শিরোনাম

ট্রাম্পের শুল্ক চাপ মোকাবিলায় নতুন চুক্তির পথে ইইউ-ভারত

সিটিজেন-ডেস্ক­
ট্রাম্পের শুল্ক চাপ মোকাবিলায় নতুন চুক্তির পথে ইইউ-ভারত
ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন, যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত বাণিজ্য নীতি এবং চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর চাপে ইইউ নতুন ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার খুঁজছে। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে সোমবার (২৫ জানুয়ারি) প্রধান অতিথি হিসেবে থাকছেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও লুইস সান্তোস দা কস্তা ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি এই সফরের মূল আলোচ্যসূচিতে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ভারতের মধ্যে বহুল আলোচিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত করার বিষয়টি।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা এখন ইউরোপের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন, যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত বাণিজ্য নীতি এবং চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর চাপে ইইউ নতুন ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার খুঁজছে।

ভারতের দিক থেকেও এই অতিথি নির্বাচন একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা বহন করে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৫০ শতাংশ শুল্ক ইস্যুতে অচলাবস্থা নতুন বছরেও চলায় দিল্লি ইউরোপসহ বিশ্বের অন্যান্য অংশের সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক দ্রুত জোরদার করতে চাইছে। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের শীতেজ বাজপেয়ী বলেন, এই পদক্ষেপ ভারতের বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতিরই প্রতিফলন।

কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ২৭ জানুয়ারি দুই পক্ষের শীর্ষ বৈঠকে এফটিএ ঘোষণা হতে পারে। ফন ডার লিয়েন ও ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল দুজনেই একে ‘সবচেয়ে বড় চুক্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। প্রায় দুই দশক ধরে চলা জটিল আলোচনার পর এটি চূড়ান্ত হলে চার বছরের মধ্যে ভারতের নবম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হবে। অন্যদিকে ইইউর জন্য এটি মেরকোসুর জোটের সঙ্গে চুক্তির ধারাবাহিকতা।

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সুমেধা দাশগুপ্ত বলেন, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাণিজ্য পরিবেশকে অস্থির করে তুলেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের প্রভাব কমানো ভারতের জন্য যেমন জরুরি, তেমনি চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো ইইউর অন্যতম লক্ষ্য।

বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি ইইউকে আকৃষ্ট করছে। ভারত বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম এবং দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতি; চলতি বছরই দেশটির জিডিপি ৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে। দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে ফন ডার লিয়েন বলেন, ইইউ-ভারত যৌথ বাজার হলে তা হবে দুই বিলিয়ন মানুষের মুক্ত বাজার, যা বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রতিনিধিত্ব করবে।

বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। একটি এফটিএ হলে ইইউর ‘জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস’ (জিএসপি) সুবিধা পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে, যা ২০২৩ সালে প্রত্যাহার হওয়ায় অনেক ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা কমে গিয়েছিল। গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের অজয় শ্রীবাস্তবের মতে, এ চুক্তি পোশাক, ওষুধ, ইস্পাত, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও যন্ত্রপাতির মতো খাতে শুল্ক কমিয়ে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের সহায়তা করবে।

তবে কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের মতো সংবেদনশীল খাত চুক্তির বাইরে রাখার পক্ষে ভারত। গাড়ি, মদ ও স্পিরিটসের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে শুল্ক কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। শীতেজ বাজপেয়ীর ভাষ্য, ভারতের ক্ষেত্রে এফটিএর ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য অর্থনৈতিক দিকের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

এর পাশাপাশি মতপার্থক্যও রয়ে গেছে। ইইউ চায় আরও কঠোর মেধাস্বত্ব ও তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা, আর ভারত উদ্বিগ্ন ইউরোপে চালু হওয়া নতুন কার্বন কর সিবিএএম নিয়ে। অজয় শ্রীবাস্তবের মতে, এটি কার্যত নতুন সীমান্ত শুল্কের মতো কাজ করছে, যা বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বড় চাপ সৃষ্টি করবে।

তবু বিশ্লেষকদের ধারণা, দীর্ঘমেয়াদে এই চুক্তি উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অ্যালেক্স ক্যাপ্রি বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রসহ অনির্ভরযোগ্য অংশীদারদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে।

/এসএ/