শিরোনাম

ইরানে সরকার পতনের লক্ষণ নেই যে কারণে

সিটিজেন-ডেস্ক­
ইরানে সরকার পতনের লক্ষণ নেই যে কারণে
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি হাতে এক সমর্থক। ছবি: সংগৃহীত

ইরানজুড়ে বিক্ষোভ ও বিদেশি চাপ সত্ত্বেও দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে এখনো কোনো চিড় ধরার লক্ষণ দেখা যায়নি। ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে ভাঙন ধরলে দেশটিতে দৃঢ় অবস্থানে থাকা সরকারের পতন ঘটবে বলে মনে করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। গত বছর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার পর থেকে এসব হুমকি চলছে। হোয়াইট হাউস বলেছে, ট্রাম্প পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব ধরনের বিকল্প ব্যবহার করতে পারেন।

ট্রাম্প এরইমধ্যে ইরানের বিক্ষোভকারীদের দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানিয়েছেন। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) তিনি বলেন, ‘সহায়তা আসছে’। একই সঙ্গে তিনি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক বাতিল করার কথাও বলেন। এর আগে তিনি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হলো চীন।

জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের এ দেশটিতে গত ২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠীবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয়। রাজনৈতিকভাবে সহিংস দমন-পীড়নের কারণে পরিস্থিতি আরও সহিংস রূপ ধারণ করে। এক ইরানি কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, বিক্ষোভ চলাকালে ২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তিনি নিহতের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের সন্ত্রাসী বলে অভিহিত করেছেন।

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

ইরানি বংশোদ্ভূত মার্কিন শিক্ষাবিদ ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ ভালি নাসর বলেন, ইরানে স্তরভিত্তিক নিরাপত্তা কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু হলো রেভল্যুশনারি গার্ড ও আধা সামরিক বাহিনী বাসিজ। এই দুই বাহিনীর মোট সদস্যসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। এ কারণে এ দুই বাহিনীর ভেতরে ভাঙন না ধরলে বাইরে থেকে চাপ দিয়ে সরকারকে নড়ানো অত্যন্ত কঠিন।

তার মতে, এ ধরনের তৎপরতাকে সফল করতে হলে দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তায় মানুষের সমাবেশ থাকতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ভেতরে ভাঙন ধরতে হবে। রাষ্ট্রের কিছু অংশকে, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশকে সরে দাঁড়াতে হবে বা বিদ্রোহ করতে হবে।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ পল সালেম বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি পূর্ববর্তী সময়ে হওয়া কয়েকটি বড় বিক্ষোভের ঘটনা ঠেকিয়ে ক্ষমতায় টিকে গেছেন। এখনকার বিক্ষোভটি ২০০৯ সালের পর হওয়া পঞ্চম বড় বিক্ষোভের ঘটনা। এতে বোঝা যায়, অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে থাকলেও ইরানের সরকার দৃঢ় ও একতাবদ্ধ।

তবে বিশ্লেষকেরা বলেন, টিকে থাকা মানেই স্থিতিশীল থাকা নয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখন ১৯৭৯ সালের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটির মুখোমুখি। নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তা কাটিয়ে ওঠার মতো কোনো সুস্পষ্ট পথ খোলা নেই। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত চাপের মুখে রয়েছে ইরান। তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ক্ষুণ্ন হয়েছে। লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় নিজেদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো দুর্বল হয়ে যাওয়ায় দেশটির প্রভাব কমেছে।

ইরানি বংশোদ্ভূত মার্কিন শিক্ষাবিদ ভালি নাসর বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র যে একেবারে পতনের মুহূর্তে পৌঁছে গেছে, তা তিনি মনে করেন না। তবে এটি এখন অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ পল সালেমের মতে, বিক্ষোভের প্রতি ট্রাম্পের এই আগ্রহের জায়গাটি সম্ভবত মতাদর্শিক নয়; বরং কৌশলগত। এর উদ্দেশ্য হতে পারে, রাষ্ট্রকে কিছুটা দুর্বল করে নিজেদের অনুকূলে সুবিধা আদায় করে নেওয়া।

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সতর্ক অবস্থান। ছবি: সংগৃহীত
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সতর্ক অবস্থান। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের মতো ইরানে পদক্ষেপ নেওয়াটা সহজ হবে না। কারণ, ইরানে অভিযান চালাতে গেলে সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত নিরাপত্তা বাহিনী, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে প্রতিবন্ধকতা আসবে। বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ ইরানকে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক রেখায় বিভক্ত করে দিতে পারে।

দ্য ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের চিন্তাবিদ ডেভিড মাকোভস্কি বলেন, ট্রাম্প এমন একটি পদক্ষেপ খুঁজছেন, যা পরিস্থিতিকে বদলে দিতে পারে। সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে– ইরানের তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে সমুদ্রপথে চাপ তৈরি থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট সামরিক বা সাইবার হামলা। এসব পদক্ষেপের সব কটির ক্ষেত্রেই গুরুতর ঝুঁকি আছে।

তবে সব সূত্রই বলেছে, কিছু পদক্ষেপ সরাসরি শক্তি প্রয়োগ ছাড়াও হতে পারে, যেমন বিক্ষোভকারীদের যোগাযোগে সহায়তার জন্য স্টারলিংকের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ।

মাকোভস্কি বলেন, ট্রাম্প কখনো কখনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকে বিলম্বিত করার জন্য হুমকিকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেন। কখনো কখনো হুমকি দিয়ে ট্রাম্প প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে চান, তিনি সত্যিই হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই ক্ষেত্রে কোন কৌশলটি খাটানো হচ্ছে– সেটিই দেখার বিষয়।

/এফসি/