তাজরীন গার্মেন্টস ট্র্যাজেডি
অগ্নিকাণ্ডের তের বছরেও শেষ হয়নি বিচার

অগ্নিকাণ্ডের তের বছরেও শেষ হয়নি বিচার
মরিয়ম সেঁজুতি
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২৫, ১৭: ৪৮

তাজরীন ট্র্যাজেডির ১৩ বছর আজ। দেশের পোশাক খাতে অগ্নিকাণ্ডের ভয়ালতম ঘটনার সাক্ষী ঢাকার আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনস। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও শত শত আহত শ্রমিক এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। এখনো পুনর্বাসিত না হওয়ায় আক্ষেপ তাদের। ওই ঘটনার ১৩ বছর পূর্তি আজ। সেই দৃশ্য মনে পড়লে আঁতকে ওঠেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মামলা আদালতে নিষ্পত্তি হয়নি এখনো। মামলার আসামির তালিকায় বিগত সরকারের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা থাকায় তদন্ত ও বিচারকাজে এত সময় লাগছে বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। এদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মন্তব্য করেন, দায়ীদের বিচারের আওতায় না আনায় দেশে এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
এদিকে, দেশে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের মানদণ্ড নির্ধারণে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশনের সুপারিশ মানার দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়। বাস্তবে সংশোধিত শ্রম আইনে এই দাবি আমলে নেয়া হয়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাজরীন ফ্যাশনস ও রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা।
২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডে ১১৭ জন শ্রমিক প্রাণ হারান। আহত হয়েছিলেন অন্তত দুই শতাধিক। দিনটি উপলক্ষে সোমবার (২৪ নভেম্বর) সকালে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে পুড়ে যাওয়া তাজরীন ফ্যাশনসের কারখানার সামনে হতাহত শ্রমিক পরিবারের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। সকাল ৯টায় বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির পক্ষ থেকে কারখানা ফটকের সামনে আগুনে পুড়ে নিহত শ্রমিকদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পরে সেখানে সংগঠনের সভাপ্রধান তাসলিমা আখতারের সভাপতিত্বে সমাবেশ ও মিছিল করা হয়।

এসময় আহত শ্রমিকরা সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদের মনের কষ্টের কথা জানান। তারা তাজরীনে হতাহত শ্রমিক পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসার দাবি জানান। শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সরকার ও বিজিএম-এর কাছ থেকে মেলেনি তেমন কোনো সহায়তা। পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসা পাননি হতাহতরা। তাদের দাবি, মানববন্ধন, আলোচনাসভা, শ্রদ্ধা আর গণমাধ্যমের প্রচারে আটকে আছে তাজরীন ট্রাজেডি। তারা বলেন, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছে হতাহতদের পরিবার।
এদিকে, মূল হোতা কারখানার মালিক দেলোয়ারসহ দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় হতাশ ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
এসময় বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান শ্রমিকনেতা তাসলিমা আখতার বলেন, ১৩ বছর আগে ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর মালিকপক্ষের অব্যবস্থাপনা, কাঠামোগত ত্রুটি এবং সরকারি ছাড়পত্রে ত্রুটিপূর্ণ কারখানা চালাবার সুযোগের কারণে তাজরীনে ১১২ জন শ্রমিক আগুণে পুড়ে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি এই ঘটনাকে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড হিসাবে অভিহিত করেন। ১৩ বছর পার হলেও বিচার প্রক্রিয়ার ধীর গতি এবং সরকারের অবহেলার কারণে এতো বড় শ্রমিক হত্যার বিচার হয়নি। এই ঘটনা শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে ন্যাক্কারজনক ঘটনা হিসাবেই থাকবে। তিনি একইসাথে বলেন, দেলোয়ার হোসেনসহ ১৩ আসামীর শাস্তি হলে এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ হতো, অন্যান্য কারখানার মালিকরা সতর্ক হতো, রানা প্লাজা, রূপগঞ্জের মতো ঘটনায় নির্মম মৃত্যু দেখতে হতো না।
বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের (বিজিএসএফ) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অরবিন্দু বেপারী (বিন্দু) বলেন, ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেডে আগুন লাগে। মালিকপক্ষ সুপরিকল্পিতভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু ঘটায়। আজ পর্যন্ত মৃত শ্রমিকদের স্বজনরা ক্ষতিপূরণ পাননি। আহত শ্রমিকরা সুচিকিৎসা পায়নি। সহযোগিতা পায়নি। এখানে হত্যাকাণ্ড ঘটালেও আগের সরকার মালিককে নামমাত্র গ্রেপ্তার করে, তারপর তিন জামিন পান। এরপর তিনি আওয়ামী মৎসজীবী লীগের সভাপতি হয়ে দাপট দেখিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি জানাই, আগের সরকারের আমলে শ্রমিক হত্যার বিচার হয়নি, এই সরকার তদন্ত করে শ্রমিক হত্যার বিচার করবে।
তিনি বলেন, তাজরীন ফ্যাশনের যে পরিত্যক্ত জমি রয়েছে, সেখানে সরকারি অর্থায়নে একটি শ্রমজীবী হাসপাতাল নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি। এর মাধ্যমে সরকার শ্রমিকদের বিনামূল্যে সুচিকিৎসা দিতে পারবে।
জানা গেছে, তাজরীন ফ্যাশন গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পরদিন আশুলিয়া থানার এসআই খায়রুল ইসলাম একটি মামলা করেন। এরপর ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক একেএম মহসিনুজ্জামান খান আদালতে ১৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আদালত তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেনসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর বিচার শুরু করেন আদালত।
এরপর থেকে চলতি বছর (২০২৪) পর্যন্ত ১০৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্য দিয়েছেন মালা নামে একজন শ্রমিক। সাক্ষে তিনি বলেন, আগুন লাগার পরও কারখানার ফ্লোর ম্যানেজাররা আগুন লাগে নাই বলে শ্রমিকদের কাজে মন দিতে বলেন। কিছুক্ষণ পর বিদ্যুৎ চলে যায়। ধোঁয়ায় পুরো ঘর অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। নিচে নেমে কেসি গেটে তালা পাই। এরপর তিন তলায় উঠে যাই। কয়েকজন মিলে জানালা ভেঙে ভবন থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ি। এরপর দীর্ঘ দিন হাসপাতালে ছিলাম।
এ মামলায় অভিযুক্ত আসামিরা হলেন- প্রতিষ্ঠানের মালিক দেলোয়ার হোসেন, চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তার, স্টোর ইনচার্জ (সুতা) আল আমিন, সিকিউরিটি ইনচার্জ আনিসুর রহমান, সিকিউরিটি সুপারভাইজার আল আমিন, স্টোর ইনচার্জ হামিদুল ইসলাম লাভলু, অ্যাডমিন অফিসার দুলাল উদ্দিন, প্রকৌশলী এম মাহবুবুল মোর্শেদ, সিকিউরিটি গার্ড রানা ওরফে আনোয়ারুল, ফ্যাক্টরি ম্যানেজার আব্দুর রাজ্জাক, প্রোডাকশন ম্যানেজার মোবারক হোসেন মঞ্জুর, শামীম ও শহীদুজ্জামান দুলাল। আসামিদের মধ্যে আল আমিন, রানা, শামীম ও মোবারক হোসেন পলাতক রয়েছেন। আর বাকি সব আসামি জামিনে আছেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়- কারখানা ভবনটি ইমারত নির্মাণ আইন মেনে করা হয়নি। ভবনটিতে জরুরি বহির্গমন পথ ছিল না। তিনটি সিঁড়ির মধ্যে দুটি নিচতলার গুদামের ভেতরে এসে শেষ হয়েছে। ওই গুদামে আগুন লাগার পর শ্রমিকেরা বের হতে চাইলে কারখানার ম্যানেজার শ্রমিকদের বাধা দিয়ে বলেন, আগুন লাগেনি, অগ্নিনির্বাপণের মহড়া চলছে। এরপর তিনি বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দেন।
শুরু থেকে এ মামলার কার্যক্রম মনিটরিং করছেন গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম সবুজ। তিনি বলেন, গত ১২ বছর আমরা শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন গবেষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, সংস্কৃতি কর্মী এবং গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম তাজরীন মামলাটির কার্যক্রমকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। প্রত্যেকটি সাক্ষ্য-শুনানিতে উপস্থিত থেকেছি। বছরের পর বছর আদালতে আসা-যাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা মনে করি, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার পেছনে মামলাটি পরিচালনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের দায়সারা ভাব দায়ী। আমরা তিল তিল করে প্রত্যক্ষ করেছি যে, বিচারকার্য পরিচালনায় রাষ্ট্রপক্ষের এই ব্যবস্থাগত অবহেলা, ঔদাসীন্য মালিকের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
তাজরীন ট্র্যাজেডিতে নিহত ও আহতের পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২৪ নভেম্বর মনে করিয়ে দেয় স্বজন হারানোর বেদনা। এই দিনে কেউ হারিয়েছে মাকে, বোনকে, বাবাকে কেউ বা আবার হারিয়েছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে। এইদিন ডুকরে কেঁদে ওঠে স্বজন হারানো মানুষগুলো। উপার্জনক্ষম মানুষগুলোই এখন তাদের পরিবারের বোঝা, কেউবা কোনোমতে দোকান দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের জীবন যুদ্ধ। কেউবা চিকিৎসা করাতেই নামমাত্র ক্ষতিপূরণসহ শেষ করেছেন তাদের সর্বস্ব। আবার অনেকেই বঞ্চিত হয়েছেন ক্ষতিপূরণ থেকেও। তারা ১২ বছর ধরে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের আশায় আছেন।
তাজরীনে আহত নারী শ্রমিক শিল্পী বেগম জানান, ঘটনার দিন আগুনের লেলিহান শিখা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সিঁড়ি দিয়ে তড়িঘড়ি করে নামার সময় হঠাৎ নিচে পড়ে যান তিনি। এতে তার দুই হাত-পা ও মাজায় প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত হন। পরে দীর্ঘদিন সাভারের পক্ষাগতগ্রস্থদের পুনর্বাসন কেন্দ্র সিআরপিতে চিকিৎসা নিয়ে বেঁচে ফিরলেও এখনও জীবন যুদ্ধে থেমে নেই। জীবিকার তাগিদে বর্তমানে চায়ের দোকানে চলছে তার সংসার। সরকারসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে সাময়িক কিছু সহায়তা পেলেও পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন পাননি তিনি। বহু পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম মানুষ হারিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিন পার করছেন।
আহত সবিতা রাণী জানান, কারখানাটির তৃতীয় তলায় তিনি স্যুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যে সামান্য সহায়তা পেয়েছেন তা চিকিৎসা করাতেই শেষ হয়ে গেছে। বারবার আশ্বাস দিলেও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন করা হয়নি। ক্ষতিপূরণ পেলে তিনি গ্রামে গিয়ে কিছু একটা করে সংসার চালাবেন বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুনর্বাসন সহ ক্ষতিপূরণের দাবি জানান।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র সাভার-আশুলিয়া আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় জীবন বাঁচাতে যখন শ্রমিকরা চিৎকার করছিলেন তখনো মালিক দেলোয়ার হোসেন কারখানা থেকে বের হওয়ার সব গেটে তালা লাগিয়ে রাখেন। প্রাণে বাঁচতে অনেক শ্রমিক ভবনের বিভিন্ন তলা থেকে লাফিয়ে পড়েন।
স্থানীয়রা জানান, সেদিন সন্ধ্যার দিকে তাজরীন ফ্যাশনস পোশাক কারখানাটির নিচ তলার তুলার গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা পুরো আট তলা কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। ১২ বছর পরও আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবনটি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলেও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেনা ভুক্তভোগী শ্রমিকেরা। শারীরিক যন্ত্রণা, সংসারের অভাব অনটনের পাশাপাশি দোষীদের শাস্তি না পাওয়ার আক্ষেপ নিয়ে দিন পার করছেন। আজও সে রাতের কথা মনে পড়লে আঁতকে ওঠেন তারা।
সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায় সংস্কার কমিশনসংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায় সংস্কার কমিশন
তাজরীন ফ্যাশনের চতুর্থ তলায় কাজ করতেন নাসিমা আক্তার। অগ্নিকাণ্ডের সময় প্রাণ বাঁচাতে ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। নাসিমা আক্তার বলেন, দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে চলাফেরা করতে পারলেও কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। এখন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। ওষুধ কিনতে পারি না। তিন বেলা খাবার পাই না। আমাদের আলাদা চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
তাজরীন ফ্যাশনের আহত শ্রমিক জরিনা আক্তার বলেন, স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের আমলে দোষীদের শাস্তি হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের পর আমাদেরকে নামমাত্র কিছু টাকা দেয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে আমারা পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ ও দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু আমাদের কোনো দাবি পূরণ হয়নি। অবিলম্বে কারখানার মালিক দেলোয়ারসহ দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আশাকরি অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের দাবি পূরণ করবে।
তাজরীন ট্র্যাজেডিতে স্বামী হারান ফাতেমা আক্তার। তিনি নিজেও গুরুতর আহত হন। তিনি বলেন, স্বামী-স্ত্রী দুজনেই তাজরীন ফাশনে কাজ করতাম। তখন আমি ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম। নিজে আহত হয়ে দুই সন্তান নিয়ে অসুস্থ শরীরে খুব কষ্টে আছি। আমাদের ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক।
ক্ষতিপূরণের মানদণ্ড নেই
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারিত হবে শ্রমিকের বয়স, দক্ষতা ও মজুরির ভিত্তিতে। দেশে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের মানদণ্ড নির্ধারণে এ সুপারিশ মানার দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়। বাস্তবে সংশোধিত শ্রম আইনে এই দাবি আমলে নেয়া হয়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাজরীন ফ্যাশনস ও রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা।
শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ এক লাখ টাকা। ২০১৬ সালে আইনের সংশোধনীতে টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়। ওই আইনে আহতদের ক্ষতিপূরণ আড়াই লাখ টাকা। আইএলও কনভেনশনের ১২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ শ্রমিকের বয়স, দক্ষতা ও মজুরির ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। তাজরীন ফ্যাশনসের হতাহতদের গড় বয়স ২৫ বছর। দেশের আইন অনুযায়ী, একজন শ্রমিক যদি ৫৯ বছর কাজ করতে পারে, তাহলে তাঁর কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্রম কমিশন ক্ষতিপূরণের একটি সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করে দেয়ার সুপারিশ করেছে। এ জন্য একটি মানদণ্ড নির্ধারণেরও সুপারিশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, আইএলওর সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ এবং দেশে হাইকোর্টের এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী যেন মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়। একটি ত্রিপক্ষীয় কমিটি গঠন করে তাদের মাধ্যমে ন্যায্য মানদণ্ড নির্ধারণের কথা বলা হয় প্রতিবেদনে।
গত ২৩ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুমোদন দেয়া হয়। এরপর ১৭ নভেম্বর জারি করা অধ্যাদেশ গেজেট আকারে প্রকাশ করে সরকার। এতে কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ তহবিল প্রসঙ্গে বলা হয়, সরকার বিধি দ্বারা উপযুক্ত বিবেচিত কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত একটি ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করবে। এতে তহবিল ব্যবস্থাপনা বোর্ডের গঠন, কার্যাবলি, সুবিধার প্রকার ও মাত্রা নির্ধারণ, তহবিলের অর্থের উৎস পদ্ধতি ও কার্যকর প্রশাসন এবং বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অর্থাৎ, শ্রমিক পক্ষের মূল যে দাবি একটি স্থায়ী মানদণ্ড নির্ধারণ, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলা নেই সংশোধিত শ্রম আইনে।
সংশোধিত আইন অনুযায়ী, সব খাতের শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণ পাবেন না। এতে বলা হয়, সরকার গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা কোন কোন শিল্প খাতে ক্ষতিপূরণ তহবিল প্রযোজ্য হবে, তাহা নির্ধারণ করিতে পারিবে এবং এইরূপ নির্ধারণের পর কর্মস্থলে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ধারা ১৫০-এর আওতায় মালিকের দায়িত্ব-সংক্রান্ত এই আইনের বিধানাবলি সংশ্লিষ্ট শিল্প বা খাতের মালিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইবে না।
শ্রম আইন সংশোধন-সংক্রান্ত ত্রিপক্ষীয় পরামর্শক পর্ষদের (টিএসএস) সদস্য সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন গতকাল সমকালকে বলেন, তাদের দাবি সত্ত্বেও সংশোধিত শ্রম আইনে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আমলে নেয়া হয়নি। এ নিয়ে সব পর্যায়ের শ্রমিকরা হতাশ এবং ক্ষুব্ধ। শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।

তাজরীন ট্র্যাজেডির ১৩ বছর আজ। দেশের পোশাক খাতে অগ্নিকাণ্ডের ভয়ালতম ঘটনার সাক্ষী ঢাকার আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনস। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও শত শত আহত শ্রমিক এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। এখনো পুনর্বাসিত না হওয়ায় আক্ষেপ তাদের। ওই ঘটনার ১৩ বছর পূর্তি আজ। সেই দৃশ্য মনে পড়লে আঁতকে ওঠেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মামলা আদালতে নিষ্পত্তি হয়নি এখনো। মামলার আসামির তালিকায় বিগত সরকারের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা থাকায় তদন্ত ও বিচারকাজে এত সময় লাগছে বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। এদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মন্তব্য করেন, দায়ীদের বিচারের আওতায় না আনায় দেশে এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
এদিকে, দেশে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের মানদণ্ড নির্ধারণে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশনের সুপারিশ মানার দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়। বাস্তবে সংশোধিত শ্রম আইনে এই দাবি আমলে নেয়া হয়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাজরীন ফ্যাশনস ও রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা।
২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডে ১১৭ জন শ্রমিক প্রাণ হারান। আহত হয়েছিলেন অন্তত দুই শতাধিক। দিনটি উপলক্ষে সোমবার (২৪ নভেম্বর) সকালে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে পুড়ে যাওয়া তাজরীন ফ্যাশনসের কারখানার সামনে হতাহত শ্রমিক পরিবারের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। সকাল ৯টায় বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির পক্ষ থেকে কারখানা ফটকের সামনে আগুনে পুড়ে নিহত শ্রমিকদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পরে সেখানে সংগঠনের সভাপ্রধান তাসলিমা আখতারের সভাপতিত্বে সমাবেশ ও মিছিল করা হয়।

এসময় আহত শ্রমিকরা সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদের মনের কষ্টের কথা জানান। তারা তাজরীনে হতাহত শ্রমিক পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসার দাবি জানান। শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সরকার ও বিজিএম-এর কাছ থেকে মেলেনি তেমন কোনো সহায়তা। পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসা পাননি হতাহতরা। তাদের দাবি, মানববন্ধন, আলোচনাসভা, শ্রদ্ধা আর গণমাধ্যমের প্রচারে আটকে আছে তাজরীন ট্রাজেডি। তারা বলেন, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছে হতাহতদের পরিবার।
এদিকে, মূল হোতা কারখানার মালিক দেলোয়ারসহ দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় হতাশ ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
এসময় বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান শ্রমিকনেতা তাসলিমা আখতার বলেন, ১৩ বছর আগে ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর মালিকপক্ষের অব্যবস্থাপনা, কাঠামোগত ত্রুটি এবং সরকারি ছাড়পত্রে ত্রুটিপূর্ণ কারখানা চালাবার সুযোগের কারণে তাজরীনে ১১২ জন শ্রমিক আগুণে পুড়ে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি এই ঘটনাকে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড হিসাবে অভিহিত করেন। ১৩ বছর পার হলেও বিচার প্রক্রিয়ার ধীর গতি এবং সরকারের অবহেলার কারণে এতো বড় শ্রমিক হত্যার বিচার হয়নি। এই ঘটনা শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে ন্যাক্কারজনক ঘটনা হিসাবেই থাকবে। তিনি একইসাথে বলেন, দেলোয়ার হোসেনসহ ১৩ আসামীর শাস্তি হলে এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ হতো, অন্যান্য কারখানার মালিকরা সতর্ক হতো, রানা প্লাজা, রূপগঞ্জের মতো ঘটনায় নির্মম মৃত্যু দেখতে হতো না।
বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের (বিজিএসএফ) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অরবিন্দু বেপারী (বিন্দু) বলেন, ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেডে আগুন লাগে। মালিকপক্ষ সুপরিকল্পিতভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু ঘটায়। আজ পর্যন্ত মৃত শ্রমিকদের স্বজনরা ক্ষতিপূরণ পাননি। আহত শ্রমিকরা সুচিকিৎসা পায়নি। সহযোগিতা পায়নি। এখানে হত্যাকাণ্ড ঘটালেও আগের সরকার মালিককে নামমাত্র গ্রেপ্তার করে, তারপর তিন জামিন পান। এরপর তিনি আওয়ামী মৎসজীবী লীগের সভাপতি হয়ে দাপট দেখিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি জানাই, আগের সরকারের আমলে শ্রমিক হত্যার বিচার হয়নি, এই সরকার তদন্ত করে শ্রমিক হত্যার বিচার করবে।
তিনি বলেন, তাজরীন ফ্যাশনের যে পরিত্যক্ত জমি রয়েছে, সেখানে সরকারি অর্থায়নে একটি শ্রমজীবী হাসপাতাল নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি। এর মাধ্যমে সরকার শ্রমিকদের বিনামূল্যে সুচিকিৎসা দিতে পারবে।
জানা গেছে, তাজরীন ফ্যাশন গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পরদিন আশুলিয়া থানার এসআই খায়রুল ইসলাম একটি মামলা করেন। এরপর ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক একেএম মহসিনুজ্জামান খান আদালতে ১৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আদালত তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেনসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর বিচার শুরু করেন আদালত।
এরপর থেকে চলতি বছর (২০২৪) পর্যন্ত ১০৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্য দিয়েছেন মালা নামে একজন শ্রমিক। সাক্ষে তিনি বলেন, আগুন লাগার পরও কারখানার ফ্লোর ম্যানেজাররা আগুন লাগে নাই বলে শ্রমিকদের কাজে মন দিতে বলেন। কিছুক্ষণ পর বিদ্যুৎ চলে যায়। ধোঁয়ায় পুরো ঘর অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। নিচে নেমে কেসি গেটে তালা পাই। এরপর তিন তলায় উঠে যাই। কয়েকজন মিলে জানালা ভেঙে ভবন থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ি। এরপর দীর্ঘ দিন হাসপাতালে ছিলাম।
এ মামলায় অভিযুক্ত আসামিরা হলেন- প্রতিষ্ঠানের মালিক দেলোয়ার হোসেন, চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তার, স্টোর ইনচার্জ (সুতা) আল আমিন, সিকিউরিটি ইনচার্জ আনিসুর রহমান, সিকিউরিটি সুপারভাইজার আল আমিন, স্টোর ইনচার্জ হামিদুল ইসলাম লাভলু, অ্যাডমিন অফিসার দুলাল উদ্দিন, প্রকৌশলী এম মাহবুবুল মোর্শেদ, সিকিউরিটি গার্ড রানা ওরফে আনোয়ারুল, ফ্যাক্টরি ম্যানেজার আব্দুর রাজ্জাক, প্রোডাকশন ম্যানেজার মোবারক হোসেন মঞ্জুর, শামীম ও শহীদুজ্জামান দুলাল। আসামিদের মধ্যে আল আমিন, রানা, শামীম ও মোবারক হোসেন পলাতক রয়েছেন। আর বাকি সব আসামি জামিনে আছেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়- কারখানা ভবনটি ইমারত নির্মাণ আইন মেনে করা হয়নি। ভবনটিতে জরুরি বহির্গমন পথ ছিল না। তিনটি সিঁড়ির মধ্যে দুটি নিচতলার গুদামের ভেতরে এসে শেষ হয়েছে। ওই গুদামে আগুন লাগার পর শ্রমিকেরা বের হতে চাইলে কারখানার ম্যানেজার শ্রমিকদের বাধা দিয়ে বলেন, আগুন লাগেনি, অগ্নিনির্বাপণের মহড়া চলছে। এরপর তিনি বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দেন।
শুরু থেকে এ মামলার কার্যক্রম মনিটরিং করছেন গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম সবুজ। তিনি বলেন, গত ১২ বছর আমরা শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন গবেষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, সংস্কৃতি কর্মী এবং গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম তাজরীন মামলাটির কার্যক্রমকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। প্রত্যেকটি সাক্ষ্য-শুনানিতে উপস্থিত থেকেছি। বছরের পর বছর আদালতে আসা-যাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা মনে করি, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার পেছনে মামলাটি পরিচালনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের দায়সারা ভাব দায়ী। আমরা তিল তিল করে প্রত্যক্ষ করেছি যে, বিচারকার্য পরিচালনায় রাষ্ট্রপক্ষের এই ব্যবস্থাগত অবহেলা, ঔদাসীন্য মালিকের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
তাজরীন ট্র্যাজেডিতে নিহত ও আহতের পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২৪ নভেম্বর মনে করিয়ে দেয় স্বজন হারানোর বেদনা। এই দিনে কেউ হারিয়েছে মাকে, বোনকে, বাবাকে কেউ বা আবার হারিয়েছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে। এইদিন ডুকরে কেঁদে ওঠে স্বজন হারানো মানুষগুলো। উপার্জনক্ষম মানুষগুলোই এখন তাদের পরিবারের বোঝা, কেউবা কোনোমতে দোকান দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের জীবন যুদ্ধ। কেউবা চিকিৎসা করাতেই নামমাত্র ক্ষতিপূরণসহ শেষ করেছেন তাদের সর্বস্ব। আবার অনেকেই বঞ্চিত হয়েছেন ক্ষতিপূরণ থেকেও। তারা ১২ বছর ধরে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের আশায় আছেন।
তাজরীনে আহত নারী শ্রমিক শিল্পী বেগম জানান, ঘটনার দিন আগুনের লেলিহান শিখা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সিঁড়ি দিয়ে তড়িঘড়ি করে নামার সময় হঠাৎ নিচে পড়ে যান তিনি। এতে তার দুই হাত-পা ও মাজায় প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত হন। পরে দীর্ঘদিন সাভারের পক্ষাগতগ্রস্থদের পুনর্বাসন কেন্দ্র সিআরপিতে চিকিৎসা নিয়ে বেঁচে ফিরলেও এখনও জীবন যুদ্ধে থেমে নেই। জীবিকার তাগিদে বর্তমানে চায়ের দোকানে চলছে তার সংসার। সরকারসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে সাময়িক কিছু সহায়তা পেলেও পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন পাননি তিনি। বহু পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম মানুষ হারিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিন পার করছেন।
আহত সবিতা রাণী জানান, কারখানাটির তৃতীয় তলায় তিনি স্যুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যে সামান্য সহায়তা পেয়েছেন তা চিকিৎসা করাতেই শেষ হয়ে গেছে। বারবার আশ্বাস দিলেও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন করা হয়নি। ক্ষতিপূরণ পেলে তিনি গ্রামে গিয়ে কিছু একটা করে সংসার চালাবেন বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুনর্বাসন সহ ক্ষতিপূরণের দাবি জানান।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র সাভার-আশুলিয়া আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় জীবন বাঁচাতে যখন শ্রমিকরা চিৎকার করছিলেন তখনো মালিক দেলোয়ার হোসেন কারখানা থেকে বের হওয়ার সব গেটে তালা লাগিয়ে রাখেন। প্রাণে বাঁচতে অনেক শ্রমিক ভবনের বিভিন্ন তলা থেকে লাফিয়ে পড়েন।
স্থানীয়রা জানান, সেদিন সন্ধ্যার দিকে তাজরীন ফ্যাশনস পোশাক কারখানাটির নিচ তলার তুলার গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা পুরো আট তলা কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। ১২ বছর পরও আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবনটি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলেও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেনা ভুক্তভোগী শ্রমিকেরা। শারীরিক যন্ত্রণা, সংসারের অভাব অনটনের পাশাপাশি দোষীদের শাস্তি না পাওয়ার আক্ষেপ নিয়ে দিন পার করছেন। আজও সে রাতের কথা মনে পড়লে আঁতকে ওঠেন তারা।
সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায় সংস্কার কমিশনসংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায় সংস্কার কমিশন
তাজরীন ফ্যাশনের চতুর্থ তলায় কাজ করতেন নাসিমা আক্তার। অগ্নিকাণ্ডের সময় প্রাণ বাঁচাতে ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। নাসিমা আক্তার বলেন, দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে চলাফেরা করতে পারলেও কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। এখন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। ওষুধ কিনতে পারি না। তিন বেলা খাবার পাই না। আমাদের আলাদা চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
তাজরীন ফ্যাশনের আহত শ্রমিক জরিনা আক্তার বলেন, স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের আমলে দোষীদের শাস্তি হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের পর আমাদেরকে নামমাত্র কিছু টাকা দেয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে আমারা পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ ও দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু আমাদের কোনো দাবি পূরণ হয়নি। অবিলম্বে কারখানার মালিক দেলোয়ারসহ দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আশাকরি অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের দাবি পূরণ করবে।
তাজরীন ট্র্যাজেডিতে স্বামী হারান ফাতেমা আক্তার। তিনি নিজেও গুরুতর আহত হন। তিনি বলেন, স্বামী-স্ত্রী দুজনেই তাজরীন ফাশনে কাজ করতাম। তখন আমি ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম। নিজে আহত হয়ে দুই সন্তান নিয়ে অসুস্থ শরীরে খুব কষ্টে আছি। আমাদের ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক।
ক্ষতিপূরণের মানদণ্ড নেই
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারিত হবে শ্রমিকের বয়স, দক্ষতা ও মজুরির ভিত্তিতে। দেশে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের মানদণ্ড নির্ধারণে এ সুপারিশ মানার দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়। বাস্তবে সংশোধিত শ্রম আইনে এই দাবি আমলে নেয়া হয়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাজরীন ফ্যাশনস ও রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা।
শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ এক লাখ টাকা। ২০১৬ সালে আইনের সংশোধনীতে টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়। ওই আইনে আহতদের ক্ষতিপূরণ আড়াই লাখ টাকা। আইএলও কনভেনশনের ১২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ শ্রমিকের বয়স, দক্ষতা ও মজুরির ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। তাজরীন ফ্যাশনসের হতাহতদের গড় বয়স ২৫ বছর। দেশের আইন অনুযায়ী, একজন শ্রমিক যদি ৫৯ বছর কাজ করতে পারে, তাহলে তাঁর কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্রম কমিশন ক্ষতিপূরণের একটি সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করে দেয়ার সুপারিশ করেছে। এ জন্য একটি মানদণ্ড নির্ধারণেরও সুপারিশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, আইএলওর সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ এবং দেশে হাইকোর্টের এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী যেন মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়। একটি ত্রিপক্ষীয় কমিটি গঠন করে তাদের মাধ্যমে ন্যায্য মানদণ্ড নির্ধারণের কথা বলা হয় প্রতিবেদনে।
গত ২৩ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুমোদন দেয়া হয়। এরপর ১৭ নভেম্বর জারি করা অধ্যাদেশ গেজেট আকারে প্রকাশ করে সরকার। এতে কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ তহবিল প্রসঙ্গে বলা হয়, সরকার বিধি দ্বারা উপযুক্ত বিবেচিত কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত একটি ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করবে। এতে তহবিল ব্যবস্থাপনা বোর্ডের গঠন, কার্যাবলি, সুবিধার প্রকার ও মাত্রা নির্ধারণ, তহবিলের অর্থের উৎস পদ্ধতি ও কার্যকর প্রশাসন এবং বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অর্থাৎ, শ্রমিক পক্ষের মূল যে দাবি একটি স্থায়ী মানদণ্ড নির্ধারণ, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলা নেই সংশোধিত শ্রম আইনে।
সংশোধিত আইন অনুযায়ী, সব খাতের শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণ পাবেন না। এতে বলা হয়, সরকার গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা কোন কোন শিল্প খাতে ক্ষতিপূরণ তহবিল প্রযোজ্য হবে, তাহা নির্ধারণ করিতে পারিবে এবং এইরূপ নির্ধারণের পর কর্মস্থলে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ধারা ১৫০-এর আওতায় মালিকের দায়িত্ব-সংক্রান্ত এই আইনের বিধানাবলি সংশ্লিষ্ট শিল্প বা খাতের মালিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইবে না।
শ্রম আইন সংশোধন-সংক্রান্ত ত্রিপক্ষীয় পরামর্শক পর্ষদের (টিএসএস) সদস্য সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন গতকাল সমকালকে বলেন, তাদের দাবি সত্ত্বেও সংশোধিত শ্রম আইনে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আমলে নেয়া হয়নি। এ নিয়ে সব পর্যায়ের শ্রমিকরা হতাশ এবং ক্ষুব্ধ। শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের তের বছরেও শেষ হয়নি বিচার
মরিয়ম সেঁজুতি
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২৫, ১৭: ৪৮

তাজরীন ট্র্যাজেডির ১৩ বছর আজ। দেশের পোশাক খাতে অগ্নিকাণ্ডের ভয়ালতম ঘটনার সাক্ষী ঢাকার আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনস। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও শত শত আহত শ্রমিক এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। এখনো পুনর্বাসিত না হওয়ায় আক্ষেপ তাদের। ওই ঘটনার ১৩ বছর পূর্তি আজ। সেই দৃশ্য মনে পড়লে আঁতকে ওঠেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মামলা আদালতে নিষ্পত্তি হয়নি এখনো। মামলার আসামির তালিকায় বিগত সরকারের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা থাকায় তদন্ত ও বিচারকাজে এত সময় লাগছে বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। এদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মন্তব্য করেন, দায়ীদের বিচারের আওতায় না আনায় দেশে এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
এদিকে, দেশে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের মানদণ্ড নির্ধারণে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশনের সুপারিশ মানার দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়। বাস্তবে সংশোধিত শ্রম আইনে এই দাবি আমলে নেয়া হয়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাজরীন ফ্যাশনস ও রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা।
২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডে ১১৭ জন শ্রমিক প্রাণ হারান। আহত হয়েছিলেন অন্তত দুই শতাধিক। দিনটি উপলক্ষে সোমবার (২৪ নভেম্বর) সকালে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে পুড়ে যাওয়া তাজরীন ফ্যাশনসের কারখানার সামনে হতাহত শ্রমিক পরিবারের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। সকাল ৯টায় বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির পক্ষ থেকে কারখানা ফটকের সামনে আগুনে পুড়ে নিহত শ্রমিকদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পরে সেখানে সংগঠনের সভাপ্রধান তাসলিমা আখতারের সভাপতিত্বে সমাবেশ ও মিছিল করা হয়।

এসময় আহত শ্রমিকরা সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদের মনের কষ্টের কথা জানান। তারা তাজরীনে হতাহত শ্রমিক পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসার দাবি জানান। শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সরকার ও বিজিএম-এর কাছ থেকে মেলেনি তেমন কোনো সহায়তা। পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসা পাননি হতাহতরা। তাদের দাবি, মানববন্ধন, আলোচনাসভা, শ্রদ্ধা আর গণমাধ্যমের প্রচারে আটকে আছে তাজরীন ট্রাজেডি। তারা বলেন, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছে হতাহতদের পরিবার।
এদিকে, মূল হোতা কারখানার মালিক দেলোয়ারসহ দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় হতাশ ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
এসময় বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান শ্রমিকনেতা তাসলিমা আখতার বলেন, ১৩ বছর আগে ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর মালিকপক্ষের অব্যবস্থাপনা, কাঠামোগত ত্রুটি এবং সরকারি ছাড়পত্রে ত্রুটিপূর্ণ কারখানা চালাবার সুযোগের কারণে তাজরীনে ১১২ জন শ্রমিক আগুণে পুড়ে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি এই ঘটনাকে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড হিসাবে অভিহিত করেন। ১৩ বছর পার হলেও বিচার প্রক্রিয়ার ধীর গতি এবং সরকারের অবহেলার কারণে এতো বড় শ্রমিক হত্যার বিচার হয়নি। এই ঘটনা শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে ন্যাক্কারজনক ঘটনা হিসাবেই থাকবে। তিনি একইসাথে বলেন, দেলোয়ার হোসেনসহ ১৩ আসামীর শাস্তি হলে এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ হতো, অন্যান্য কারখানার মালিকরা সতর্ক হতো, রানা প্লাজা, রূপগঞ্জের মতো ঘটনায় নির্মম মৃত্যু দেখতে হতো না।
বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের (বিজিএসএফ) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অরবিন্দু বেপারী (বিন্দু) বলেন, ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেডে আগুন লাগে। মালিকপক্ষ সুপরিকল্পিতভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু ঘটায়। আজ পর্যন্ত মৃত শ্রমিকদের স্বজনরা ক্ষতিপূরণ পাননি। আহত শ্রমিকরা সুচিকিৎসা পায়নি। সহযোগিতা পায়নি। এখানে হত্যাকাণ্ড ঘটালেও আগের সরকার মালিককে নামমাত্র গ্রেপ্তার করে, তারপর তিন জামিন পান। এরপর তিনি আওয়ামী মৎসজীবী লীগের সভাপতি হয়ে দাপট দেখিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি জানাই, আগের সরকারের আমলে শ্রমিক হত্যার বিচার হয়নি, এই সরকার তদন্ত করে শ্রমিক হত্যার বিচার করবে।
তিনি বলেন, তাজরীন ফ্যাশনের যে পরিত্যক্ত জমি রয়েছে, সেখানে সরকারি অর্থায়নে একটি শ্রমজীবী হাসপাতাল নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি। এর মাধ্যমে সরকার শ্রমিকদের বিনামূল্যে সুচিকিৎসা দিতে পারবে।
জানা গেছে, তাজরীন ফ্যাশন গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পরদিন আশুলিয়া থানার এসআই খায়রুল ইসলাম একটি মামলা করেন। এরপর ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক একেএম মহসিনুজ্জামান খান আদালতে ১৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আদালত তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেনসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর বিচার শুরু করেন আদালত।
এরপর থেকে চলতি বছর (২০২৪) পর্যন্ত ১০৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্য দিয়েছেন মালা নামে একজন শ্রমিক। সাক্ষে তিনি বলেন, আগুন লাগার পরও কারখানার ফ্লোর ম্যানেজাররা আগুন লাগে নাই বলে শ্রমিকদের কাজে মন দিতে বলেন। কিছুক্ষণ পর বিদ্যুৎ চলে যায়। ধোঁয়ায় পুরো ঘর অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। নিচে নেমে কেসি গেটে তালা পাই। এরপর তিন তলায় উঠে যাই। কয়েকজন মিলে জানালা ভেঙে ভবন থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ি। এরপর দীর্ঘ দিন হাসপাতালে ছিলাম।
এ মামলায় অভিযুক্ত আসামিরা হলেন- প্রতিষ্ঠানের মালিক দেলোয়ার হোসেন, চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তার, স্টোর ইনচার্জ (সুতা) আল আমিন, সিকিউরিটি ইনচার্জ আনিসুর রহমান, সিকিউরিটি সুপারভাইজার আল আমিন, স্টোর ইনচার্জ হামিদুল ইসলাম লাভলু, অ্যাডমিন অফিসার দুলাল উদ্দিন, প্রকৌশলী এম মাহবুবুল মোর্শেদ, সিকিউরিটি গার্ড রানা ওরফে আনোয়ারুল, ফ্যাক্টরি ম্যানেজার আব্দুর রাজ্জাক, প্রোডাকশন ম্যানেজার মোবারক হোসেন মঞ্জুর, শামীম ও শহীদুজ্জামান দুলাল। আসামিদের মধ্যে আল আমিন, রানা, শামীম ও মোবারক হোসেন পলাতক রয়েছেন। আর বাকি সব আসামি জামিনে আছেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়- কারখানা ভবনটি ইমারত নির্মাণ আইন মেনে করা হয়নি। ভবনটিতে জরুরি বহির্গমন পথ ছিল না। তিনটি সিঁড়ির মধ্যে দুটি নিচতলার গুদামের ভেতরে এসে শেষ হয়েছে। ওই গুদামে আগুন লাগার পর শ্রমিকেরা বের হতে চাইলে কারখানার ম্যানেজার শ্রমিকদের বাধা দিয়ে বলেন, আগুন লাগেনি, অগ্নিনির্বাপণের মহড়া চলছে। এরপর তিনি বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দেন।
শুরু থেকে এ মামলার কার্যক্রম মনিটরিং করছেন গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম সবুজ। তিনি বলেন, গত ১২ বছর আমরা শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন গবেষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, সংস্কৃতি কর্মী এবং গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম তাজরীন মামলাটির কার্যক্রমকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। প্রত্যেকটি সাক্ষ্য-শুনানিতে উপস্থিত থেকেছি। বছরের পর বছর আদালতে আসা-যাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা মনে করি, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার পেছনে মামলাটি পরিচালনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের দায়সারা ভাব দায়ী। আমরা তিল তিল করে প্রত্যক্ষ করেছি যে, বিচারকার্য পরিচালনায় রাষ্ট্রপক্ষের এই ব্যবস্থাগত অবহেলা, ঔদাসীন্য মালিকের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
তাজরীন ট্র্যাজেডিতে নিহত ও আহতের পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২৪ নভেম্বর মনে করিয়ে দেয় স্বজন হারানোর বেদনা। এই দিনে কেউ হারিয়েছে মাকে, বোনকে, বাবাকে কেউ বা আবার হারিয়েছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে। এইদিন ডুকরে কেঁদে ওঠে স্বজন হারানো মানুষগুলো। উপার্জনক্ষম মানুষগুলোই এখন তাদের পরিবারের বোঝা, কেউবা কোনোমতে দোকান দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের জীবন যুদ্ধ। কেউবা চিকিৎসা করাতেই নামমাত্র ক্ষতিপূরণসহ শেষ করেছেন তাদের সর্বস্ব। আবার অনেকেই বঞ্চিত হয়েছেন ক্ষতিপূরণ থেকেও। তারা ১২ বছর ধরে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের আশায় আছেন।
তাজরীনে আহত নারী শ্রমিক শিল্পী বেগম জানান, ঘটনার দিন আগুনের লেলিহান শিখা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সিঁড়ি দিয়ে তড়িঘড়ি করে নামার সময় হঠাৎ নিচে পড়ে যান তিনি। এতে তার দুই হাত-পা ও মাজায় প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত হন। পরে দীর্ঘদিন সাভারের পক্ষাগতগ্রস্থদের পুনর্বাসন কেন্দ্র সিআরপিতে চিকিৎসা নিয়ে বেঁচে ফিরলেও এখনও জীবন যুদ্ধে থেমে নেই। জীবিকার তাগিদে বর্তমানে চায়ের দোকানে চলছে তার সংসার। সরকারসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে সাময়িক কিছু সহায়তা পেলেও পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন পাননি তিনি। বহু পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম মানুষ হারিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিন পার করছেন।
আহত সবিতা রাণী জানান, কারখানাটির তৃতীয় তলায় তিনি স্যুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যে সামান্য সহায়তা পেয়েছেন তা চিকিৎসা করাতেই শেষ হয়ে গেছে। বারবার আশ্বাস দিলেও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন করা হয়নি। ক্ষতিপূরণ পেলে তিনি গ্রামে গিয়ে কিছু একটা করে সংসার চালাবেন বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুনর্বাসন সহ ক্ষতিপূরণের দাবি জানান।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র সাভার-আশুলিয়া আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় জীবন বাঁচাতে যখন শ্রমিকরা চিৎকার করছিলেন তখনো মালিক দেলোয়ার হোসেন কারখানা থেকে বের হওয়ার সব গেটে তালা লাগিয়ে রাখেন। প্রাণে বাঁচতে অনেক শ্রমিক ভবনের বিভিন্ন তলা থেকে লাফিয়ে পড়েন।
স্থানীয়রা জানান, সেদিন সন্ধ্যার দিকে তাজরীন ফ্যাশনস পোশাক কারখানাটির নিচ তলার তুলার গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা পুরো আট তলা কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। ১২ বছর পরও আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবনটি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলেও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেনা ভুক্তভোগী শ্রমিকেরা। শারীরিক যন্ত্রণা, সংসারের অভাব অনটনের পাশাপাশি দোষীদের শাস্তি না পাওয়ার আক্ষেপ নিয়ে দিন পার করছেন। আজও সে রাতের কথা মনে পড়লে আঁতকে ওঠেন তারা।
সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায় সংস্কার কমিশনসংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায় সংস্কার কমিশন
তাজরীন ফ্যাশনের চতুর্থ তলায় কাজ করতেন নাসিমা আক্তার। অগ্নিকাণ্ডের সময় প্রাণ বাঁচাতে ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। নাসিমা আক্তার বলেন, দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে চলাফেরা করতে পারলেও কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। এখন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। ওষুধ কিনতে পারি না। তিন বেলা খাবার পাই না। আমাদের আলাদা চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
তাজরীন ফ্যাশনের আহত শ্রমিক জরিনা আক্তার বলেন, স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের আমলে দোষীদের শাস্তি হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের পর আমাদেরকে নামমাত্র কিছু টাকা দেয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে আমারা পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ ও দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু আমাদের কোনো দাবি পূরণ হয়নি। অবিলম্বে কারখানার মালিক দেলোয়ারসহ দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আশাকরি অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের দাবি পূরণ করবে।
তাজরীন ট্র্যাজেডিতে স্বামী হারান ফাতেমা আক্তার। তিনি নিজেও গুরুতর আহত হন। তিনি বলেন, স্বামী-স্ত্রী দুজনেই তাজরীন ফাশনে কাজ করতাম। তখন আমি ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম। নিজে আহত হয়ে দুই সন্তান নিয়ে অসুস্থ শরীরে খুব কষ্টে আছি। আমাদের ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক।
ক্ষতিপূরণের মানদণ্ড নেই
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারিত হবে শ্রমিকের বয়স, দক্ষতা ও মজুরির ভিত্তিতে। দেশে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের মানদণ্ড নির্ধারণে এ সুপারিশ মানার দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়। বাস্তবে সংশোধিত শ্রম আইনে এই দাবি আমলে নেয়া হয়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাজরীন ফ্যাশনস ও রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা।
শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ এক লাখ টাকা। ২০১৬ সালে আইনের সংশোধনীতে টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়। ওই আইনে আহতদের ক্ষতিপূরণ আড়াই লাখ টাকা। আইএলও কনভেনশনের ১২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ শ্রমিকের বয়স, দক্ষতা ও মজুরির ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। তাজরীন ফ্যাশনসের হতাহতদের গড় বয়স ২৫ বছর। দেশের আইন অনুযায়ী, একজন শ্রমিক যদি ৫৯ বছর কাজ করতে পারে, তাহলে তাঁর কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্রম কমিশন ক্ষতিপূরণের একটি সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করে দেয়ার সুপারিশ করেছে। এ জন্য একটি মানদণ্ড নির্ধারণেরও সুপারিশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, আইএলওর সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ এবং দেশে হাইকোর্টের এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী যেন মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়। একটি ত্রিপক্ষীয় কমিটি গঠন করে তাদের মাধ্যমে ন্যায্য মানদণ্ড নির্ধারণের কথা বলা হয় প্রতিবেদনে।
গত ২৩ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুমোদন দেয়া হয়। এরপর ১৭ নভেম্বর জারি করা অধ্যাদেশ গেজেট আকারে প্রকাশ করে সরকার। এতে কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ তহবিল প্রসঙ্গে বলা হয়, সরকার বিধি দ্বারা উপযুক্ত বিবেচিত কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত একটি ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করবে। এতে তহবিল ব্যবস্থাপনা বোর্ডের গঠন, কার্যাবলি, সুবিধার প্রকার ও মাত্রা নির্ধারণ, তহবিলের অর্থের উৎস পদ্ধতি ও কার্যকর প্রশাসন এবং বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অর্থাৎ, শ্রমিক পক্ষের মূল যে দাবি একটি স্থায়ী মানদণ্ড নির্ধারণ, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলা নেই সংশোধিত শ্রম আইনে।
সংশোধিত আইন অনুযায়ী, সব খাতের শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণ পাবেন না। এতে বলা হয়, সরকার গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা কোন কোন শিল্প খাতে ক্ষতিপূরণ তহবিল প্রযোজ্য হবে, তাহা নির্ধারণ করিতে পারিবে এবং এইরূপ নির্ধারণের পর কর্মস্থলে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ধারা ১৫০-এর আওতায় মালিকের দায়িত্ব-সংক্রান্ত এই আইনের বিধানাবলি সংশ্লিষ্ট শিল্প বা খাতের মালিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইবে না।
শ্রম আইন সংশোধন-সংক্রান্ত ত্রিপক্ষীয় পরামর্শক পর্ষদের (টিএসএস) সদস্য সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন গতকাল সমকালকে বলেন, তাদের দাবি সত্ত্বেও সংশোধিত শ্রম আইনে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আমলে নেয়া হয়নি। এ নিয়ে সব পর্যায়ের শ্রমিকরা হতাশ এবং ক্ষুব্ধ। শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।




