শিরোনাম

ফাঁদে বন্দি বাঘ: সংকটে সুন্দরবন

খুলনা সংবাদদাতা
ফাঁদে বন্দি বাঘ: সংকটে সুন্দরবন
ফাঁদে আটকা পড়া বাঘ। ছবি: সংবাদদাতা

সুন্দরবনে হরিণ শিকারীদের ফাঁদে আটকা পড়ে একটি বাঘ। পাঁচ দিন পর উদ্ধার করে নেওয়া হয় চিকিৎসা কেন্দ্রে। উদ্ধারকরা বাঘটি প্রাণে বেঁচে গেলেও প্রতি বছর গড়ে ৩ থেকে ৫টি বাঘের মৃত্যু হয় ফাঁদে আটকে। এটি সুন্দরবনের বর্তমান সংকটের প্রতীক।

খুলনার বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ সিটিজেন জার্নালকে বলেন, বন উজাড়, শিল্পায়ন, বসতি সম্প্রসারণ, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মিষ্টি পানির সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং চোরাশিকারী–সব মিলিয়ে সুন্দরবনের প্রতিবেশ ব্যবস্থা হুমকির মুখে।

বাঘের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সেন্ট্রাল ভেটেরিনারি হাসপাতালের অতিরিক্ত ভেটেরিনারি অফিসার ডা. নাজমুল হুদা বলেন, ফাঁদে আটকে থাকার কারণে বাঘটির সামনের বাম পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো হাড় ভাঙেনি। আশা করছি, স্বল্প সময়ের মধ্যেই বাঘটি সুস্থ হয়ে বনে ফিরে যেতে পারবে।

বাঘের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মো. গোলাম হায়দার, কেন্দ্রীয় রোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার ড. মো. গোলাম আযম চৌধুরী ও সেন্ট্রাল ভেটেরিনারি হাসপাতালের এডিশনাল ভেটেরিনারি অফিসার ডা. নাজমুল হুদা।

সংবাদ সম্মেলন। ছবি: সংবাদদাতা
সংবাদ সম্মেলন। ছবি: সংবাদদাতা

সুন্দরবন বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সুন্দরবনে হরিণ শিকারীদের ফাঁদে আটকে পড়া উদ্ধারকৃত চিকিৎসাধীন বাঘটির সুস্থ হতে বেশ সময় লাগবে। তবে গত দুইদিন ধরে বাঘটি সামান্য খাবার গ্রহণ করেছে। একটু সুস্থ হওয়ার পর বুধবার সকালে ভয়ংকর চেহারায় গর্জন করেছে। মানুষ দেখলেই বাঘটি অস্বাভাবিক আচরণ করছে। ফাঁদে আটকা পড়া বাঘটির বাম পায়ের শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রক্ত চলাচল বন্ধ ছিল। এছাড়া বাঘটি তার স্বাভাবিক শক্তি হারিয়েছে। সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে।

করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আজাদ কবির জানান, প্রায় চার থেকে পাঁচ দিন বাঘটি ফাঁদে আটকে ছিল। উদ্ধার বাঘটি শারীরিকভাবে দুর্বল। তার চিকিৎসা চলছে।

বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দশকে সুন্দরবনে নানা কারণে অন্তত ১২০টি বাঘ মারা গেছে। শুধু চোরাশিকারিদের হাতে প্রতি বছর গড়ে ৩ থেকে ৫টি বাঘের মৃত্যু হয়। বাঘের চামড়া ও হাড় আন্তর্জাতিক কালোবাজারে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। যদিও ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘ বাঘ ও এর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাণিজ্য নিষিদ্ধ করেছে, তবুও পাচার থেমে নেই।

সুন্দরবন। ছবি: সংবাদদাতা
সুন্দরবন। ছবি: সংবাদদাতা

২০২৩–২০২৪ সালের জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি, যা আগের তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও গ্লোবাল টাইগার ফোরামের ২০২৫ সালের তথ্যে বাংলাদেশে মোট বাঘের সংখ্যা ১৪৬টি বলা হয়েছে।

সুন্দরবন একাডেমীর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, বাঘ শুধু একটি প্রাণী নয়। এটি সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থার মূল নিয়ন্ত্রক। খাদ্যশৃঙ্খল ঠিক রাখা থেকে শুরু করে বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বাঘের ভূমিকা অপরিসীম। যে বনে বাঘ আছে, সেই বন সুস্থ। বাঘ কমে যাওয়া মানে পুরো বন ব্যবস্থার দুর্বল হয়ে পড়া। এই কারণেই ২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর ২৯ জুলাই পালিত হচ্ছে– বিশ্ব বাঘ দিবস।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বেলা খুলনার সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, বাঘ আমাদের গৌরবের প্রতীক। যা আজ আমরা ঠেলে দিচ্ছি বিলুপ্তির পথে। প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ, চোরাশিকার দমন, বনাঞ্চলে শিল্পায়ন বন্ধ, স্থানীয় মানুষের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি গণসচেতনতা।

/এসআর/