী আয় পাঠানো ব্যক্তিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এ কারণেই বাজারে হস্তক্ষেপ করে অতিরিক্ত ডলার তুলে নেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান বলেন, বর্তমানে ডলারের জোগান ভালো। দর যেন অস্বাভাবিকভাবে পড়ে না যায়, সেজন্যই নিলামের মাধ্যমে অতিরিক্ত ডলারধারী ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনা হচ্ছে। এতে বাজার স্থিতিশীল থাকে এবং রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ টেকসই হয়।

আশঙ্কায় আমদানিকারকরা

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নীতিকে পুরোপুরি ইতিবাচকভাবে দেখছেন না দেশের ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, বাজারে এমনিতেই ডলারের চাহিদা বাড়ছে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত ডলার কিনে নিলে সরবরাহ কমে যায় এবং দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়।

একটি আমদানিকারক ব্যবসায়ী গ্রুপের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, রমজানের আগে আমদানির চাহিদা বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু একই সময় বাংলাদেশ ব্যাংক যখন বাজার থেকে ডলার কিনে নেয়, তখন দামের চাপ আরো বাড়ে। বছরের শেষ দিকে ব্যাংকগুলোও অতিরিক্ত মুনাফা নিতে ডলারের দাম বাড়িয়ে দেয়। এতে আমদানির খরচ ও ব্যবসায়িক ঝুঁকি বাড়ে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন নীতির মাধ্যমে সংকট কতটা কাটবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এর আগে ২০২২ সাল থেকে শুরু হওয়া ডলার সংকটে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বাজার স্থিতিশীল রাখতে রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করেছিল। কিন্তু তাতে সংকট পুরোপুরি কাটেনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বিক্রি হয় ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার। তিন অর্থবছরে মোট বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার। অথচ ওই সময় কেনা হয়েছিল মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থপাচার রোধে কঠোরতা, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং প্রবাসী আয়ের উচ্চ প্রবাহের কারণে পরিস্থিতি পাল্টেছে। এখনো রিজার্ভ বাড়ছে, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে।

রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে ইতিবাচক চিত্র

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি (ডিসেম্বর) মাসের প্রথম ২০ দিনে দেশে এসেছে প্রায় ২১৭ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয়। দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে ২৬ হাজার ৪৯৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলছে, ডিসেম্বরের প্রথম ২০ দিনে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১৯ কোটি ডলার বেশি এসেছে। গত বছরের ওই সময়ে এসেছিল ১৯৮ কোটি ৩০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স।

চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে এক হাজার ৫২১ কোটি ১০ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২০৯ কোটি ডলার বেশি। তখন এসেছিল এক হাজার ৩১২ কোটি ১০ লাখ ডলার। প্রবৃদ্ধির হার ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ।

রেমিট্যান্সের এই উচ্চ প্রবাহে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার গ্রস রিজার্ভ বেড়ে ৩২ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ উঠেছে ২৭ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারে। এর আগে আকু’র দায় পরিশোধের পর গত নভেম্বর মাসে যা ৩১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল। রিজার্ভের এই শক্ত অবস্থান অর্থনীতিতে স্বস্তি দিচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

এর আগে ২০২৩ সালের জুনে বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার, যা একসময় নেমে যায় ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রপ্তানিকারক ও প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি আমদানিকারক ও ভোক্তাদের দিকটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থায় নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রয়োজন সূক্ষ্ম ভারসাম্য যাতে ডলারের দর কৃত্রিমভাবে না বাড়ে, আবার অস্বাভাবিকভাবে কমেও না যায়। ডলার কেনার বর্তমান নীতি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বাজার পরিস্থিতি, আমদানির চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপ্রবাহের ওপর।

রোজা সামনে রেখে বাড়ছে আমদানি এলসি

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত নভেম্বর মাসে বিভিন্ন পণ্যের ৫৫৬ কোটি ৬৬ লাখ ডলারের আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে। একই মাসে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৮৬ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। সব মিলে চলতি অর্থছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) এলসি খোলা হয় ২ হাজার ৯৪১ কোটি ডলার। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১২৯ কোটি ২৬ লাখ ডলার বা ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ। তবে প্রথম পাঁচ মাসের হিসাবে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ৭৪ কোটি ডলার বা ২ দশমিক ৬৬ শতাংশ কম। এ সময়ে বিভিন্ন পণ্যের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ২ হাজার ৭১৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার।