শিরোনাম

৭৬৪ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি বিএনপির প্রার্থী কাজী রফিক

৭৬৪ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি বিএনপির প্রার্থী কাজী রফিক
কাজী রফিকুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

বেসরকারি দুটি ব্যাংকের শীর্ষ ঋণ খেলাপির তালিকায় অন্যতম বগুড়া-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কাজী রফিকুল ইসলাম। ব্যাংক দুটির কাছে তার খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭শ ৬৪ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও অর্থঋণ আদালতে হওয়া মামলা সূত্রে এ তথ্য পাওয়া যায়।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক কাজী রফিকুল ইসলাম ২০০৯ সালে ৪০ কোটি টাকা ব্যক্তিঋণের মাধ্যমে এ ব্যাংকের সঙ্গে তার ব্যাবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেন। তার প্রধান ব্যবসা দেখানো হয় ভূমি উন্নয়ন ও ইমারত নির্মাণ। পরবর্তীতে তিনবার ঋণ বাড়ানোর মাধ্যমে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তার মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮০ কোটি টাকা।

ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ২০১৩ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত সুদ ও আসলসহ তার কাছে পাওনা দাঁড়িয়েছে ২৮০ কোটি টাকা। বর্তমানে গ্রাহকের ঋণটি মন্দমানে (খেলাপি) শ্রেণিকৃত। ঋণটি মন্দমানে থাকায় তার বিরুদ্ধে আদালতে সিআর-৩৮৭২/২৪ একটি মামলা করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তাকে যাতে ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো না হয় এজন্য তিনি আদালত থেকে তার খেলাপি ঋণের বিপরীতে একটি স্টে অর্ডার নিয়েছেন।

তিনি বলেন, গ্রাহক আমাদের কাছে ঋণটি নীতিমালার আওতায় পুনঃতফসিল করতে এসেছেন, তবে তার ব্যাবসায়িক কার্যক্রম বর্তমানে সচল নেই বিধায় আমরা এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিইনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআইবি তথ্য বলছে, কাজী রফিকুল ইসলামের ব্যক্তি নামে দুটি খেলাপি ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ২৭৭ কোটি টাকা, এছাড়া এক্সিম ব্যাংকের ৭৭ কোটি টাকা। তবে এই দুটি ঋণই ব্যাংকের কাছে খেলাপি গ্রাহক হিসেবে থাকলেও আদালতের মাধ্যমে গ্রাহক স্টে অর্ডার নিয়েছেন তিনি।

একই সঙ্গে সিআইবি তথ্য অনুযায়ী ওকে প্রপার্টিজ কোম্পানির নামে এক্সিম ব্যাংকের ২০৪ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে, যদিও এ ঋণটির ক্ষেত্রেও আদালতের মাধ্যমে স্টে অর্ডার নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ সিআইবি তথ্য অনুযায়ী এ ব্যক্তির মোট খেলাপি ঋণ রয়েছে ৫৫৮ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে কথা বলতে কাজী রফিকুল ইসলামের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। এ সময় তার পিএস পরিচয়ে এক ব্যাক্তি ফোন ধরে বলেন, তিনি কথা বলবেন না।

এক্সিম ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, কাজী রফিকুল ইসলাম এমডি ও চেয়ারম্যান এমন ‘ওকে গ্রুপ’-এর নামে মোট ঋণ রয়েছে ৪৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ওকে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে ৭৭ কোটি টাকা, ওকে এন্টারপ্রাইজ প্রাইভেট লিমিটেডের নামে ২০৩ কোটি টাকা এবং ওকে প্রপার্টিজের নামে ২০৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে।

আরো যে ঋণ খেলাপি মামলা

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের গুলশান ব্রাঞ্চে মেজর খন্দকার নুরুল আফসার নামে এক ব্যক্তির ৩৯৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের বিপরীতে মামলা করা হয়েছে। এই মামলায় নুরুল আফসারসহ আরো আটজনকে একই মামলায় আসামি করা হয়েছে। অর্থঋণ আদালতের ৬৬৪/২৫ মামলার এজাহার সূত্রে দেখা যায়, এ মামলার করপোরেট গ্যারান্টার হিসেবে আসামি রয়েছেন নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। একই মামলায় তৃতীয় আসামি রয়েছেন পার্সোনাল ও করপোরেট জামিনদার হিসেবে কাজী রফিকুল ইসলাম। রেন্স রিয়েল এস্টেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যানও একই মামলার আসামি।

মামলার বিবরণী সূত্রে দেখা যায়, বর্তমানে এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪১১ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রিন্সিপাল অ্যামাউন্টের পরিমাণ রয়েছে ১৪৮ কোটি টাকা। বাকি অর্থ সুদ ও অন্যান্য চার্জ বাবদ রয়েছে। গ্রাহক ২০০৯ সালে এ পর্যন্ত এই ঋণের বিপরীতে পরিশোধ করেছেন মাত্র ১৫ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রতিবেদককে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গ্রাহক ঋণটি নিয়েছেন পরিশোধ না করার উদ্দেশ্যে। বছরের পর বছর ঋণ পরিশোধ না করেও নানা রাজনৈতিক প্রভাবে ব্যাংকারদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে খেলাপি ঋণগুলোকে রেগুলার ঋণ দেখাতে বাধ্য করেছেন।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর এখন এসব ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে এসব গ্রাহক আমাদের কাছে শীর্ষ খেলাপি হলেও আদালতের মাধ্যমে তাদের খেলাপি ঋণের ওপর স্টে অর্ডার নিয়ে রেখেছে।

খেলাপি প্রার্থীদের বিষয়ে আইন যা বলছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নির্বাচন কমিশন জানতে চায় একজন গ্রাহকের সিআইবি স্ট্যাটাস কিরূপ অবস্থানে রয়েছে। উচ্চ আদালত থেকে স্টে অর্ডার নিলেও তিনি খেলাপি গ্রাহক থেকেই যান। তবে আদালতের স্টে অর্ডারের কারণে সিআইবিতে তার খেলাপি ঋণের পাশে স্টে অর্ডার লেখা থাকবে।

এ আইনজীবী বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের উচিত নয় একজন খেলাপি গ্রাহককে তাদের দলীয় প্রার্থী বানানো। কারণ সেই প্রার্থীর নৈতিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাকে জনগণের কাছে গিয়ে মিশতে হয়। এমন একজন খেলাপি গ্রাহক সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে মিশলে দলীয় ইমেজ নষ্ট হয়।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আব্দুল মতিন বলেন, আদালতের মাধ্যমে একজন গ্রাহকের খেলাপি ঋণে স্টে অর্ডার দেওয়া হলেও তিনি একজন খেলাপি গ্রাহকই। আদালত তার খেলাপি ঋণের স্ট্যাটাসে স্টে অর্ডার দিয়েছে, তবে তিনি যে খেলাপি গ্রাহক নন তা আদালত বলতে পারে না। আর এমন খেলাপি গ্রাহকদের নির্বাচন করার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কোনো সংসদীয় প্রার্থী যদি ব্যাংকের খেলাপি গ্রাহক হন, আদালতের কাছেও তিনি খেলাপি। তবে আদালত তাকে তিন মাসের জন্য স্টে অর্ডার দিয়ে সিআইবিতে খেলাপি না দেখানোর জন্য নির্দেশনা দিতে পারে।

তিনি বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশন বরাবর খেলাপি গ্রাহকদের খেলাপি হিসেবে দেখাব। তবে এটাও উল্লেখ করব যে উক্ত গ্রাহক আদালত থেকে নির্ধারিত সময়ের জন্য স্টে অর্ডার নিয়েছেন।

তিনি আরো জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এবং আচরণবিধিতে আরেক দফা সংশোধনী আনতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কোনো গ্রাহক আদালতের স্টে অর্ডার নিয়ে নির্বাচন করতে পারলেও নির্বাচন-পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যে যেকোনো সময় খেলাপি হলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে। তবে চূড়ান্ত হলে খেলাপি গ্রাহকরা আরও সতর্ক হবেন।

কে এই কাজী রফিক

কাজী রফিকুল ইসলাম বিএনপি থেকে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে দ্বিতীয়বার তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের হয়ে একই আসনে প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন।