শিরোনাম

১২০ কোটি টাকার বাজার দুই কোম্পানির দখলে

১২০ কোটি টাকার বাজার দুই কোম্পানির দখলে
জলাতঙ্ক টিকার সংকট ও সিন্ডিকেট। গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল

ভোলা শহরের কালিবাড়ি রোডের বাসিন্দা আবদুল আউয়ালের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা মীমকে গত বুধবার বিড়াল আঁচড় দেয়। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে দ্রুত সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ভ্যাকসিন না পেয়ে স্বজনরা শহরের অলি-গলিতে খোঁজ করেন। কিন্তু পাওয়া যায়নি। বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শুরু করে সাগরদিসহ আশপাশে খুঁজেও ভ্যাকসিন মেলেনি। এরপর পরিবারটি ঢাকার মহাখালীতে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আসার সিদ্ধান্ত নেয়।

এবারের দৃশ্যটি দেশের উত্তরাঞ্চলের, ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের। এখানকার জলাতঙ্ক ইউনিটের দরজায় তালা ঝুলছে। সাঁটানো আছে জরুরি বিজ্ঞপ্তি। তাতে লেখা, ‘ইনজেকশন-র‍্যাবিস ভ্যাকসিন’ এবং ‘ইনজেকশন-আরআইজি’র সরকারি সরবরাহ বন্ধ। রোগীদের নিজ দায়িত্বে টিকা সংগ্রহ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ঠাকুরগাঁও শহরের বাসিন্দা বশির উদ্দিন বলেন, সকালে বাজারে যাওয়ার পথে রাস্তায় কুকুর কামড় দিয়েছে। হাসপাতালে এসে দেখি টিকা নেই। বিজ্ঞপ্তি দেখে ভয় লেগে গেলো। এখন কী করবো? জলাতঙ্ক হলে তো মরণ নিশ্চিত!’

রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২২০ জনকে বিনামূল্যে জলাতঙ্ক টিকা দেওয়া হতো। কিন্তু গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে সেখানে ‘র‍্যাবিস ভ্যাকসিন’ সরবরাহ নেই।

এদিকে, সম্প্রতি বরিশালে একটি কুকুর ২৮ জনকে কামড় দিয়েছে বলে জানা যায়। সেখানে দ্রুত ভ্যাকসিন সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে।

শুধু ভোলা, ঠাকুরগাঁও, রাজবাড়ী বা বরিশাল নয়, দেশজুড়ে জলাতঙ্ক টিকার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল বা ফার্মেসিতে এই টিকা সহজে মিলছে না। সুযোগ বুঝে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চড়া দামে টিকা বিক্রি করছেন।

দুই-এক বছর আগেও দেশে জলাতঙ্ক টিকার চাহিদা ছিল বছরে ১২-১৪ লাখ ভায়াল। বর্তমানে তা বেড়ে ২৪-২৫ লাখ হয়েছে। প্রতিটি ৫০০ টাকা হিসাবে ২৪ লাখ টিকার বাজারমূল্য প্রায় ১২০ কোটি টাকা। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, জলাতঙ্ক টিকার বাজার এখন ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস। বাকি ৪০ শতাংশ পপুলার ফার্মার দখলে।

বিক্রেতারা বলছেন, অনেকেই এখন বাড়িতে বিড়াল পোষেন। বিড়ালের আঁচড়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ভ্যাকসিন দেওয়া বাধ্যতামূলক। আঁচড় খেয়ে অনেকেই ভ্যাকসিন খুঁজতে আসেন। এ কারণে চাহিদাও বেড়ে গেছে।

যথাসময়ে চিকিৎসা না হলে জলাতঙ্ক রোগীর মৃত্যু অবধারিত। ফলে কেউ আক্রান্ত হলে দ্রুত টিকা দেওয়া প্রয়োজন। একসময় জলাতঙ্ক রোগের ভ্যাকসিন আমদানি করা হতো। বর্তমানে তা দেশেই তৈরি করছে ইনসেপ্টা ও পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস। এ দুটি কোম্পানি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ছাড়াও ফার্মেসিগুলোর চাহিদা পূরণ করে আসছে। তবে যেসব ফার্মেসিতে রেফ্রিজারেটর রয়েছে শুধু সেগুলোতেই ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই-এক বছর আগেও দেশে জলাতঙ্ক টিকার চাহিদা ছিল বছরে ১২-১৪ লাখ ভায়াল। বর্তমানে তা বেড়ে ২৪-২৫ লাখ হয়েছে। প্রতিটি ৫০০ টাকা হিসাবে ২৪ লাখ টিকার বাজারমূল্য প্রায় ১২০ কোটি টাকা। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, জলাতঙ্ক টিকার বাজার এখন ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস। বাকি ৪০ শতাংশ পপুলার ফার্মার দখলে।

জলাতঙ্ক রোগের টিকা। ছবি: সংগৃহীত
জলাতঙ্ক রোগের টিকা। ছবি: সংগৃহীত

উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, প্রাণীদেহে পরীক্ষা ছাড়া বাজারে ভ্যাকসিন সরবরাহের কোনো সুযোগ নেই। এটি ‘অ্যানিমেল টেস্ট’ হিসেবে পরিচিত। বাজারে ভ্যাকসিনের চাহিদা বাড়ায় পরীক্ষার জন্য প্রাণীর চাহিদাও দ্বিগুণ বেড়েছে। এছাড়া ভ্যাকসিন তৈরির পর এর কিছু নমুনা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে পাঠাতে হয়। সেখানে পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বাজারজাতকরণের অনুমোদন মেলে। ভ্যাকসিন উৎপাদনে সময় লাগে প্রায় দেড় মাস। অনুমোদন পেতে লাগে আরও একমাস। সবমিলিয়ে প্রায় আড়াই মাস সময় চলে যায়।

ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কারখানার সক্ষমতা বাড়াতে গত বছর তিন মাস উৎপাদন বন্ধ ছিল। এ কারণে ভ্যাকসিন সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে সক্ষমতা বাড়ানোর ফলে এখন বাজারে আর সংকট হবে না।

ভ্যাকসিনের পাঁচটি ব্যাচ উৎপাদন সম্পন্ন হয়েছে। এসবের নমুনা আজ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে পাঠানো হবে। অনুমোদন পাওয়ার পর বাজারে সরবরাহ করা হবে।
কাজী নেয়ামত ফারজানাল আলম সহকারী মহাব্যবস্থাপক, পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড

পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক এবং হেড অব রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স কাজী নেয়ামত ফারজানাল আলম রবিবার (১১ জানুয়ারি) সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘ভ্যাকসিনের পাঁচটি ব্যাচ উৎপাদন সম্পন্ন হয়েছে। এসবের নমুনা আজ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে পাঠানো হবে। অনুমোদন পাওয়ার পর বাজারে সরবরাহ করা হবে।’

মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালটিতে প্রতিদিন পাঁচশর বেশি রোগী আসেন যারা কুকুর, বিড়াল, শিয়াল, বানর বা বেজির কামড়ে আক্রান্ত। গত কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে টিকার সংকট তৈরি হওয়ায় এই হাসপাতালের ওপর চাপ বেড়েছে। শনিবার (১০ জানুয়ারি) এক হাজার দুইশর বেশি রোগী টিকা নিয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই বিড়ালের কামড় বা আঁচড় খেয়েছেন।

রাজধানীর পুরান ঢাকার বাবুবাজার এলাকার মেসার্স আলিফ-লাম মিম মডেল ফার্মেসির পলাশ চন্দ্র পাল বলেন, বাজারে জলাতঙ্ক টিকার তীব্র সংকট। প্রতিদিনই রোগীরা টিকা না পেয়ে ফেরত যাচ্ছেন। ৫০০ টাকা দামের এই টিকা কোথাও কোথাও ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানীর মহাখালীতে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর মহাখালীতে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পরিচালক ডা. আরিফুল বাসার সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘হাসপাতালে জলাতঙ্ক রোগীর ভিড় বেড়েছে। টিকার বর্তমান সরবরাহ দিয়ে হয়তো আগামী দুই সপ্তাহ চালানো যাবে। দ্রুত নতুন করে সরবরাহ না হলে এখানেও সংকট তৈরি হবে।’

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই বিড়াল পালনে ট্যাক্স দিতে হয়। বাংলাদেশেও এটি চালু করা দরকার।
ডা. আরিফুল বাসার পরিচালক, জাতীয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল

এই চিকিৎসকের অভিমত, বিড়াল পালনে সরকারের ট্যাক্স ধার্য করা উচিত। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই বিড়াল পালনে ট্যাক্স দিতে হয়। বাংলাদেশেও এটি চালু করা দরকার।’

জানতে চাইলে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মোক্তাদির সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বাজারে হঠাৎ টিকার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। খুব শিগগিরই তা কেটে যাবে।’

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক আক্তার হোসেন বলেন, ‘জলাতঙ্ক টিকার চাহিদা বেড়েছে। আগামী ১৬-১৭ জানুয়ারির মধ্যে তিন-চারটি ব্যাচ বাজারে সরবরাহ করা হবে। আশা করি তখন সংকট কেটে যাবে।’

/এফসি/