হোটেল ‘হলিডে ইন’-এ আটকে গেল ১৩৩৯ কোটি টাকা
গুরুত্বপূর্ণ নথি উধাও, দুশ্চিন্তায় ব্যাংক

গুরুত্বপূর্ণ নথি উধাও, দুশ্চিন্তায় ব্যাংক
মরিয়ম সেঁজুতি

ঋণ পুনঃতফসিল, অবলোপন ও এককালীন পরিশোধে নানা সুবিধা দিয়েও খেলাপি কমাতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। তাই এবার গভর্নর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের নির্দেশ দিয়েছেন– চলতি মাসের মধ্যে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। সুযোগগুলো কাজে লাগাতে চেষ্টা করছেন অনেক ঋণখেলাপি। তাদের অন্যতম আলোচিত ব্যবসায়ী সালমান ফজলুর রহমানের (সালমান এফ রহমান) ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা আলম আহমেদ।
তথ্য অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি একাধিক ব্যাংক থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন আলম আহমেদ। ঋণের বড় একটি অংশ দিয়ে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে গড়ে তুলেছেন পাঁচ তারকা হোটেল ‘হলিডে ইন’। যার মূল প্রতিষ্ঠান হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। এ হোটেলের নামেই ব্যাংকের ঋণ রয়েছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক তদন্তে বলা হয়েছে, হাবিব হোটেলের নামে ঋণ নেওয়া হলেও টাকা বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হয়েছে। আলম আহমেদের মালিকানাধীন মরিয়ম কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের নামেও ৪৭৯ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। এছাড়া তার ব্যক্তিগত ঋণ ১৬০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে তিনি প্রায় ১ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকার ঋণখেলাপি। তবে ব্যাংকগুলোর হিসেবে সুদে-আসলে এই টাকার পরিমাণ আরও বেশি।
হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনালের (হলিডে ইন) অবস্থান রাজধানীর তেজগাঁওয়ে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণিতে হাতিরঝিলের পশ্চিম প্রান্তে। বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, হোটেলটি নির্মাণের সময় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর ৩/১২ ধারা ভঙ্গ করা হয়েছে। ২০১১ সালে হাবিব হোটেলের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ১৭ তলার হোটেলটি নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। হোটেলটির সামনে-পেছনে ও ডানে-বাঁয়ে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত স্থানজুড়ে নির্মাণকাজ করা হয়েছে। মামলার শুনানি শেষে আদালত ১ কোটি টাকা জরিমানা করেন।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ অধিগ্রহণের সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মামলা ও জরিমানা আদায়ের বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি। কৃষক লীগ নেতার মালিকানায় থাকা হাবিব হোটেলের কাছ থেকে ঋণ আদায়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্য বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ও বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন আলম আহমেদ। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ৩৩ কাঠা (৩৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ) জমির ওপর নির্মিত ‘হলিডে ইন’ হোটেল ও জমি দেখিয়ে হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনালের নামে ওই ঋণ নেন তিনি। এছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের গুলশান শাখা থেকে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ১ হাজার ৯৫০ কাঠা জমি বন্ধক দেখিয়ে ২০১৮ সালের ১৯ মার্চ ২৬২ কোটি টাকা ঋণ নেন। বন্ধকি জমির মূল্য দেখানো হয় ২১৮ কোটি টাকা। এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ ৮৪ কোটি টাকা ঋণ নেন আলম আহমেদ। সুদসহ এ ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৬০ কোটি টাকায়।
ঋণের একটি টাকাও পরিশোধ করেননি আলম আহমেদ। বরং বছরের পর বছর ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আলম আহমেদ বিদেশে পাড়ি জমান। ফলে ব্যাংক ঋণ আদায়ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
‘হলিডে ইন’ বর্তমানে পরিচালনা করছেন আলম আহমেদের ভাই ইকবাল আহমেদ। হোটেলটির কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভালোই চলছে এ হোটেল। একাধিক কর্মকর্তা বলেন, হোটেলের প্রায় ৬০ শতাংশ রুম বুকিং থাকে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা সিটিজেন জার্নালকে বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আলম আহমেদ ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যোগসাজশও ছিল। জনতা ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন।
জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখার একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ অধিগ্রহণের পর জনতা ব্যাংক ওই গ্রাহককে নতুন করে ঋণ দিয়েছে। জনতা ভবন করপোরেট শাখার মাধ্যমে এ ঋণ অধিগ্রহণ করা হয়। হাবিব হোটেল অর্থাৎ আলম আহমেদসহ অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে যাদের ঋণ দেওয়া হয়েছে তাদের কাছ থেকে কোনো অর্থই এখন আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, আমরা হোটেলটির প্রবেশপথে নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছি। মামলা চলছে। এর মধ্যে গ্রাহক এগিয়ে এলে বিবেচনা করবো।
ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়ে তিনি বলেন, পুনঃতফসিলের বেশ কিছু শর্ত রয়েছে, নিয়ম-কানুন রয়েছে। সেগুলো তারা পরিপূর্ণ করছেন না। সেগুলো পূরণ করলে এ বিষয়ে চিন্তা করা যেতো।

তিনি বলেন, হাবিব হোটেলের নামে জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল। এখন ‘চেইন’ হোটেল হিসেবে ‘হলিডে ইন’কে লিজ বা ভাড়ায় হস্তান্তর করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ রয়েছে। আইনগতভাবে এসব বিবেচনায় নিয়েই আমরা এগোচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, একটা বিষয় হতে পারে– ওই হোটেলের ভাড়া থেকে প্রাপ্ত আয় রিসিভারের মাধ্যমে নিয়ে আসা যায়। সেই দিকগুলোও আমরা খতিয়ে দেখছি। তবে একান্তই ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে হোটেলটি নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
সূত্র জানায়, হাবিব হোটেলকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে জনতা ব্যাংক নিজেদের নীতিমালার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাও লঙ্ঘন করেছে। বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, শাখার সুপারিশ ছাড়াই ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান শাখার ঋণটি জনতা ব্যাংক অধিগ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে জনতা ব্যাংকের ক্রেডিট কমিটিও নেতিবাচক মন্তব্য দিয়েছিল। কিন্তু অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত সব নীতিমালা লঙ্ঘন করে ২০১৭ সালে ঋণটি অধিগ্রহণ করা হয়। ২০২০ সালেই হাবিব হোটেলের অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০৬ কোটি টাকা।
যেকোনো ঋণ বিতরণ বা অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রকল্পের ফিজিবিলিটি রিপোর্ট (সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন) পর্যালোচনা করা হয়। হাবিব হোটেলের ঋণ অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের এ নীতিও লঙ্ঘন করেছে জনতা ব্যাংক। বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, হাবিব হোটেলের ফিজিবিলিটি রিপোর্টটি ২০০৮ সালের। আর জনতা ব্যাংক ঋণ অধিগ্রহণ করেছে ২০১৭ সালে। ১০ বছর আগের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ঋণ অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এ ধরনের ঋণ অধিগ্রহণকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছে নিরীক্ষক দল।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, জনতা ব্যাংকের ঋণ নীতিমালার ৪(৩) বিধির নির্দেশনা অনুযায়ী হাবিব হোটেলের ঋণ প্রস্তাবটি রিলেশনশিপ ম্যানেজারের সুপারিশ ও মূল্যায়ন করে শিল্পঋণ বিভাগে পাঠানোর কথা। কিন্তু রিলেশনশিপ ম্যানেজার সুপারিশ ও মূল্যায়ন না করেই পাঠিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংকিং নিয়মবহির্ভূতভাবে ঋণ অনুমোদন দেয়।
তথ্য অনুযায়ী, মরিয়ম কনস্ট্রাকশনের নামে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ স্থিতি এখন ৪৭৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ঋণের পুরো অর্থই ২০২৩ সাল থেকে খেলাপি। ন্যাশনাল ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে জামানত থাকা সম্পদের মূল্যমান ২২০ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান শাখার ম্যানেজার আতিকুল ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, আলম আহমেদের সঙ্গে ব্যাংকের কোনো যোগাযোগ নেই। তবে তাদের পক্ষ থেকে একাধিকবার ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করলেও কোনো ডাউন পেমেন্ট জমা দেয়নি। ফলে ঋণ পুনঃতফসিল করা সম্ভব হয়নি। তারা যদি পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে আসে তবে আমরা অবশ্যই ঋণ পুনঃতফসিল করে দেবো।
আলম আহমেদের সঙ্গে ব্যাংকের কোনো যোগাযোগ নেই। তবে তাদের পক্ষ থেকে একাধিকবার ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করলেও কোনো ডাউন পেমেন্ট জমা দেয়নি। ফলে ঋণ পুনঃতফসিল করা সম্ভব হয়নি। তারা যদি পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে আসে তবে আমরা অবশ্যই ঋণ পুনঃতফসিল করে দেবো।
আতিকুল ইসলাম ম্যানেজার, ন্যাশনাল ব্যাংক (গুলশান শাখা)
তিনি আরও বলেন, তাদের সঙ্গে আগে বসা দরকার। তারা যদি ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করতে চায় তাহলে তাদের প্রজেক্টের ব্যবসা কী আছে, ক্যাশ কী পরিমাণ আছে– এসব দেখতে হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে– এক্সিট পলিসি। এক বছর করে মোট তিন বছর সময় পাবে। সেক্ষেত্রে ৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিতে হবে, প্রতি বছর ২০ শতাংশ টাকা পরিশোধ করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে হাবিব হোটেলের (হলিডে ইন) মালিক আলম আহমেদের মোবাইল ফোনে কল করা হলেও সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়। পরে হোটেলটির পরিচালক হরিদাস বর্মনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, আলম আহমেদ দেশের বাইরে আছেন। এখন দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়। এছাড়া ব্যাংক ঋণের সুদহার অনেক বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সার্কুলার অনুযায়ী ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করেছি।
জনতা ব্যাংকের ঋণের বিষয়ে হরিদাস বর্মন বলেন, জনতা ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েও কথা রাখছে না। এছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকে ২৬১ কোটি টাকা ঋণ আছে। তারা দুইবার ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য টাকা নিয়েছে, কিন্তু কাজ করেনি।
তদন্ত করছে দুদক
অনিয়মের অভিযোগে এই ঋণ নিয়ে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন সংস্থাটির মানি লন্ডারিং শাখার পরিচালত (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, হাবিব হোটেলের নামে দেওয়া অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে।
জানা গেছে, দুদক ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে একটি চিঠি দেয়। চিঠিতে বলা হয়, মরিয়ম কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ও হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনালের নামে ঋণ মঞ্জুরির মাধ্যমে ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে নগদ উত্তোলন ও বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাবে স্থানান্তর করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য ন্যাশনাল ব্যাংক কর্তৃপক্ষসহ মোট ২০ জনকে দুদকে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ তালিকায় ব্যাংকটির সাবেক এমডি চৌধুরী মোশতাক আহমেদ, সাবেক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এসএসএম বুলবুল, আব্দুস সোবহান খান, শাহ সৈয়দ আব্দুল বারী ও ওয়াসিফ আলী খানের নাম রয়েছে। আরও রয়েছেন– মরিয়ম কনস্ট্রাকশনের এমডি আলম আহমেদ ও পরিচালক বাবু হরিদাস বর্মন।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ব্যাংকার ও দালালদের সহযোগিতায় বিগত সময়ে ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের লুটপাট হয়েছে। তারই প্রমাণ হাবিব হোটেলের এসব ঋণ। যে ব্যাংক থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে, সে ব্যাংককেই এখন অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হবে।
ব্যাংকার ও দালালদের সহযোগিতায় বিগত সময়ে ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের লুটপাট হয়েছে। তারই প্রমাণ হাবিব হোটেলের এসব ঋণ। যে ব্যাংক থেকে অর্থ নেয়া হয়েছে, সে ব্যাংককেই এখন অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হবে।
ড. মুস্তফা কে মুজেরী অর্থনীতিবিদ
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে কিছু সুবিধা দিয়েছে, সেই আলোকে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে অনৈতিক রীতি এখনো চলমান রয়েছে, তা বন্ধ করতে হবে।

ঋণ পুনঃতফসিল, অবলোপন ও এককালীন পরিশোধে নানা সুবিধা দিয়েও খেলাপি কমাতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। তাই এবার গভর্নর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের নির্দেশ দিয়েছেন– চলতি মাসের মধ্যে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। সুযোগগুলো কাজে লাগাতে চেষ্টা করছেন অনেক ঋণখেলাপি। তাদের অন্যতম আলোচিত ব্যবসায়ী সালমান ফজলুর রহমানের (সালমান এফ রহমান) ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা আলম আহমেদ।
তথ্য অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি একাধিক ব্যাংক থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন আলম আহমেদ। ঋণের বড় একটি অংশ দিয়ে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে গড়ে তুলেছেন পাঁচ তারকা হোটেল ‘হলিডে ইন’। যার মূল প্রতিষ্ঠান হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। এ হোটেলের নামেই ব্যাংকের ঋণ রয়েছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক তদন্তে বলা হয়েছে, হাবিব হোটেলের নামে ঋণ নেওয়া হলেও টাকা বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হয়েছে। আলম আহমেদের মালিকানাধীন মরিয়ম কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের নামেও ৪৭৯ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। এছাড়া তার ব্যক্তিগত ঋণ ১৬০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে তিনি প্রায় ১ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকার ঋণখেলাপি। তবে ব্যাংকগুলোর হিসেবে সুদে-আসলে এই টাকার পরিমাণ আরও বেশি।
হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনালের (হলিডে ইন) অবস্থান রাজধানীর তেজগাঁওয়ে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণিতে হাতিরঝিলের পশ্চিম প্রান্তে। বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, হোটেলটি নির্মাণের সময় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর ৩/১২ ধারা ভঙ্গ করা হয়েছে। ২০১১ সালে হাবিব হোটেলের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ১৭ তলার হোটেলটি নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। হোটেলটির সামনে-পেছনে ও ডানে-বাঁয়ে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত স্থানজুড়ে নির্মাণকাজ করা হয়েছে। মামলার শুনানি শেষে আদালত ১ কোটি টাকা জরিমানা করেন।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ অধিগ্রহণের সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মামলা ও জরিমানা আদায়ের বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি। কৃষক লীগ নেতার মালিকানায় থাকা হাবিব হোটেলের কাছ থেকে ঋণ আদায়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্য বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ও বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন আলম আহমেদ। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ৩৩ কাঠা (৩৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ) জমির ওপর নির্মিত ‘হলিডে ইন’ হোটেল ও জমি দেখিয়ে হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনালের নামে ওই ঋণ নেন তিনি। এছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের গুলশান শাখা থেকে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ১ হাজার ৯৫০ কাঠা জমি বন্ধক দেখিয়ে ২০১৮ সালের ১৯ মার্চ ২৬২ কোটি টাকা ঋণ নেন। বন্ধকি জমির মূল্য দেখানো হয় ২১৮ কোটি টাকা। এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ ৮৪ কোটি টাকা ঋণ নেন আলম আহমেদ। সুদসহ এ ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৬০ কোটি টাকায়।
ঋণের একটি টাকাও পরিশোধ করেননি আলম আহমেদ। বরং বছরের পর বছর ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আলম আহমেদ বিদেশে পাড়ি জমান। ফলে ব্যাংক ঋণ আদায়ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
‘হলিডে ইন’ বর্তমানে পরিচালনা করছেন আলম আহমেদের ভাই ইকবাল আহমেদ। হোটেলটির কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভালোই চলছে এ হোটেল। একাধিক কর্মকর্তা বলেন, হোটেলের প্রায় ৬০ শতাংশ রুম বুকিং থাকে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা সিটিজেন জার্নালকে বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আলম আহমেদ ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যোগসাজশও ছিল। জনতা ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন।
জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখার একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ অধিগ্রহণের পর জনতা ব্যাংক ওই গ্রাহককে নতুন করে ঋণ দিয়েছে। জনতা ভবন করপোরেট শাখার মাধ্যমে এ ঋণ অধিগ্রহণ করা হয়। হাবিব হোটেল অর্থাৎ আলম আহমেদসহ অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে যাদের ঋণ দেওয়া হয়েছে তাদের কাছ থেকে কোনো অর্থই এখন আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, আমরা হোটেলটির প্রবেশপথে নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছি। মামলা চলছে। এর মধ্যে গ্রাহক এগিয়ে এলে বিবেচনা করবো।
ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়ে তিনি বলেন, পুনঃতফসিলের বেশ কিছু শর্ত রয়েছে, নিয়ম-কানুন রয়েছে। সেগুলো তারা পরিপূর্ণ করছেন না। সেগুলো পূরণ করলে এ বিষয়ে চিন্তা করা যেতো।

তিনি বলেন, হাবিব হোটেলের নামে জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল। এখন ‘চেইন’ হোটেল হিসেবে ‘হলিডে ইন’কে লিজ বা ভাড়ায় হস্তান্তর করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ রয়েছে। আইনগতভাবে এসব বিবেচনায় নিয়েই আমরা এগোচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, একটা বিষয় হতে পারে– ওই হোটেলের ভাড়া থেকে প্রাপ্ত আয় রিসিভারের মাধ্যমে নিয়ে আসা যায়। সেই দিকগুলোও আমরা খতিয়ে দেখছি। তবে একান্তই ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে হোটেলটি নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
সূত্র জানায়, হাবিব হোটেলকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে জনতা ব্যাংক নিজেদের নীতিমালার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাও লঙ্ঘন করেছে। বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, শাখার সুপারিশ ছাড়াই ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান শাখার ঋণটি জনতা ব্যাংক অধিগ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে জনতা ব্যাংকের ক্রেডিট কমিটিও নেতিবাচক মন্তব্য দিয়েছিল। কিন্তু অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত সব নীতিমালা লঙ্ঘন করে ২০১৭ সালে ঋণটি অধিগ্রহণ করা হয়। ২০২০ সালেই হাবিব হোটেলের অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০৬ কোটি টাকা।
যেকোনো ঋণ বিতরণ বা অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রকল্পের ফিজিবিলিটি রিপোর্ট (সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন) পর্যালোচনা করা হয়। হাবিব হোটেলের ঋণ অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের এ নীতিও লঙ্ঘন করেছে জনতা ব্যাংক। বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, হাবিব হোটেলের ফিজিবিলিটি রিপোর্টটি ২০০৮ সালের। আর জনতা ব্যাংক ঋণ অধিগ্রহণ করেছে ২০১৭ সালে। ১০ বছর আগের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ঋণ অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এ ধরনের ঋণ অধিগ্রহণকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছে নিরীক্ষক দল।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, জনতা ব্যাংকের ঋণ নীতিমালার ৪(৩) বিধির নির্দেশনা অনুযায়ী হাবিব হোটেলের ঋণ প্রস্তাবটি রিলেশনশিপ ম্যানেজারের সুপারিশ ও মূল্যায়ন করে শিল্পঋণ বিভাগে পাঠানোর কথা। কিন্তু রিলেশনশিপ ম্যানেজার সুপারিশ ও মূল্যায়ন না করেই পাঠিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংকিং নিয়মবহির্ভূতভাবে ঋণ অনুমোদন দেয়।
তথ্য অনুযায়ী, মরিয়ম কনস্ট্রাকশনের নামে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ স্থিতি এখন ৪৭৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ঋণের পুরো অর্থই ২০২৩ সাল থেকে খেলাপি। ন্যাশনাল ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে জামানত থাকা সম্পদের মূল্যমান ২২০ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান শাখার ম্যানেজার আতিকুল ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, আলম আহমেদের সঙ্গে ব্যাংকের কোনো যোগাযোগ নেই। তবে তাদের পক্ষ থেকে একাধিকবার ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করলেও কোনো ডাউন পেমেন্ট জমা দেয়নি। ফলে ঋণ পুনঃতফসিল করা সম্ভব হয়নি। তারা যদি পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে আসে তবে আমরা অবশ্যই ঋণ পুনঃতফসিল করে দেবো।
আলম আহমেদের সঙ্গে ব্যাংকের কোনো যোগাযোগ নেই। তবে তাদের পক্ষ থেকে একাধিকবার ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করলেও কোনো ডাউন পেমেন্ট জমা দেয়নি। ফলে ঋণ পুনঃতফসিল করা সম্ভব হয়নি। তারা যদি পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে আসে তবে আমরা অবশ্যই ঋণ পুনঃতফসিল করে দেবো।
আতিকুল ইসলাম ম্যানেজার, ন্যাশনাল ব্যাংক (গুলশান শাখা)
তিনি আরও বলেন, তাদের সঙ্গে আগে বসা দরকার। তারা যদি ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করতে চায় তাহলে তাদের প্রজেক্টের ব্যবসা কী আছে, ক্যাশ কী পরিমাণ আছে– এসব দেখতে হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে– এক্সিট পলিসি। এক বছর করে মোট তিন বছর সময় পাবে। সেক্ষেত্রে ৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিতে হবে, প্রতি বছর ২০ শতাংশ টাকা পরিশোধ করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে হাবিব হোটেলের (হলিডে ইন) মালিক আলম আহমেদের মোবাইল ফোনে কল করা হলেও সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়। পরে হোটেলটির পরিচালক হরিদাস বর্মনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, আলম আহমেদ দেশের বাইরে আছেন। এখন দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়। এছাড়া ব্যাংক ঋণের সুদহার অনেক বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সার্কুলার অনুযায়ী ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করেছি।
জনতা ব্যাংকের ঋণের বিষয়ে হরিদাস বর্মন বলেন, জনতা ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েও কথা রাখছে না। এছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকে ২৬১ কোটি টাকা ঋণ আছে। তারা দুইবার ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য টাকা নিয়েছে, কিন্তু কাজ করেনি।
তদন্ত করছে দুদক
অনিয়মের অভিযোগে এই ঋণ নিয়ে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন সংস্থাটির মানি লন্ডারিং শাখার পরিচালত (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, হাবিব হোটেলের নামে দেওয়া অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে।
জানা গেছে, দুদক ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে একটি চিঠি দেয়। চিঠিতে বলা হয়, মরিয়ম কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ও হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনালের নামে ঋণ মঞ্জুরির মাধ্যমে ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে নগদ উত্তোলন ও বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাবে স্থানান্তর করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য ন্যাশনাল ব্যাংক কর্তৃপক্ষসহ মোট ২০ জনকে দুদকে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ তালিকায় ব্যাংকটির সাবেক এমডি চৌধুরী মোশতাক আহমেদ, সাবেক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এসএসএম বুলবুল, আব্দুস সোবহান খান, শাহ সৈয়দ আব্দুল বারী ও ওয়াসিফ আলী খানের নাম রয়েছে। আরও রয়েছেন– মরিয়ম কনস্ট্রাকশনের এমডি আলম আহমেদ ও পরিচালক বাবু হরিদাস বর্মন।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ব্যাংকার ও দালালদের সহযোগিতায় বিগত সময়ে ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের লুটপাট হয়েছে। তারই প্রমাণ হাবিব হোটেলের এসব ঋণ। যে ব্যাংক থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে, সে ব্যাংককেই এখন অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হবে।
ব্যাংকার ও দালালদের সহযোগিতায় বিগত সময়ে ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের লুটপাট হয়েছে। তারই প্রমাণ হাবিব হোটেলের এসব ঋণ। যে ব্যাংক থেকে অর্থ নেয়া হয়েছে, সে ব্যাংককেই এখন অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হবে।
ড. মুস্তফা কে মুজেরী অর্থনীতিবিদ
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে কিছু সুবিধা দিয়েছে, সেই আলোকে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে অনৈতিক রীতি এখনো চলমান রয়েছে, তা বন্ধ করতে হবে।

গুরুত্বপূর্ণ নথি উধাও, দুশ্চিন্তায় ব্যাংক
মরিয়ম সেঁজুতি

ঋণ পুনঃতফসিল, অবলোপন ও এককালীন পরিশোধে নানা সুবিধা দিয়েও খেলাপি কমাতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। তাই এবার গভর্নর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের নির্দেশ দিয়েছেন– চলতি মাসের মধ্যে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। সুযোগগুলো কাজে লাগাতে চেষ্টা করছেন অনেক ঋণখেলাপি। তাদের অন্যতম আলোচিত ব্যবসায়ী সালমান ফজলুর রহমানের (সালমান এফ রহমান) ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা আলম আহমেদ।
তথ্য অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি একাধিক ব্যাংক থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন আলম আহমেদ। ঋণের বড় একটি অংশ দিয়ে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে গড়ে তুলেছেন পাঁচ তারকা হোটেল ‘হলিডে ইন’। যার মূল প্রতিষ্ঠান হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। এ হোটেলের নামেই ব্যাংকের ঋণ রয়েছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক তদন্তে বলা হয়েছে, হাবিব হোটেলের নামে ঋণ নেওয়া হলেও টাকা বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হয়েছে। আলম আহমেদের মালিকানাধীন মরিয়ম কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের নামেও ৪৭৯ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। এছাড়া তার ব্যক্তিগত ঋণ ১৬০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে তিনি প্রায় ১ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকার ঋণখেলাপি। তবে ব্যাংকগুলোর হিসেবে সুদে-আসলে এই টাকার পরিমাণ আরও বেশি।
হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনালের (হলিডে ইন) অবস্থান রাজধানীর তেজগাঁওয়ে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণিতে হাতিরঝিলের পশ্চিম প্রান্তে। বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, হোটেলটি নির্মাণের সময় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর ৩/১২ ধারা ভঙ্গ করা হয়েছে। ২০১১ সালে হাবিব হোটেলের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ১৭ তলার হোটেলটি নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। হোটেলটির সামনে-পেছনে ও ডানে-বাঁয়ে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত স্থানজুড়ে নির্মাণকাজ করা হয়েছে। মামলার শুনানি শেষে আদালত ১ কোটি টাকা জরিমানা করেন।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ অধিগ্রহণের সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মামলা ও জরিমানা আদায়ের বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি। কৃষক লীগ নেতার মালিকানায় থাকা হাবিব হোটেলের কাছ থেকে ঋণ আদায়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্য বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ও বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন আলম আহমেদ। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ৩৩ কাঠা (৩৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ) জমির ওপর নির্মিত ‘হলিডে ইন’ হোটেল ও জমি দেখিয়ে হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনালের নামে ওই ঋণ নেন তিনি। এছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের গুলশান শাখা থেকে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ১ হাজার ৯৫০ কাঠা জমি বন্ধক দেখিয়ে ২০১৮ সালের ১৯ মার্চ ২৬২ কোটি টাকা ঋণ নেন। বন্ধকি জমির মূল্য দেখানো হয় ২১৮ কোটি টাকা। এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ ৮৪ কোটি টাকা ঋণ নেন আলম আহমেদ। সুদসহ এ ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৬০ কোটি টাকায়।
ঋণের একটি টাকাও পরিশোধ করেননি আলম আহমেদ। বরং বছরের পর বছর ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আলম আহমেদ বিদেশে পাড়ি জমান। ফলে ব্যাংক ঋণ আদায়ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
‘হলিডে ইন’ বর্তমানে পরিচালনা করছেন আলম আহমেদের ভাই ইকবাল আহমেদ। হোটেলটির কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভালোই চলছে এ হোটেল। একাধিক কর্মকর্তা বলেন, হোটেলের প্রায় ৬০ শতাংশ রুম বুকিং থাকে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা সিটিজেন জার্নালকে বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আলম আহমেদ ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যোগসাজশও ছিল। জনতা ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন।
জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখার একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ অধিগ্রহণের পর জনতা ব্যাংক ওই গ্রাহককে নতুন করে ঋণ দিয়েছে। জনতা ভবন করপোরেট শাখার মাধ্যমে এ ঋণ অধিগ্রহণ করা হয়। হাবিব হোটেল অর্থাৎ আলম আহমেদসহ অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে যাদের ঋণ দেওয়া হয়েছে তাদের কাছ থেকে কোনো অর্থই এখন আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, আমরা হোটেলটির প্রবেশপথে নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছি। মামলা চলছে। এর মধ্যে গ্রাহক এগিয়ে এলে বিবেচনা করবো।
ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়ে তিনি বলেন, পুনঃতফসিলের বেশ কিছু শর্ত রয়েছে, নিয়ম-কানুন রয়েছে। সেগুলো তারা পরিপূর্ণ করছেন না। সেগুলো পূরণ করলে এ বিষয়ে চিন্তা করা যেতো।

তিনি বলেন, হাবিব হোটেলের নামে জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল। এখন ‘চেইন’ হোটেল হিসেবে ‘হলিডে ইন’কে লিজ বা ভাড়ায় হস্তান্তর করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ রয়েছে। আইনগতভাবে এসব বিবেচনায় নিয়েই আমরা এগোচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, একটা বিষয় হতে পারে– ওই হোটেলের ভাড়া থেকে প্রাপ্ত আয় রিসিভারের মাধ্যমে নিয়ে আসা যায়। সেই দিকগুলোও আমরা খতিয়ে দেখছি। তবে একান্তই ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে হোটেলটি নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
সূত্র জানায়, হাবিব হোটেলকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে জনতা ব্যাংক নিজেদের নীতিমালার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাও লঙ্ঘন করেছে। বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, শাখার সুপারিশ ছাড়াই ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান শাখার ঋণটি জনতা ব্যাংক অধিগ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে জনতা ব্যাংকের ক্রেডিট কমিটিও নেতিবাচক মন্তব্য দিয়েছিল। কিন্তু অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত সব নীতিমালা লঙ্ঘন করে ২০১৭ সালে ঋণটি অধিগ্রহণ করা হয়। ২০২০ সালেই হাবিব হোটেলের অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০৬ কোটি টাকা।
যেকোনো ঋণ বিতরণ বা অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রকল্পের ফিজিবিলিটি রিপোর্ট (সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন) পর্যালোচনা করা হয়। হাবিব হোটেলের ঋণ অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের এ নীতিও লঙ্ঘন করেছে জনতা ব্যাংক। বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, হাবিব হোটেলের ফিজিবিলিটি রিপোর্টটি ২০০৮ সালের। আর জনতা ব্যাংক ঋণ অধিগ্রহণ করেছে ২০১৭ সালে। ১০ বছর আগের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ঋণ অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এ ধরনের ঋণ অধিগ্রহণকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছে নিরীক্ষক দল।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, জনতা ব্যাংকের ঋণ নীতিমালার ৪(৩) বিধির নির্দেশনা অনুযায়ী হাবিব হোটেলের ঋণ প্রস্তাবটি রিলেশনশিপ ম্যানেজারের সুপারিশ ও মূল্যায়ন করে শিল্পঋণ বিভাগে পাঠানোর কথা। কিন্তু রিলেশনশিপ ম্যানেজার সুপারিশ ও মূল্যায়ন না করেই পাঠিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংকিং নিয়মবহির্ভূতভাবে ঋণ অনুমোদন দেয়।
তথ্য অনুযায়ী, মরিয়ম কনস্ট্রাকশনের নামে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ স্থিতি এখন ৪৭৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ঋণের পুরো অর্থই ২০২৩ সাল থেকে খেলাপি। ন্যাশনাল ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে জামানত থাকা সম্পদের মূল্যমান ২২০ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান শাখার ম্যানেজার আতিকুল ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, আলম আহমেদের সঙ্গে ব্যাংকের কোনো যোগাযোগ নেই। তবে তাদের পক্ষ থেকে একাধিকবার ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করলেও কোনো ডাউন পেমেন্ট জমা দেয়নি। ফলে ঋণ পুনঃতফসিল করা সম্ভব হয়নি। তারা যদি পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে আসে তবে আমরা অবশ্যই ঋণ পুনঃতফসিল করে দেবো।
আলম আহমেদের সঙ্গে ব্যাংকের কোনো যোগাযোগ নেই। তবে তাদের পক্ষ থেকে একাধিকবার ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করলেও কোনো ডাউন পেমেন্ট জমা দেয়নি। ফলে ঋণ পুনঃতফসিল করা সম্ভব হয়নি। তারা যদি পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে আসে তবে আমরা অবশ্যই ঋণ পুনঃতফসিল করে দেবো।
আতিকুল ইসলাম ম্যানেজার, ন্যাশনাল ব্যাংক (গুলশান শাখা)
তিনি আরও বলেন, তাদের সঙ্গে আগে বসা দরকার। তারা যদি ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করতে চায় তাহলে তাদের প্রজেক্টের ব্যবসা কী আছে, ক্যাশ কী পরিমাণ আছে– এসব দেখতে হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে– এক্সিট পলিসি। এক বছর করে মোট তিন বছর সময় পাবে। সেক্ষেত্রে ৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিতে হবে, প্রতি বছর ২০ শতাংশ টাকা পরিশোধ করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে হাবিব হোটেলের (হলিডে ইন) মালিক আলম আহমেদের মোবাইল ফোনে কল করা হলেও সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়। পরে হোটেলটির পরিচালক হরিদাস বর্মনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, আলম আহমেদ দেশের বাইরে আছেন। এখন দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়। এছাড়া ব্যাংক ঋণের সুদহার অনেক বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সার্কুলার অনুযায়ী ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করেছি।
জনতা ব্যাংকের ঋণের বিষয়ে হরিদাস বর্মন বলেন, জনতা ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েও কথা রাখছে না। এছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকে ২৬১ কোটি টাকা ঋণ আছে। তারা দুইবার ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য টাকা নিয়েছে, কিন্তু কাজ করেনি।
তদন্ত করছে দুদক
অনিয়মের অভিযোগে এই ঋণ নিয়ে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন সংস্থাটির মানি লন্ডারিং শাখার পরিচালত (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, হাবিব হোটেলের নামে দেওয়া অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে।
জানা গেছে, দুদক ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে একটি চিঠি দেয়। চিঠিতে বলা হয়, মরিয়ম কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ও হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনালের নামে ঋণ মঞ্জুরির মাধ্যমে ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে নগদ উত্তোলন ও বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাবে স্থানান্তর করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য ন্যাশনাল ব্যাংক কর্তৃপক্ষসহ মোট ২০ জনকে দুদকে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ তালিকায় ব্যাংকটির সাবেক এমডি চৌধুরী মোশতাক আহমেদ, সাবেক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এসএসএম বুলবুল, আব্দুস সোবহান খান, শাহ সৈয়দ আব্দুল বারী ও ওয়াসিফ আলী খানের নাম রয়েছে। আরও রয়েছেন– মরিয়ম কনস্ট্রাকশনের এমডি আলম আহমেদ ও পরিচালক বাবু হরিদাস বর্মন।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ব্যাংকার ও দালালদের সহযোগিতায় বিগত সময়ে ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের লুটপাট হয়েছে। তারই প্রমাণ হাবিব হোটেলের এসব ঋণ। যে ব্যাংক থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে, সে ব্যাংককেই এখন অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হবে।
ব্যাংকার ও দালালদের সহযোগিতায় বিগত সময়ে ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের লুটপাট হয়েছে। তারই প্রমাণ হাবিব হোটেলের এসব ঋণ। যে ব্যাংক থেকে অর্থ নেয়া হয়েছে, সে ব্যাংককেই এখন অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হবে।
ড. মুস্তফা কে মুজেরী অর্থনীতিবিদ
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে কিছু সুবিধা দিয়েছে, সেই আলোকে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে অনৈতিক রীতি এখনো চলমান রয়েছে, তা বন্ধ করতে হবে।




