শিরোনাম

‘টাকা না গুনলে’ মিলছে না সরকারি বাসা

‘টাকা না গুনলে’ মিলছে না সরকারি বাসা

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিতে কাজ করে আবাসন পরিদপ্তর। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন এই সংস্থায় বেশিরভাগ বাসা বরাদ্দ হয় দুটি প্রক্রিয়ায়– একটি ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে, অন্যটি প্রভাবশালী মহলের চাপে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও আবাসন পরিদপ্তরের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই মূলত এসব কাজ হয়, যার একটি অংশ ক্ষেত্রবিশেষে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও পেয়ে থাকেন। এরইমধ্যে দুর্নীতির দায়ে এ পরিদপ্তরের তিন জনকে বরখাস্ত করেছে মন্ত্রণালয়। কিন্তু এতেও খুব একটা সুফল পাওয়া যায়নি।

সিটিজেন জার্নালের অনুসন্ধানে জানা যায়, আজিমপুর সরকারি কলোনির ৯৪ নম্বর ভবনে ২০২৪ সালের শুরুতে একটি বাসা বরাদ্দ পান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। নিয়ম অনুযায়ী ‘ডি-১’ টাইপের বাসাটি ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা ছাড়া বরাদ্দ পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করতে বরাদ্দের জন্য ওই শিক্ষককে গুনতে হয়েছে ৩ লাখ টাকা।

গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে কর্মরত অবস্থায় অতিরিক্ত সচিব শাকিলা জেরীন তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকে ‘ই’-টাইপের একটি বাসা বরাদ্দ দেন। নিয়ম অনুযায়ী ১০ম গ্রেডের এ কর্মকর্তা ই-টাইপের বাসা পেতে পারেন না।

সিনিয়র সহকারী সচিব থাকা অবস্থায় সুপিরিয়র টাইপের ৩৮ নম্বর ভবনে বসবাস শুরু করেন বারিউল করিম খান। তিনি বিসিএস (প্রশাসন) ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তা। মূলত সাবেক জনপ্রশাসন সচিব মোখলেছুর রহমানের একান্ত সচিব (পিএস) থাকা অবস্থায় প্রভাব খাটিয়ে এই সুপিরিয়র টাইপের ভবনে বসবাস করছেন। সূত্র বলছে, বাসাটি তিনি কৌশলে একজন যুগ্ম সচিবের নামে বরাদ্দ নিয়েছেন। জানতে চাইলে বারিউল করিম খান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, আপনার তথ্য সঠিক নয়। আজিমপুরে আমি এখনো বাসা বরাদ্দ পাইনি। আবেদন করেছিলাম মাত্র। বাসা দেয়নি আমাকে। তাহলে সুপিরিয়র টাইপের ভবনে কীভাবে বসবাস করছেন? বাসটি কার নামে বরাদ্দ– এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

আবার কোথাও কোথাও ঘুষ নিয়েও বাসা বরাদ্দ দিচ্ছে না সংশ্লিষ্টরা– এমন অভিযোগও পাওয়া যায়। কথা হয় পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের প্যাথলজিস্ট মোখলেছুর রহমানের পরিবারের সঙ্গে। পরিবারের সদস্যরা জানান, বছর চারেক আগে আবাসন পরিদপ্তরের একজন সহকারী পরিচালককে বাসার জন্য অগ্রিম দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন সময় পার হলেও তারা বাসা বরাদ্দ পাননি। এরইমধ্যে আকস্মিক মৃত্যু হয় মোখলেছুর রহমানের।

বাসার জন্য গুনতে হয় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা
মন্ত্রণালয় আর পরিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে সিন্ডিকেট
শাস্তি দিলেও মেলে না প্রতিকার
প্রভাব খাটিয়ে জুনিয়র কর্মকর্তারা থাকেন সুপিরিয়র ফ্ল্যাটে

কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি কোষাগার থেকে যেসব কর্মকর্তা আবাসনের জন্য ঋণ নিয়েছেন, তাদের বাসা বরাদ্দ পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু কিছু কর্মকর্তা এরপরও বাসা বরাদ্দ নিয়ে বসবাস করছেন। এসব ঘটনা অহরহ ঘটছে সরকারি বাসা বরাদ্দের ক্ষেত্রে। অনিয়েমের অভিযোগে কর্তৃপক্ষ কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের শাস্তি দিলেও বাস্তবে আবাসন পরিদপ্তর সিন্ডিকেট থেকে মুক্ত হয়নি। রাজধানীর ইস্কাটনে সচিব নিবাসের চিত্রও একই। সিনিয়র সচিব, সচিব বা গ্রেড-১ কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত এসব অভিজাত ফ্ল্যাটের বেশিরভাগই প্রভাব খাটিয়ে থাকছেন অতিরিক্ত সচিবরা।

আবাসন পরিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মোট বাসা রয়েছে ১৯ হাজার ৯১টি এবং বাংলো ৭৯টি। বর্তমানে মাত্র ৮ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী আবাসন সুবিধা পাচ্ছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী তা ৪০ শতাংশে নেওয়ার কথা । এর মধ্যে সচিব নিবাসে ১১৪টি, সুপিরিয়র টাইপ ৫৫৪টি, ‘এফ’ টাইপ ১৪৭৭টি, ‘ই’ টাইপ ১৪৭০টিসহ বিভিন্ন শ্রেণির বাসা রয়েছে। বর্তমানে এসব বাসা বরাদ্দে ৭০ শতাংশ অনলাইন এবং ৩০ শতাংশ অফলাইন পদ্ধতি অনুসরণের নিয়ম থাকলেও তা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। অনলাইন পদ্ধতি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সহকারী পরিচালকের ভূমিকা নিয়েও মন্ত্রণালয়ের তদন্ত চলছে।

পূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বাসা বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আবাসন পরিদপ্তরের উপ-পরিচালক রাশেদ আহমেদ সাদী, সহকারী পরিচালক বিল্লাল হোসাইন ও সহকারী হিসাবরক্ষক মো. নজরুল ইসলামকে গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর বরখাস্ত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে চাকরির গ্রেড ও মূল বেতন বিবেচনায় না নিয়ে আবেদনকারীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আবাসন পরিদপ্তরের উপ-পরিচালক জিল্লুর রহমান ও সহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল নোমানের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি, ঘুষ ও নানা অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সরকারের নিরীক্ষা বিভাগের প্রতিবেদনেও এসব অনিয়মের বিষয় উঠে এসেছে। এর আগে এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি দেওয়া হয়। এ দুই কর্মকর্তাসহ আবাসন পরিদপ্তরে কর্মরত একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বাসা বরাদ্দের ক্ষেত্রে একসময় বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম হতো। কিন্তু গত তিন-চার মাস ধরে বিধি অনুযায়ী বাসা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। নীতিমালার বাইরে কাউকে বাসা দেওয়া হচ্ছে না।
মো. আসাদুজ্জামান পরিচালক, আবাসন পরিদপ্তর

কর্মকর্তারা জানান, উপ-পরিচালক মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান ১০ বছর ধরেই প্রশাসন শাখায় কর্মরত। এছাড়া তিনি বিগত ১৫ বছর ধরে ‘ই’-টাইপ বাসা বরাদ্দের কাজে যুক্ত। ‘ম্যানেজ মাস্টার’ হিসেবে পরিচিত জিল্লুর রহমান পরিদপ্তরে আসা পরিচালকদের ম্যানেজ করে নিজের পদ নিরাপদ রাখেন। অভিযোগ রয়েছে– বরাদ্দ-বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি বিপুল অবৈধ অর্থ উপার্জন করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপ-পরিচালক জিল্লুর রহমান, রাশেদ আহমেদ সাদী, সহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল নোমান, হিসাবরক্ষক আবদুল আলীম, মিনহাজ আলী, ফজলু ও বাবর আলীসহ কয়েকজন এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তারা বাসাপ্রতি ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা নিয়ে থাকেন। পরিচালকের দপ্তরের অফিস সহকারী ফজলুল হক আজিমপুর এলাকায় থেকে দালালি করেন বলেও অভিযোগ আছে।

জানতে চাইলে আবাসন পরিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমার কোনো বক্তব্য নেই; আপনার কিছু জানার থাকলে অফিসে এসে স্যারের (পরিচালক) কাছ থেকে জানতে পারেন।’ সহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল নোমানও ফোনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে উপ-পরিচালক রাশেদ আহমেদ সাদী বলেন, সচিবের পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠায় তদন্ত চলছে। আমি সবার কাছে দোয়া চাই।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বাসা বরাদ্দের ক্ষেত্রে নৈরাজ্য চলছে। টাকার বিনিময়ে বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের জোরে বাসা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় দুর্নীতি বাড়ছে। এই খাতে দ্রুত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা দরকার।’

আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বাসা বরাদ্দের ক্ষেত্রে একসময় বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম হতো। কিন্তু গত তিন-চার মাস ধরে বিধি অনুযায়ী বাসা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। নীতিমালার বাইরে কাউকে বাসা দেওয়া হচ্ছে না।’

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলামের বক্তব্য নিতে দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে প্রতিবেদনের বিষয় জানিয়ে মেসেজ দেওয়া হলে তিনি সাড়া দেননি।

/এফসি/