নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা: অর্থনীতি নিয়ে উৎকণ্ঠায় ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা

নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা: অর্থনীতি নিয়ে উৎকণ্ঠায় ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা
মরিয়ম সেঁজুতি
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২৫, ১৯: ১০

দেশের ইতিহাসে প্রায় প্রতিটি নির্বাচন ঘিরেই দেখা গেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এতে উৎকণ্ঠায় পড়েছেন ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। এর প্রভাবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা কাটছে না। রপ্তানি বাণিজ্যে ধীরগতি, বিনিয়োগও প্রায় স্থবির। কারখানায় জ্বালানি সমস্যার পাশাপাশি ডলার সংকটও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থায়ন সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি এখন বহুমুখী সংকটে পড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে বৈশ্বিক সংকট ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে। শ্রমিক আন্দোলন, কারখানা বন্ধের মত বড় প্রতিবন্ধকতার মুখে শিল্প খাত। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নির্বাচনকেন্দ্রিক অনিশ্চয়তার দ্রুত সমাধান চান তারা। ব্যবসায়ীদের মতে, সংকট থেকে উত্তরণের জন্য উৎপাদন খরচ কমানো এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। অপরদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রপ্তানি পণ্য বৈচিত্রকরণ ও নতুন বাজার সম্প্রসারণে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটলে অর্থনীতিতেও গতি আসবে বলে মনে করেন তারা। সম্ভাবনাময় অনেক শিল্প-কারখানা যেমন অর্থাভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না, তেমনি বহু প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না। এমন সময় ফের অস্থিরতা বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের ইতিহাসে প্রায় প্রতিটি নির্বাচন ঘিরেই দেখা গেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির ওপর যা সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে এবারেও অস্থির হয়ে উঠেছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। নির্বাচনের আগে কয়েকটি দলের যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সহিংসতার আশঙ্কায় উৎকণ্ঠায় ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। নতুন বিনিয়োগে খরা এবং অর্থনৈতিক সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২৯ শতাংশে নেমেছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তারল্য সংকটে নতুন ঋণপত্র খুলতে সমস্যায় পড়ছেন উদ্যোক্তারা। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত টানা তিন মাস রপ্তানি কমেছে। ঋণের উচ্চ সুদহার বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা। সব মিলিয়ে স্বস্তি মিলছে না অর্থনীতিতে।
এফবিসিসিআই সাবেক পরিচালক খন্দকার রুহুল আমিন বলেন,
এভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে জনগণের ক্রয় ক্ষমতা কমে যাবে। আর ক্রয়ক্ষমতা যদি কমে যায়, তাহলে আমাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হবে নিম্নমুখী। এখানে আমার ধারণা যে, প্রবৃদ্ধি চারের নিচে চলে আসতে পারে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বায়াররাও এ সময়টাতে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করছে। যারা আসতে চাচ্ছিল, তারাও বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে আসতে রাজি হচ্ছে না। কোনো কোনো বায়ার বলছে ঠিক আছে, আপনাদের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসুক, নির্বাচন হোক, এরপর আমরা চিন্তাভাবনা করবো। আবার যারা বিনিয়োগ করবে তারাও অপেক্ষায় আছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোনদিকে যায়, সেটা বোঝার চেষ্টা করছে।
৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বন্ধ হয়েছে রপ্তানিমুখী অনেক কারখানা। বিজিএমইএ-এর হিসাবে গত ১৪ মাসে শুধু পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে ৩৫৩টির মত। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, সরকারের নীতিগত পরিবর্তন, এনবিআরে কর্মবিরতি ও বন্দরের সক্ষমতার অভাবে বেড়েছে কারখানা বন্ধের হার। এছাড়া, রাজনৈতিক অস্থিরতায় রপ্তানি আরও কমার শঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বিকেএমইএ সভাপতি আরও বলেন, বিভিন্ন সময় যে পলিসিগুলো হঠাৎ পাল্টানো হয় এটা অনেক ক্ষেত্রে বায়াররা গ্রহণ করতে পারে না। সম্প্রতি এনবিআরের জটিলতা, কোর্টের ইনিফিশিয়েন্সি, বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন সবমিলিয়ে তারা দ্বিধায় পড়ে যায়। আবার প্রতি নির্বাচনের সময়েই বায়াররা ইচ্ছা করে কিছু অর্ডার কমিয়ে দেয়। তারা কনসার্ন থাকে তাদের পণ্য ঠিকমতো ডেলিভারি হবে কি-না।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এমনিতেই সারাবছর এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে কেটেছে দেশের অর্থনীতি। মোটা দাগে প্রভাব দেখা গেছে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান বা মজুরি স্থবিরতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি দেশ।
তিনি আরও বলেন, বহির্বাণিজ্য লেনদেনে মোটামুটি ভারসাম্য ছিল। তবে এটা সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্ব বহন করে না। তাদের কাছে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহণ করে তা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। যদিও বছরের শুরুতে মূল্যস্ফীতি যা ছিল, বছর শেষে তার চেয়ে কিছুটা কমেছে। তবে বৃদ্ধির হার কমেছে, মূল্য কমেনি। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি যে হারে বাড়ছিল তার চেয়ে ৪ শতাংশ কম হারে বাড়ছে, কিন্তু এখনো ৮ শতাংশের ঘরে অবস্থান করছে। মূল্যস্ফীতির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানেও নিয়ে আসতে পারেনি সরকার। ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি। রপ্তানিও পতনের দিকে আছে।
ড. জাহিদ বলেন, নির্বাচনের যে অনিশ্চয়তা ছিল, তা কিছুটা কাটতে শুরু করেছে। এক্ষেত্রেও যাদি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণ ফিরে না আসে, একটি মশৃণ রাজনৈতিক উত্তোরণ না হয়, সে পর্যন্ত আশাবাদি হতে পারি, তবে পকেটে হাত দিব না। অর্থাৎ বিনিয়োগ করবো না। তিনি আরও বলেন, আমার মনে হয় না ফেব্রুয়ারির আগে নতুন বিনিয়োগ আসবে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, যেকোনো রাজনৈতিক ট্রানজিশনের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হলে দেশের ভেতর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। দেশের মানুষ আসলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনেই দেশ পরিচালনা পছন্দ করেন। যেহেতু একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সেটি দ্রুত শেষ করে যেন নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়, সেটি আসলে এ মুহূর্তে জনগণের প্রত্যাশা।
তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগ ও ব্যবসায় আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে জরুরি। শান্তিপূর্ণ সমাধান ও স্থিতিশীল পরিবেশ না এলে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও শিল্পখাতে ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
টানা ৩ মাস রপ্তানি কমেছে
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই উৎসের একটি রপ্তানি। টানা তিন মাস ধরে দেশের এ খাতের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট মহলে বাড়ছে অস্বস্তি।
চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয় প্রায় ২৫ শতাংশ। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতি মাসে রপ্তানি কমেছে। আগস্টে রপ্তানি হয়েছে ৩৯১ কোটি ৫০ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বরে ৩৬২ কোটি ৭৬ ও অক্টোবরে ৩৮২ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। সে হিসেবে দেখা গেছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আগস্টে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে কমেছে যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬১ ও ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
দেশের রপ্তানি খাতের প্রধান পণ্য তৈরি পোশাক, যা মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাসের পর থেকেই এ খাতে ধারাবাহিক পতন দেখা গেছে। গেলো অক্টোবরে পোশাক খাতে রপ্তানি হয়েছে ৩০২ কোটি ডলার। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে এর পরিমাণ ছিলো যথাক্রমে ৩১৭ ও ২৮৪ কোটি ডলার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ৬০ কোটি ডলার।
ইপিবির তথ্য বলছে, গত অক্টোবরে তৈরি পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হিমায়িত চিংড়ি, প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি কমেছে। বেড়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, চামড়াবিহীন জুতা ও প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি।

দেশের ইতিহাসে প্রায় প্রতিটি নির্বাচন ঘিরেই দেখা গেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এতে উৎকণ্ঠায় পড়েছেন ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। এর প্রভাবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা কাটছে না। রপ্তানি বাণিজ্যে ধীরগতি, বিনিয়োগও প্রায় স্থবির। কারখানায় জ্বালানি সমস্যার পাশাপাশি ডলার সংকটও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থায়ন সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি এখন বহুমুখী সংকটে পড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে বৈশ্বিক সংকট ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে। শ্রমিক আন্দোলন, কারখানা বন্ধের মত বড় প্রতিবন্ধকতার মুখে শিল্প খাত। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নির্বাচনকেন্দ্রিক অনিশ্চয়তার দ্রুত সমাধান চান তারা। ব্যবসায়ীদের মতে, সংকট থেকে উত্তরণের জন্য উৎপাদন খরচ কমানো এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। অপরদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রপ্তানি পণ্য বৈচিত্রকরণ ও নতুন বাজার সম্প্রসারণে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটলে অর্থনীতিতেও গতি আসবে বলে মনে করেন তারা। সম্ভাবনাময় অনেক শিল্প-কারখানা যেমন অর্থাভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না, তেমনি বহু প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না। এমন সময় ফের অস্থিরতা বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের ইতিহাসে প্রায় প্রতিটি নির্বাচন ঘিরেই দেখা গেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির ওপর যা সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে এবারেও অস্থির হয়ে উঠেছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। নির্বাচনের আগে কয়েকটি দলের যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সহিংসতার আশঙ্কায় উৎকণ্ঠায় ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। নতুন বিনিয়োগে খরা এবং অর্থনৈতিক সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২৯ শতাংশে নেমেছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তারল্য সংকটে নতুন ঋণপত্র খুলতে সমস্যায় পড়ছেন উদ্যোক্তারা। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত টানা তিন মাস রপ্তানি কমেছে। ঋণের উচ্চ সুদহার বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা। সব মিলিয়ে স্বস্তি মিলছে না অর্থনীতিতে।
এফবিসিসিআই সাবেক পরিচালক খন্দকার রুহুল আমিন বলেন,
এভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে জনগণের ক্রয় ক্ষমতা কমে যাবে। আর ক্রয়ক্ষমতা যদি কমে যায়, তাহলে আমাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হবে নিম্নমুখী। এখানে আমার ধারণা যে, প্রবৃদ্ধি চারের নিচে চলে আসতে পারে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বায়াররাও এ সময়টাতে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করছে। যারা আসতে চাচ্ছিল, তারাও বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে আসতে রাজি হচ্ছে না। কোনো কোনো বায়ার বলছে ঠিক আছে, আপনাদের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসুক, নির্বাচন হোক, এরপর আমরা চিন্তাভাবনা করবো। আবার যারা বিনিয়োগ করবে তারাও অপেক্ষায় আছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোনদিকে যায়, সেটা বোঝার চেষ্টা করছে।
৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বন্ধ হয়েছে রপ্তানিমুখী অনেক কারখানা। বিজিএমইএ-এর হিসাবে গত ১৪ মাসে শুধু পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে ৩৫৩টির মত। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, সরকারের নীতিগত পরিবর্তন, এনবিআরে কর্মবিরতি ও বন্দরের সক্ষমতার অভাবে বেড়েছে কারখানা বন্ধের হার। এছাড়া, রাজনৈতিক অস্থিরতায় রপ্তানি আরও কমার শঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বিকেএমইএ সভাপতি আরও বলেন, বিভিন্ন সময় যে পলিসিগুলো হঠাৎ পাল্টানো হয় এটা অনেক ক্ষেত্রে বায়াররা গ্রহণ করতে পারে না। সম্প্রতি এনবিআরের জটিলতা, কোর্টের ইনিফিশিয়েন্সি, বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন সবমিলিয়ে তারা দ্বিধায় পড়ে যায়। আবার প্রতি নির্বাচনের সময়েই বায়াররা ইচ্ছা করে কিছু অর্ডার কমিয়ে দেয়। তারা কনসার্ন থাকে তাদের পণ্য ঠিকমতো ডেলিভারি হবে কি-না।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এমনিতেই সারাবছর এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে কেটেছে দেশের অর্থনীতি। মোটা দাগে প্রভাব দেখা গেছে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান বা মজুরি স্থবিরতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি দেশ।
তিনি আরও বলেন, বহির্বাণিজ্য লেনদেনে মোটামুটি ভারসাম্য ছিল। তবে এটা সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্ব বহন করে না। তাদের কাছে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহণ করে তা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। যদিও বছরের শুরুতে মূল্যস্ফীতি যা ছিল, বছর শেষে তার চেয়ে কিছুটা কমেছে। তবে বৃদ্ধির হার কমেছে, মূল্য কমেনি। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি যে হারে বাড়ছিল তার চেয়ে ৪ শতাংশ কম হারে বাড়ছে, কিন্তু এখনো ৮ শতাংশের ঘরে অবস্থান করছে। মূল্যস্ফীতির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানেও নিয়ে আসতে পারেনি সরকার। ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি। রপ্তানিও পতনের দিকে আছে।
ড. জাহিদ বলেন, নির্বাচনের যে অনিশ্চয়তা ছিল, তা কিছুটা কাটতে শুরু করেছে। এক্ষেত্রেও যাদি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণ ফিরে না আসে, একটি মশৃণ রাজনৈতিক উত্তোরণ না হয়, সে পর্যন্ত আশাবাদি হতে পারি, তবে পকেটে হাত দিব না। অর্থাৎ বিনিয়োগ করবো না। তিনি আরও বলেন, আমার মনে হয় না ফেব্রুয়ারির আগে নতুন বিনিয়োগ আসবে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, যেকোনো রাজনৈতিক ট্রানজিশনের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হলে দেশের ভেতর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। দেশের মানুষ আসলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনেই দেশ পরিচালনা পছন্দ করেন। যেহেতু একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সেটি দ্রুত শেষ করে যেন নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়, সেটি আসলে এ মুহূর্তে জনগণের প্রত্যাশা।
তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগ ও ব্যবসায় আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে জরুরি। শান্তিপূর্ণ সমাধান ও স্থিতিশীল পরিবেশ না এলে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও শিল্পখাতে ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
টানা ৩ মাস রপ্তানি কমেছে
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই উৎসের একটি রপ্তানি। টানা তিন মাস ধরে দেশের এ খাতের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট মহলে বাড়ছে অস্বস্তি।
চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয় প্রায় ২৫ শতাংশ। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতি মাসে রপ্তানি কমেছে। আগস্টে রপ্তানি হয়েছে ৩৯১ কোটি ৫০ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বরে ৩৬২ কোটি ৭৬ ও অক্টোবরে ৩৮২ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। সে হিসেবে দেখা গেছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আগস্টে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে কমেছে যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬১ ও ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
দেশের রপ্তানি খাতের প্রধান পণ্য তৈরি পোশাক, যা মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাসের পর থেকেই এ খাতে ধারাবাহিক পতন দেখা গেছে। গেলো অক্টোবরে পোশাক খাতে রপ্তানি হয়েছে ৩০২ কোটি ডলার। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে এর পরিমাণ ছিলো যথাক্রমে ৩১৭ ও ২৮৪ কোটি ডলার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ৬০ কোটি ডলার।
ইপিবির তথ্য বলছে, গত অক্টোবরে তৈরি পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হিমায়িত চিংড়ি, প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি কমেছে। বেড়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, চামড়াবিহীন জুতা ও প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি।

নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা: অর্থনীতি নিয়ে উৎকণ্ঠায় ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা
মরিয়ম সেঁজুতি
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২৫, ১৯: ১০

দেশের ইতিহাসে প্রায় প্রতিটি নির্বাচন ঘিরেই দেখা গেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এতে উৎকণ্ঠায় পড়েছেন ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। এর প্রভাবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা কাটছে না। রপ্তানি বাণিজ্যে ধীরগতি, বিনিয়োগও প্রায় স্থবির। কারখানায় জ্বালানি সমস্যার পাশাপাশি ডলার সংকটও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থায়ন সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি এখন বহুমুখী সংকটে পড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে বৈশ্বিক সংকট ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে। শ্রমিক আন্দোলন, কারখানা বন্ধের মত বড় প্রতিবন্ধকতার মুখে শিল্প খাত। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নির্বাচনকেন্দ্রিক অনিশ্চয়তার দ্রুত সমাধান চান তারা। ব্যবসায়ীদের মতে, সংকট থেকে উত্তরণের জন্য উৎপাদন খরচ কমানো এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। অপরদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রপ্তানি পণ্য বৈচিত্রকরণ ও নতুন বাজার সম্প্রসারণে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটলে অর্থনীতিতেও গতি আসবে বলে মনে করেন তারা। সম্ভাবনাময় অনেক শিল্প-কারখানা যেমন অর্থাভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না, তেমনি বহু প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না। এমন সময় ফের অস্থিরতা বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের ইতিহাসে প্রায় প্রতিটি নির্বাচন ঘিরেই দেখা গেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির ওপর যা সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে এবারেও অস্থির হয়ে উঠেছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। নির্বাচনের আগে কয়েকটি দলের যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সহিংসতার আশঙ্কায় উৎকণ্ঠায় ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। নতুন বিনিয়োগে খরা এবং অর্থনৈতিক সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২৯ শতাংশে নেমেছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তারল্য সংকটে নতুন ঋণপত্র খুলতে সমস্যায় পড়ছেন উদ্যোক্তারা। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত টানা তিন মাস রপ্তানি কমেছে। ঋণের উচ্চ সুদহার বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা। সব মিলিয়ে স্বস্তি মিলছে না অর্থনীতিতে।
এফবিসিসিআই সাবেক পরিচালক খন্দকার রুহুল আমিন বলেন,
এভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে জনগণের ক্রয় ক্ষমতা কমে যাবে। আর ক্রয়ক্ষমতা যদি কমে যায়, তাহলে আমাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হবে নিম্নমুখী। এখানে আমার ধারণা যে, প্রবৃদ্ধি চারের নিচে চলে আসতে পারে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বায়াররাও এ সময়টাতে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করছে। যারা আসতে চাচ্ছিল, তারাও বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে আসতে রাজি হচ্ছে না। কোনো কোনো বায়ার বলছে ঠিক আছে, আপনাদের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসুক, নির্বাচন হোক, এরপর আমরা চিন্তাভাবনা করবো। আবার যারা বিনিয়োগ করবে তারাও অপেক্ষায় আছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোনদিকে যায়, সেটা বোঝার চেষ্টা করছে।
৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বন্ধ হয়েছে রপ্তানিমুখী অনেক কারখানা। বিজিএমইএ-এর হিসাবে গত ১৪ মাসে শুধু পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে ৩৫৩টির মত। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, সরকারের নীতিগত পরিবর্তন, এনবিআরে কর্মবিরতি ও বন্দরের সক্ষমতার অভাবে বেড়েছে কারখানা বন্ধের হার। এছাড়া, রাজনৈতিক অস্থিরতায় রপ্তানি আরও কমার শঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বিকেএমইএ সভাপতি আরও বলেন, বিভিন্ন সময় যে পলিসিগুলো হঠাৎ পাল্টানো হয় এটা অনেক ক্ষেত্রে বায়াররা গ্রহণ করতে পারে না। সম্প্রতি এনবিআরের জটিলতা, কোর্টের ইনিফিশিয়েন্সি, বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন সবমিলিয়ে তারা দ্বিধায় পড়ে যায়। আবার প্রতি নির্বাচনের সময়েই বায়াররা ইচ্ছা করে কিছু অর্ডার কমিয়ে দেয়। তারা কনসার্ন থাকে তাদের পণ্য ঠিকমতো ডেলিভারি হবে কি-না।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এমনিতেই সারাবছর এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে কেটেছে দেশের অর্থনীতি। মোটা দাগে প্রভাব দেখা গেছে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান বা মজুরি স্থবিরতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি দেশ।
তিনি আরও বলেন, বহির্বাণিজ্য লেনদেনে মোটামুটি ভারসাম্য ছিল। তবে এটা সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্ব বহন করে না। তাদের কাছে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহণ করে তা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। যদিও বছরের শুরুতে মূল্যস্ফীতি যা ছিল, বছর শেষে তার চেয়ে কিছুটা কমেছে। তবে বৃদ্ধির হার কমেছে, মূল্য কমেনি। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি যে হারে বাড়ছিল তার চেয়ে ৪ শতাংশ কম হারে বাড়ছে, কিন্তু এখনো ৮ শতাংশের ঘরে অবস্থান করছে। মূল্যস্ফীতির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানেও নিয়ে আসতে পারেনি সরকার। ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি। রপ্তানিও পতনের দিকে আছে।
ড. জাহিদ বলেন, নির্বাচনের যে অনিশ্চয়তা ছিল, তা কিছুটা কাটতে শুরু করেছে। এক্ষেত্রেও যাদি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণ ফিরে না আসে, একটি মশৃণ রাজনৈতিক উত্তোরণ না হয়, সে পর্যন্ত আশাবাদি হতে পারি, তবে পকেটে হাত দিব না। অর্থাৎ বিনিয়োগ করবো না। তিনি আরও বলেন, আমার মনে হয় না ফেব্রুয়ারির আগে নতুন বিনিয়োগ আসবে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, যেকোনো রাজনৈতিক ট্রানজিশনের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হলে দেশের ভেতর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। দেশের মানুষ আসলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনেই দেশ পরিচালনা পছন্দ করেন। যেহেতু একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সেটি দ্রুত শেষ করে যেন নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়, সেটি আসলে এ মুহূর্তে জনগণের প্রত্যাশা।
তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগ ও ব্যবসায় আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে জরুরি। শান্তিপূর্ণ সমাধান ও স্থিতিশীল পরিবেশ না এলে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও শিল্পখাতে ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
টানা ৩ মাস রপ্তানি কমেছে
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই উৎসের একটি রপ্তানি। টানা তিন মাস ধরে দেশের এ খাতের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট মহলে বাড়ছে অস্বস্তি।
চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয় প্রায় ২৫ শতাংশ। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতি মাসে রপ্তানি কমেছে। আগস্টে রপ্তানি হয়েছে ৩৯১ কোটি ৫০ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বরে ৩৬২ কোটি ৭৬ ও অক্টোবরে ৩৮২ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। সে হিসেবে দেখা গেছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আগস্টে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে কমেছে যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬১ ও ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
দেশের রপ্তানি খাতের প্রধান পণ্য তৈরি পোশাক, যা মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাসের পর থেকেই এ খাতে ধারাবাহিক পতন দেখা গেছে। গেলো অক্টোবরে পোশাক খাতে রপ্তানি হয়েছে ৩০২ কোটি ডলার। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে এর পরিমাণ ছিলো যথাক্রমে ৩১৭ ও ২৮৪ কোটি ডলার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ৬০ কোটি ডলার।
ইপিবির তথ্য বলছে, গত অক্টোবরে তৈরি পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হিমায়িত চিংড়ি, প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি কমেছে। বেড়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, চামড়াবিহীন জুতা ও প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি।




