শিরোনাম

ভারতে সংশোধিত ভোটার তালিকা থেকে মুসলিম, অভিবাসীদের বাদ দেওয়া হচ্ছে যেভাবে

সিটিজেন-ডেস্ক­
ভারতে সংশোধিত ভোটার তালিকা থেকে মুসলিম, অভিবাসীদের বাদ দেওয়া হচ্ছে যেভাবে
পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির এক ভোটার খসড়া ভোটার তালিকায় তার নাম আছে কি না তা যাচাই করছেন ছবি: পিটিআই

ভারতে চলমান ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর) তাড়াহুড়া এবং যেনতেনভাবে করা হচ্ছে। সেখানে ‘সতর্কভাবে’ ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা। এসআইআর প্র্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশিত জুরি বোর্ডের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য ওঠে এসেছে।

গত বছরের ২০ ডিসেম্বর নয়াদিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে ভারত জোড়ো অভিযান, পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিস এবং দ্য ন্যাশনাল এলায়েন্স অব পিপলস মুভমেন্টেসের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ’সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার রক্ষায় জাতীয় সম্মেলনে’ জুরি বোর্ডের সদস্যরা রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড়, বিহার, গুজরাট, তামিলনাড়ু,গোয়া এবং উত্তর প্রদেশের ভোটারদের কাছ থেকে চলমান এসআইআর নিয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা শোনেন। নির্বাচন কমিশনের বুথ লেভেল কর্মকর্তাদের (বিএলও) মাধ্যমে পরিচালিত এই সংশোধন প্রক্রিয়া তাদের ওপর কী প্রভাব ফেলেছে—সে বিষয়টিও তারা জুরি বোর্ডের সদস্যদের বলেছেন ।

বুথ লেবেল অফিসারদের (বিএলও) আত্মহত্যা আর দেশজুড়ে শিক্ষকদের প্রতিবাদ এবং সরকারী কর্মকর্তাদের গা ছাড়া মনোভাবের কারণে ইতোমধ্যেই এসআইআর প্রক্রিয়াটি বিতর্কিত হয়ে পড়েছে। আর হঠাৎ করে হালনাগাদের কাগজপত্র দাবি, বাতিল হয়ে যাওয়া আর তথ্যের অমিলের কারণে এই প্রক্রিয়া নিয়ে সাধারন ভোটাররা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

জুরি বোর্ড সাক্ষ্য–প্রমাণের ভিত্তিতে জানিয়েছে, নথিপত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং ২০০৩ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে মিল খোঁজার কারণে সাধারণ নাগরিক বিশেষ করে অভিবাসী,গরীব এবং গৃহহীনদের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি অনুপস্থিতি, ধর্মীয় পরিচয়, জীবনমান, বয়স এমনকি লিঙ্গগত কারণে সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদের একটা বড় অংশ চলমান এসআইএর তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।

বাদ পড়েছেন অভিবাসীরা

রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশে দেখা গেছে, দেশের অন্য রাজ্যগুলোতে কাজ করতে যাওয়ায় বাড়িতে অনুপস্থিত ছিলেন অভিবাসী কৃষি শ্রমিকদের অনেকেই। ১৯৫০ সালে জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১৯ ধারা মোতাবেক ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হলেও এবারের এসআইআরে বাদ পড়েন তারা।

ছত্রিশগড়ের বস্তার অঞ্চলে নিষিদ্ধ মিলিশিয়া গোষ্ঠী ‘সালওয়া জুড়ুম’ এর হামলায় বাস্তচ্যূত হওয়া হাজার হাজার অধিবাসী নিবন্ধন ফর্ম পাননি। অঞ্চলটির দক্ষিণ সীমান্তে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহিংস তৎপরতার কারণে ৬৯৯টি গ্রামের ৩ লাখের বেশি মানুষ বাস্তচ্যূত হয়েছেন। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলায় অনেকের প্রযোজনীয় কাগজপত্র পুড়ে গেছে।

অঞ্চলটির সাবেক বিধায়ক মানিশ কুঞ্জামের মতে, অঞ্চলটিতে বিএলও কর্মকর্তারা খুব কমই গিয়েছেন। বাস্তচ্যূত অনেকেই উড়িষ্যা,মহারাষ্ট্র, অন্ধ প্রদেশ আর তেলেঙ্গানায় চলে গেছেন বলে জানান ‍তিনি। তিনি বলেন ‘আমার ভয় হচ্ছে প্রায় ১.২৫-১.৫ লাখ ভোটার চলমান এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারেন’।

ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বাদ পড়ছেন অনেকে

অন্যদিকে গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ আর উত্তরপ্রদেশে এসআইআরের কার্যক্রমে বাধা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে মুসলিমদের ’অবৈধ অধিবাসী’ বলে ভোটার হতে দেওয়া হচ্ছে না। সেখানে মুসলিমদের বস্তি গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

তেমনই একটি আহমেদনগরের আকবর নগর বস্তি,যেটি (২০০২ সালে দাঙ্গার সময় গুড়িয়ে দেওয়ার পরে পুনরায় বানানো হয়েছিল) ১১ মাস আগে সেটি আবারো গুড়িয়ে দেওয়া হয়। বস্তিবাসীদের পূর্নবাসনের জন্য হাইকোর্ট আদেশ দিলেও উচ্ছেদের অভিযোগে অনেকেই ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ছেন।

মুসলিম ভোটারদের বাইরে তামিলনাডুর মধূমালায় বনাঞ্চলের অনেক আদিবাসীও এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। এদিকে মধ্যপ্রদেশের জবলপুরে ভাসমান ১৫০ জন ভোটারকে ‘রোহিঙ্গা’ আখ্যায়িত করে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। যদিও তারা ১৯৮৪ সালে তাদের পূর্বপরুষরা ভোটার তালিকায় নিবন্ধিত হওয়ার কাগজপত্র দেখিয়েছেন।

বস্তিবাসীরাও বাদ পড়ছেন

তামিলনাডুর মতো মহানগর এলাকার অনেক বস্তিবাসী ভোটার এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ পড়েছেন। মুম্বাই জলান্ধর আর হায়দ্রারাবাদে করা এক জরিপে দেখা গেছে,নগরের উচ্চ আয়ের ৭৪ শতাংশ মানুষ ভোটার হতে পারলেও বস্তিবাসীরা ৫০ শতাংশের নিচে ভোটার হতে পেরেছেন।

জীবিতরা ‘মৃত’ হয়েছেন

চলমান সংশোধন প্রক্রিয়ায় জীবিত মানুষকে মৃত দেখিয়ে ভোটাার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। েগত বছরের আগস্টে বিহারের আরাতে এমনই এক অটোচালককে মৃত দেখানো হয়েছিল। একইরকম চিত্র পাওয়া গিয়েছিল গুজরাটেও। সেখানে ১ হাজার ২০৬ জনকে তালিকায় ‘মৃত’ দেখানো হয়েছে।

বাদ পড়ছেন নারী এবং ট্রান্সজেন্ডাররা

এবারের ভোটার তালিকায় নারী ভোটারদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কারণ হিসেবে দেখা গেছে, দেশটির নির্বাচন কমিশন স্বামীর বাড়ির মানুষদেরকে “আত্মীয়” হিসেবে মানছে না। যে কারণে বিয়ের পরে শ্বশুর বাড়িতে স্থানান্তরিত হওয়ায় মেয়েদের অনেকেই ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারছেন না। এ ছাড়া পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে ট্রান্সজেন্ডারদের অনেকেই ভোটার নিবন্ধনের অযোগ্য হয়ে পড়েছেন। যদিও ভারতীয় সংবিধানের ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে ট্রান্সজেন্ডারদের ভোট দেওয়ার অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

ধারাবাহিক প্রভাব

জুরি বোর্ডের সদস্যদের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যদি পরিবারের একজন মানুষ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েন তাহলে তার সন্তানরাও ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার ঝুকিতে থাকেন। কেননা সন্তান নিজের মা-বাবার তথ্য প্রমাণ করতে পারছেন না।

ওই সম্মেলনে বলা হয়েছে, বিএলওদের কাজের প্রচণ্ড চাপ রয়েছে । এতে অনেকেই আত্মহত্যার দিকেও ঝুকছেন। নির্বাচন কমিশন অবশ্য বিএলওদের কাজের চাপের বিষয়টি স্বীকার করছে না।

সবশেষে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনোপ্রকার সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করেই ভোটার তালিকাকে আধার কার্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়রানি এবং নজরদারির মতো বিষয়গুলো ছাড়াও ভোটারদের এই ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহার করা হতে পারে।

তথ্যসূত্র: দ্য ওয়্যার