শিরোনাম

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প

জনমানবহীন নগরে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ১০ হাজার কোটি টাকা!

জনমানবহীন নগরে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ১০ হাজার কোটি টাকা!
পূর্বাচল প্রকল্পে ১০ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ছক (গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল)

দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আবাসিক প্রকল্প পূর্বাচল নতুন শহর। ১৯৯৫ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রকল্পের বয়স এখন প্রায় ৩০ বছর হতে চললো। তিন দশক পার হওয়া এ প্রকল্প আজও বাসযোগ্য হয়ে ওঠেনি। মানুষের জন্য বসযোগ্য করতে না পারলেও প্রকল্পটির নামে ইতিমধ্যে ব্যয় হয়েছে কমবেশি ৮ হাজার কোটি টাকা। এবার চলমান প্রকল্প শেষ না হতেই নতুন করে রক্ষণাবেক্ষণের নামে আরও ১০ হাজার কোটি টাকার একটি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এতে জনমানবহীন নতুন এ নগরীর ব্যয়ের অঙ্ক দাঁড়াচ্ছে সব মিলিয়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি ও রাজউকের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন প্রকল্পে যেসব কাজ দেখানো হয়েছে, তার বড় অংশই আগের প্রকল্পে শেষ হওয়ার কথা ছিল। একই কাজ দুই প্রকল্পে দেখিয়ে বিপুল অর্থ বরাদ্দ নেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত ছক তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে। সেই সঙ্গে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দীর্ঘ দিনের ব্যর্থতা ঢাকতে চাচ্ছে সংস্থাটি।

রাজউকের প্রস্তাবিত মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব ব্যয় ২২২ কোটি টাকা, মূলধন ব্যয় ৮ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি ও মূল্যবৃদ্ধির জন্য আলাদা করে রাখা হয়েছে ৮৮৯ কোটি টাকার কন্টিনজেন্সি তহবিল। অর্থাৎ প্রকল্পের নামে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে কমবেশি ১০ হাজার কোটি টাকা।

আগে ৮ হাজার এবার ১০ হাজার কোটি

পূর্বাচল প্রকল্পটির সর্বশেষ সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা। কাগজ কলমে সেই অর্থ খরচের পর এবার পূর্বাচলের রক্ষণাবেক্ষণে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছে। নতুন প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে জুন ২০২৮ পর্যন্ত। অর্থাৎ, তিন দশকে প্রকল্প শেষ না করেই রাজউক আবার নতুন প্রকল্পের নামে আরও হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পথে হাঁটছে।

প্রধান প্রকৌশলীর দখলে পিডি’র চেয়ার

রাজউকের প্রধান প্রকৌশলীই পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি)। একই ব্যক্তি প্রকল্পের নকশা, বাস্তবায়ন, বিল অনুমোদন ও তদারকির দায়িত্বে আছেন। প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব এমনিতেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তৃত। রাজধানীর উন্নয়ন সংক্রান্ত সব বড় প্রকল্পের কারিগরি তদারকি, নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের সমন্বয়ের দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত। সেই একই ব্যক্তি যখন দেশের সবচেয়ে বড় আবাসিক প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ নির্বাহী ক্ষমতাসহ প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বও গ্রহণ করেন, তখন তা নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।

পূর্বাচল আজও কার্যত জনমানবহীন নগরী (ছবি: হারুন-অর-রশীদ)
পূর্বাচল আজও কার্যত জনমানবহীন নগরী (ছবি: হারুন-অর-রশীদ)

রাজউক সূত্র জানায়, এই ক্ষমতা আকঁড়ে ধরে প্রধান প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম যিনি পিডি, অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক (এপিডি), প্রকল্প কর্মকর্তাসহ (পিএম) পুরো কাঠামোতে একটি শক্তিশালী প্রকৌশল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তারা নিজেদের স্বার্থে প্রকল্পের কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘায়িত করা থেকে শুরু করে নতুন নতুন প্রকল্প নেওয়া ও সংশোধনের মাধ্যমে বরাদ্দ বাড়িয়ে সরকারি অর্থ তছরুপ করার পথ চালু রেখেছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

ক্ষমতা আকঁড়ে ধরে প্রধান প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম যিনি পিডি, অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক (এপিডি), প্রকল্প কর্মকর্তাসহ (পিএম) পুরো কাঠামোতে একটি শক্তিশালী প্রকৌশল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তারা নিজেদের স্বার্থে প্রকল্পের কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘায়িত করা থেকে শুরু করে নতুন নতুন প্রকল্প নেওয়া ও সংশোধনের মাধ্যমে বরাদ্দ বাড়িয়ে সরকারি অর্থ তছরুপ করার পথ চালু রেখেছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে পূর্বাচল প্রকল্পের পরিচালক ও রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন) মো. নুরুল ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, আমি প্রকল্পের পরিচালক প্রথমে ছিলাম। গত ২০২৪ সালে ডিসেম্বরে প্রধান প্রকৌশলী হই। তখন প্রকল্পের মেয়াদ আর ৬ মাস বাকি থাকায় মন্ত্রণালয় থেকে নতুন পরিচালক নিয়োগ না দিয়ে আমাকেই ওই দায়িত্বে রাখা হয়। এক বছরে দায়িত্বে থাকাকালীন যতটুকু সম্ভব কাজ করেছি।’

প্লট আছে, নেই মানুষ

প্রকল্প এলাকায় মোট আবাসিক প্লট ২৫ হাজার ১৬টি। এর মধ্যে ১০ হাজার প্লট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের, ৪ হাজার প্লট প্রবাসীদের, ৭ হাজার প্লট স্থানীয়দের। এই ২১ হাজার প্লটের অধিকাংশেই মানুষ বসবাস করে না। অনেকেই প্লট হাতবদল করে মুনাফা করছেন, আর স্থানীয় বাসিন্দারা অর্থাভাবে কেবল একতলা ঘর তুলছেন। ফলে পূর্বাচল আজও কার্যত জনমানবহীন নগরী। রাত নামলেই সেখানে অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়।

নতুন প্রকল্পের নামে বিস্তর ব্যয়ের চিত্র

রাজউকের প্রস্তাবিত মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব ব্যয় ২২২ কোটি টাকা, মূলধন ব্যয় ৮ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি ও মূল্যবৃদ্ধির জন্য আলাদা করে রাখা হয়েছে ৮৮৯ কোটি টাকার কন্টিনজেন্সি তহবিল। অর্থাৎ প্রকল্পের নামে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে কমবেশি ১০ হাজার কোটি টাকা।

পূর্বাচলকে মানুষের বসবাস উপযোগী করে তুলতে উন্নয়ন পরিধি বেড়েছে এবং ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সে কারণেই এবারের প্রকল্পে বরাদ্দের অঙ্ক বেশি ধরা হয়েছে। তবে এটি একটি প্রাথমিক প্রস্তাবনা। যাচাই-বাছাইয়ের পর ব্যয় কিছুটা কমতেও পারে।
মো. নুরুল ইসলাম পূর্বাচল প্রকল্প পরিচালক

রাজস্ব ব্যয়ের বড় অংশ ব্যয় হবে প্রকল্প পরিচালনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে। এতে পরামর্শক নিয়োগ, জরিপ ও পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে ৬১ কোটি টাকা। চুক্তিভিত্তিক যানবাহন ব্যবহারে ১৬ কোটি টাকা, লেকের পানি পরিচ্ছন্নতায় ৬ কোটি টাকা, প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন খাতে ৫ কোটি টাকা, সেমিনার ও অনুষ্ঠান খাতে ২ কোটি টাকা, আইনি ব্যয় ২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আপ্যায়ন, বিজ্ঞাপন, অফিস স্টেশনারি, কম্পিউটার সামগ্রীসহ অন্যান্য প্রশাসনিক খাতে আরও কয়েক ১০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা বলা রয়েছে।

প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয় ধরা হয়েছে মূলধনজনিত ব্যয়ে অর্থাৎ অবকাঠামো নির্মাণে। প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) সড়ক অবকাঠামোতেই বরাদ্দ রাখা হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সড়ক প্রশস্ত ও মজবুতকরণে ১ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, রাস্তা পুনঃনির্মাণে ৯০১ কোটি টাকা এবং নতুন সড়ক নির্মাণে ৩৬৪ কোটি টাকা। ড্রেনেজ ও পানি ব্যবস্থাপনায় আরসিসি ড্রেন, সারফেস ড্রেন ও ক্রস ড্রেন নির্মাণে বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ৫৭৬ কোটি টাকা। ফুটপাত নির্মাণে ৫৬৪ কোটি টাকা এবং সাইকেল ট্র্যাক ও ওয়াকওয়ে নির্মাণে ২২৩ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।

নগর সৌন্দর্য ও নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির নামে পার্ক, শিশুপার্ক ও ইকোপার্ক উন্নয়নে ১৫৫ কোটি টাকা, মাঠ উন্নয়নে ১৮২ কোটি টাকা, সবুজ বেষ্টনী তৈরিতে ১১২ কোটি টাকা এবং বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যায় প্রায় ১৯ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। লেক উন্নয়ন ও তীর সংরক্ষণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৮৪ কোটি টাকা।

নগর সৌন্দর্য ও নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির নামে পার্ক, শিশুপার্ক ও ইকোপার্ক উন্নয়নে ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে (ছবি: হারুন-অর-রশীদ)
নগর সৌন্দর্য ও নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির নামে পার্ক, শিশুপার্ক ও ইকোপার্ক উন্নয়নে ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে (ছবি: হারুন-অর-রশীদ)

ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামো খাতেও রয়েছে বিশাল বরাদ্দ। মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ৮৬৫ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য কেন্দ্র নির্মাণে ১৬৯ কোটি টাকা, পুলিশ ফাঁড়ি ও থানা নির্মাণে ৪ কোটি টাকা এবং আনসার ব্যারাক নির্মাণে প্রায় ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক স্থাপনায় কাঁচাবাজার ও মার্কেট নির্মাণে একাই বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫১১ কোটি টাকা, অনাবাসিক ভবন নির্মাণে ১৫৭ কোটি টাকা। যোগাযোগ ও ইউটিলিটি অবকাঠামোয় সেতু নির্মাণে ৯১ কোটি টাকা, স্লুইস গেট নির্মাণে ১৮২ কোটি টাকা, সড়কবাতি স্থাপনে ৬১৪ কোটি টাকা এবং বিদ্যুতায়নে ৩৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

উন্নয়নের নামে বিপুল অঙ্কের বরাদ্দ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলাম সিটিজেন জার্নাল-কে বলেন, ‘পূর্বাচলকে মানুষের বসবাস উপযোগী করে তুলতে উন্নয়ন পরিধি বেড়েছে এবং ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সে কারণেই এবারের প্রকল্পে বরাদ্দের অঙ্ক বেশি ধরা হয়েছে। তবে এটি একটি প্রাথমিক প্রস্তাবনা। যাচাই-বাছাইয়ের পর ব্যয় কিছুটা কমতেও পারে।’

আবাসন প্রকল্পের নামে পূর্বাচলে মূলত প্লট বাণিজ্য চলছে। এর পেছনে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক নেক্সাস কাজ করছে। নতুন করে উন্নয়নের নামে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় না করে বরং সব প্লট বরাদ্দ বাতিল করা উচিত। পুরো এলাকাকে আধুনিক নাগরিক সুবিধাসহ পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশীপে অ্যাপার্টমেন্ট সিস্টেমে রূপান্তর করা দরকার। এতে যার যতটুকু প্রয়োজন, সে ততটুকুই গ্রহণ করতে পারবে এবং দীর্ঘদিনের প্লট বাণিজ্য বন্ধ হবে।
স্থপতি ইকবাল হাবিব নগর পরিকল্পনাবিদ

অন্যদিকে, পূর্বাচল প্রকল্পের সার্বিক বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন করলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)–এর যুগ্ম সম্পাদক ও নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব সিটিজেন জার্নাল–কে বলেন, ‘আবাসন প্রকল্পের নামে পূর্বাচলে মূলত প্লট বাণিজ্য চলছে। এর পেছনে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক নেক্সাস কাজ করছে। নতুন করে উন্নয়নের নামে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় না করে বরং সব প্লট বরাদ্দ বাতিল করা উচিত। পুরো এলাকাকে আধুনিক নাগরিক সুবিধাসহ পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশীপে অ্যাপার্টমেন্ট সিস্টেমে রূপান্তর করা দরকার। এতে যার যতটুকু প্রয়োজন, সে ততটুকুই গ্রহণ করতে পারবে এবং দীর্ঘদিনের প্লট বাণিজ্য বন্ধ হবে।’

এ বিষয়ে কথা বলতে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। পরে তার মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠানো হলেও তিনি কোন সাড়া দেননি।

/এএস/