সংকট আর হতাশায় বিনিয়োগকারীদের বছর পার

সংকট আর হতাশায় বিনিয়োগকারীদের বছর পার
মরিয়ম সেঁজুতি

গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দেশে পরিবর্তনের আবহ তৈরি হয়। শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা ভেবেছিলেন, বহুদিন ধরে যে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছিল সেগুলো এবার হবে। আর তাতে বাজারে জবাবদিহিতা বাড়বে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিমত্তা বাড়বে, বাজার হবে আরো ন্যায্য ও স্বচ্ছ। অর্থাৎ দেশের শেয়ারবাজারে ২০২৫ সাল শুরু হয়েছিল আশাবাদের উজ্জ্বল বার্তা নিয়ে।
কিন্তু বছর গড়াতেই সেই আশার জায়গাটি পরিণত হয় অনিশ্চয়তা, সংকট আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হতাশায়।
পুরো বছরজুড়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে কোনো কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) আবেদন জমা পড়েনি। শুধু আইপিও নয়, পুরো বছরজুড়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) কোনো কোম্পানিও কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর অফারের (কিউআইও) মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে আগ্রহ দেখায়নি।
এছাড়া, বছরজুড়ে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি বিনিয়োগকারী, স্থানীয় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিমা কোম্পানির বিনিয়োগের সুযোগও ছিল খুবই নগণ্য। কেননা, বছরটিতে করপোরেট বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডের অনুমোদন মিলেছে হাতে গোনা কয়েকটি।
বাস্তবে কিছু সংস্কারের দেখা মিলেছে। বিশেষ করে মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও মার্জিন ঋণের নতুন নিয়ম করা হয়েছে। নগদ লভ্যাংশ দেয়ার পদ্ধতি সহজ করা হয়েছে। বিও হিসাবের বার্ষিক ফি কমানো হয়েছে।
এছাড়া বাজারে অনিয়মের অভিযোগে আগে যাদের ধরা যেত না, তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু সংস্কারের শুরুটা সুখকর ছিল না। জোর করে শেয়ার বিক্রি, বিনিয়োগ কমে যাওয়া ও শেয়ারের দর পড়তে থাকায় অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়েন।
সংস্কারের নামে ব্যাংক একীভূতকরণ, লোকসানি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন এবং কঠোর নীতিমালার প্রভাব সরাসরি এসে পড়ে শেয়ারবাজারে। এসব সিদ্ধান্তের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে মূলত ক্ষুদ্র ও মধ্যম বিনিয়োগকারীদেরই। বছরের শেষ প্রান্তে এসে অসংখ্য বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিও ক্ষতবিক্ষত, আস্থা ভঙ্গুর এবং বাজারে অংশগ্রহণের আগ্রহ তলানিতে।
অর্থবছর জুড়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ছিল চরম অস্থিরতায়। বছরের শুরুতে সূচক যেখানে ৫ হাজার ২০০ পয়েন্টের ওপরে অবস্থান করছিল, সেখানে ব্যাংক একীভূতকরণ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের ঘোষণা আসার পর তা দ্রুত ৫ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে যায়। বাজারের এই টানা দরপতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে তোলে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ)-এর প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলামের মতে, সংস্কারের প্রাথমিক ধাক্কা সবসময়ই কষ্টকর হয়। তিনি বলেন, বাজার এখনো সেই কঠিন সময় অতিক্রম করছে। তবে মার্জিন ঋণের নতুন নিয়মের কারণে ‘ফোর্সড সেল’ বা বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রির চাপ বাজারকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলেছে, যা দরপতনকে ত্বরান্বিত করেছে।
সংস্কার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের অনুভূতি ছিল মিশ্র। অনেকেই মনে করেন, বাজারের পুরনো দুর্বলতাগুলো আগে ঠিক করা দরকার ছিল। তবে সংস্কার কত দ্রুত হবে ও এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত কার ওপর বর্তাবে এই অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের দ্বিধায় ফেলেছিল।
সর্বসাধারণের বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত আইপিও বন্ধ থাকায় পুরো বছরজুড়ে পুঁজিবাজারে অস্থিরতা বিরাজমান ছিল। সূচক ও লেনদেন তলানিতে নামার পাশাপাশি, বিনিয়োগকারীদের বাজার ছেড়ে যাওয়ার সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য হারে। বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখতে বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও হিসাব) রক্ষণাবেক্ষণের ফি বা মাশুল এক-তৃতীয়াংশে নামানো হলেও বাজার ছেড়ে যাওয়ার গতি থামানো যায়নি। শুধু বিনিয়োগকারী নয়, বছরটিতে পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মূল অফিসের পাশাপাশি শাখা অফিস মিলিয়ে শতাধিক সিকিউরিটিজ লেনদেনের অফিস বন্ধ হয়েছে।
বছর জুড়ে পুঁজির জোগান প্রায় শূন্য
পুঁজিবাজারে সর্বশেষ পুঁজি সংগ্রহ করতে আইপিও নিয়ে হাজির হয়েছিল টেকনো ড্রাগস লিমিটেড। ২০২৪ সালের প্রথমার্ধেই কোম্পানিটি বাজার থেকে ১০০ কোটি টাকা তুলে নেয়। এরপর পুঁজিবাজারে আর কোনো কোম্পানির আইপিও অনুমোদন হয়নি। ওই বছর কেবল একটি আইপিও বাজারে এসেছিল। তবে, বছরটিতে আরো একটি কিউআইও অনুমোদন হয়েছিল। স্বল্প মূলধনের কোম্পানি ক্রাফটসম্যান ফুটওয়ার অ্যান্ড অ্যাক্সেসরিজ লিমিটেড কিউআইও প্রস্তাবের মাধ্যমে ৫ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করেছিল।
দুঃখজনক হলেও চলতি বছরে একটি আইপিও কিংবা কিউআইও প্রস্তাবের অনুমোদন দিতে পারেনি বিএসইসি। কয়েকটি প্রস্তাব জমা পড়লেও তা বাতিল করে দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। আর এখন আইপিও নীতিমালা সংস্কারের কথা বলে কোম্পানিগুলোর থেকে প্রস্তাব আহ্বানও বন্ধ রয়েছে। সংস্থার কাছে বর্তমানে একটিও প্রস্তাব জমা নেই। ফলে বছরের বাকি দিনগুলোতে কোনো আইপিও কিংবা কিউআইও অনুমোদনের সুযোগ নেই।
বন্ড ও ফান্ডের অনুমোদনও কমেছে
গত বছর বিএসইসির অনুমোদন সাপেক্ষে পুঁজিবাজার থেকে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ১১টি প্রতিষ্ঠান ১৬ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছিল। এর মধ্যে ছয়টি ব্যাংক ও পাঁচটি উৎপাদন খাতের কোম্পানি ছিল। চলতি বছর শুধু ছয়টি ব্যাংককে ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, চলতি বছর মাত্র একটি বে-মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার অর্থ সংগ্রহের সীমা নির্ধারণ করা হয় ২৫ কোটি টাকা। গত বছর চারটি ফান্ড ইস্যুর মাধ্যমে ১২৫ কোটি টাকা উত্তোলনের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল।
বন্ড ও ফান্ডের অনুমোদন কমায় চলতি বছর পুঁজিবাজারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি বিনিয়োগকারী, স্থানীয় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিমা কোম্পানির বিনিয়োগের সুযোগ কমেছে। তবে, চলতি বছর রাইট শেয়ারের অনুমোদন বাড়িয়েছে বিএসইসি। বছরটিতে দুটি কোম্পানির ৩২৮ কোটি টাকার রাইট শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগের বছরে মাত্র ৯৩ কোটি টাকার রাইট শেয়ার ইস্যুর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল।
সূচক ও লেনদেন নেমেছে তলানিতে
চলতি বছরের শুরু থেকে গত ২৪ ডিসেম্বর (বুধবার) পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫ হাজার ২১৮ পয়েন্ট থেকে কমে ৪ হাজার ৮৮৩ পয়েন্টে নেমেছে। অবশ্য, ২০২৪ সালে সূচক ১০৩০ পয়েন্ট কমেছিল। এছাড়া, চলতি বছরের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক্সচেঞ্জটির শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ১ হাজার ০৮ পয়েন্টে এবং বাছাই করা শেয়ার নিয়ে গঠিত ডিএস ৩০ সূচক ১৮৮২ পয়েন্টে নেমেছে। অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই বছরের শুরু থেকে ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯১২ পয়েন্ট কমে ১৩ হাজার ৫৬১ পয়েন্টে নেমেছে।
এদিকে, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ডিএসইতে গড়ে প্রতিদিন লেনদেন হয়েছে মাত্র ৪৪০ কোটি টাকা। গত বছর এক্সচেঞ্জটিতে প্রতিদিন গড়ে ৬৩১ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে ডিএসইর গড় লেনদেন কমেছে ১৯১ কোটি টাকা। আর সিএসইতে গত নভেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরে প্রতিদিন গড়ে ১৭ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। আগের বছরে গড় লেনদেন হয়েছিল ২৯ কোটি টাকা।
নিষ্ক্রিয় ৬৬ হাজার বিনিয়োগকারী
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে গত ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুঁজিবাজারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৬৫ হাজার ৯৬২টি বিও হিসাবধারী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সরাসরি বিও হিসাব বন্ধ হওয়ায় বাজার ছেড়েছেন ৪৩ হাজার ২৮৩ জন বিনিয়োগকারী। এছাড়া ২২ হাজার ৬৭৯ জন বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব শেয়ার শূন্য হয়েছে আলোচিত সময়ে।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ ডিসেম্বর শেষে পুঁজিবাজারে মোট বিও হিসাবের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ১৬৯টি। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর যা ছিল ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৪৫২টি। আর গত ১৮ নভেম্বর শেষে শেয়ারশূন্য বিও হিসাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫৩টি। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৯৭৪টি।
বন্ধ হচ্ছে ব্রোকারেজ হাউজের শাখা ও মূল অফিস
বিও হিসাবধারীদের লেনদেন সুবিধা দিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে নিবন্ধিত ট্রেক সনদ নিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যভুক্ত হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে ব্রোকারেজ হাউজগুলো। এখন পর্যন্ত স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেক হোল্ডার হিসেবে ব্যবসা শুরু করেছে ৩০৭টি ব্রোকারেজ হাউজ।
এর মধ্যে গ্রাহক হিসাবে ঘাটতি থাকাসহ বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৫টি ব্রোকারেজ হাউজের কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। সচল থাকা বাকি ৩০২টি ব্রোকারেজ হাউজের মূল অফিস ও শাখা অফিসের সংখ্যা প্রায় ১৫০০টি। এর মধ্যে অনেকেই বাজারে লেনদেন কম থাকায় লোকসান এড়াতে শাখা অফিস বন্ধ রাখার পাশাপাশি মূল অফিসের কার্যক্রমও কৌশলে বন্ধ রাখছে।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মূল অফিস ও শাখা অফিসের অধিকাংশই রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রাম অঞ্চলে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সবশেষ তথ্য পর্যন্ত ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মূল অফিস ও শাখা অফিস বন্ধ হয়েছে অন্তত ১১৭টি। বাজারে লেনদেন কম হওয়া, সনদ নবায়ন না হওয়া এবং অফিস সংস্কারের কথা জানিয়ে বন্ধ রাখা হচ্ছে এসব হাউজ। এর মধ্যে বিকল্প লেনদেন অফিস না থাকায় কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজের হিসাবধারী এখন শেয়ার লেনদেনও করতে পারছে না।
ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়া
চলতি বছর পুঁজিবাজার থেকে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক তালিকাচ্যুত করা হয়েছে। অথচ, ওই ব্যাংকগুলোতে উদ্যোক্তা-পরিচালক এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর বাইরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বড়ো অংশের মালিকানা ছিল। তালিকাচ্যুত পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে এক ব্যাংক গঠনের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের অর্থের পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছে সরকার। কিন্তু, পুঁজিবাজারের মাধ্যমে ওই পাঁচটি ব্যাংকে বিনিয়োগ করা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ওই পাঁচটি ব্যাংকের বিনিয়োগের বিপরীতে কিছুই না পান, তাহলে সেটি পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরকার যেহেতু আমানতকারীদের অর্থের পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছে, সেহেতু অন্য শ্রেণির কথা বাদ দিলেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।
নতুন ‘টিক সাইজ’ চালু
চলতি বছর ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন বা বন্ধের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে ৮টি। ওই ৮টি প্রতিষ্ঠানে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শেয়ারের মালিকানা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দখলে রয়েছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও এগুলোর অবসায়নের আলোচনা চলছে বছরের শুরু থেকেই। ফলে শেয়ারগুলোর দাম কমতে কমতে টাকার শেয়ার পয়সায় নেমে যায়।
পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এ বছরই কোনো শেয়ার ১ টাকার নিচে নেমেছে। এতে লেনদেন প্রক্রিয়ায় বিঘ্নও ঘটেছে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে। কেননা, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ১ টাকার উপরের সব ধরনের ইক্যুইটি সিকিউরিটিজের ‘টিক সাইজ’ ১০ পয়সা নির্ধারিত রয়েছে। অন্যদিকে, সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমা রয়েছে ১০ শতাংশ। ৯০ পয়সা দরের শেয়ারে ১০ শতাংশ পরিবর্তন মানে ৯ পয়সা। কিন্তু ‘টিক সাইজ’ যেহেতু ১০ পয়সা, তাই ৯ পয়সা বাড়া বা কমার সুযোগ ছিল না।
তাছাড়া, ১০ পয়সা বাড়িয়ে শেয়ারদর ১ টাকা বা ১০ পয়সা কমিয়ে ৮০ পয়সা করাও সম্ভব নয়– তাহলে সার্কিট ব্রেকারের লিমিট ভাঙবে, নিয়মের লঙ্ঘন হবে। ফলে স্টক এক্সচেঞ্জ ১ টাকার নিচে লেনদেন হওয়া শেয়ারের জন্য নতু ‘টিক সাইজ’ নির্ধারণ করেছে। এখন এক টাকার নিচে নেমে যাওয়া শেয়ারের লেনদেন ৮৯, ৮৮, ৮৭, ৮৬, ৮৫ পয়সা– এ ধরনের সূক্ষ্ম দরেও অর্ডার দেয়া যাচ্ছে।

গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দেশে পরিবর্তনের আবহ তৈরি হয়। শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা ভেবেছিলেন, বহুদিন ধরে যে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছিল সেগুলো এবার হবে। আর তাতে বাজারে জবাবদিহিতা বাড়বে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিমত্তা বাড়বে, বাজার হবে আরো ন্যায্য ও স্বচ্ছ। অর্থাৎ দেশের শেয়ারবাজারে ২০২৫ সাল শুরু হয়েছিল আশাবাদের উজ্জ্বল বার্তা নিয়ে।
কিন্তু বছর গড়াতেই সেই আশার জায়গাটি পরিণত হয় অনিশ্চয়তা, সংকট আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হতাশায়।
পুরো বছরজুড়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে কোনো কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) আবেদন জমা পড়েনি। শুধু আইপিও নয়, পুরো বছরজুড়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) কোনো কোম্পানিও কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর অফারের (কিউআইও) মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে আগ্রহ দেখায়নি।
এছাড়া, বছরজুড়ে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি বিনিয়োগকারী, স্থানীয় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিমা কোম্পানির বিনিয়োগের সুযোগও ছিল খুবই নগণ্য। কেননা, বছরটিতে করপোরেট বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডের অনুমোদন মিলেছে হাতে গোনা কয়েকটি।
বাস্তবে কিছু সংস্কারের দেখা মিলেছে। বিশেষ করে মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও মার্জিন ঋণের নতুন নিয়ম করা হয়েছে। নগদ লভ্যাংশ দেয়ার পদ্ধতি সহজ করা হয়েছে। বিও হিসাবের বার্ষিক ফি কমানো হয়েছে।
এছাড়া বাজারে অনিয়মের অভিযোগে আগে যাদের ধরা যেত না, তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু সংস্কারের শুরুটা সুখকর ছিল না। জোর করে শেয়ার বিক্রি, বিনিয়োগ কমে যাওয়া ও শেয়ারের দর পড়তে থাকায় অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়েন।
সংস্কারের নামে ব্যাংক একীভূতকরণ, লোকসানি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন এবং কঠোর নীতিমালার প্রভাব সরাসরি এসে পড়ে শেয়ারবাজারে। এসব সিদ্ধান্তের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে মূলত ক্ষুদ্র ও মধ্যম বিনিয়োগকারীদেরই। বছরের শেষ প্রান্তে এসে অসংখ্য বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিও ক্ষতবিক্ষত, আস্থা ভঙ্গুর এবং বাজারে অংশগ্রহণের আগ্রহ তলানিতে।
অর্থবছর জুড়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ছিল চরম অস্থিরতায়। বছরের শুরুতে সূচক যেখানে ৫ হাজার ২০০ পয়েন্টের ওপরে অবস্থান করছিল, সেখানে ব্যাংক একীভূতকরণ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের ঘোষণা আসার পর তা দ্রুত ৫ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে যায়। বাজারের এই টানা দরপতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে তোলে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ)-এর প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলামের মতে, সংস্কারের প্রাথমিক ধাক্কা সবসময়ই কষ্টকর হয়। তিনি বলেন, বাজার এখনো সেই কঠিন সময় অতিক্রম করছে। তবে মার্জিন ঋণের নতুন নিয়মের কারণে ‘ফোর্সড সেল’ বা বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রির চাপ বাজারকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলেছে, যা দরপতনকে ত্বরান্বিত করেছে।
সংস্কার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের অনুভূতি ছিল মিশ্র। অনেকেই মনে করেন, বাজারের পুরনো দুর্বলতাগুলো আগে ঠিক করা দরকার ছিল। তবে সংস্কার কত দ্রুত হবে ও এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত কার ওপর বর্তাবে এই অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের দ্বিধায় ফেলেছিল।
সর্বসাধারণের বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত আইপিও বন্ধ থাকায় পুরো বছরজুড়ে পুঁজিবাজারে অস্থিরতা বিরাজমান ছিল। সূচক ও লেনদেন তলানিতে নামার পাশাপাশি, বিনিয়োগকারীদের বাজার ছেড়ে যাওয়ার সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য হারে। বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখতে বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও হিসাব) রক্ষণাবেক্ষণের ফি বা মাশুল এক-তৃতীয়াংশে নামানো হলেও বাজার ছেড়ে যাওয়ার গতি থামানো যায়নি। শুধু বিনিয়োগকারী নয়, বছরটিতে পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মূল অফিসের পাশাপাশি শাখা অফিস মিলিয়ে শতাধিক সিকিউরিটিজ লেনদেনের অফিস বন্ধ হয়েছে।
বছর জুড়ে পুঁজির জোগান প্রায় শূন্য
পুঁজিবাজারে সর্বশেষ পুঁজি সংগ্রহ করতে আইপিও নিয়ে হাজির হয়েছিল টেকনো ড্রাগস লিমিটেড। ২০২৪ সালের প্রথমার্ধেই কোম্পানিটি বাজার থেকে ১০০ কোটি টাকা তুলে নেয়। এরপর পুঁজিবাজারে আর কোনো কোম্পানির আইপিও অনুমোদন হয়নি। ওই বছর কেবল একটি আইপিও বাজারে এসেছিল। তবে, বছরটিতে আরো একটি কিউআইও অনুমোদন হয়েছিল। স্বল্প মূলধনের কোম্পানি ক্রাফটসম্যান ফুটওয়ার অ্যান্ড অ্যাক্সেসরিজ লিমিটেড কিউআইও প্রস্তাবের মাধ্যমে ৫ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করেছিল।
দুঃখজনক হলেও চলতি বছরে একটি আইপিও কিংবা কিউআইও প্রস্তাবের অনুমোদন দিতে পারেনি বিএসইসি। কয়েকটি প্রস্তাব জমা পড়লেও তা বাতিল করে দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। আর এখন আইপিও নীতিমালা সংস্কারের কথা বলে কোম্পানিগুলোর থেকে প্রস্তাব আহ্বানও বন্ধ রয়েছে। সংস্থার কাছে বর্তমানে একটিও প্রস্তাব জমা নেই। ফলে বছরের বাকি দিনগুলোতে কোনো আইপিও কিংবা কিউআইও অনুমোদনের সুযোগ নেই।
বন্ড ও ফান্ডের অনুমোদনও কমেছে
গত বছর বিএসইসির অনুমোদন সাপেক্ষে পুঁজিবাজার থেকে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ১১টি প্রতিষ্ঠান ১৬ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছিল। এর মধ্যে ছয়টি ব্যাংক ও পাঁচটি উৎপাদন খাতের কোম্পানি ছিল। চলতি বছর শুধু ছয়টি ব্যাংককে ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, চলতি বছর মাত্র একটি বে-মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার অর্থ সংগ্রহের সীমা নির্ধারণ করা হয় ২৫ কোটি টাকা। গত বছর চারটি ফান্ড ইস্যুর মাধ্যমে ১২৫ কোটি টাকা উত্তোলনের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল।
বন্ড ও ফান্ডের অনুমোদন কমায় চলতি বছর পুঁজিবাজারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি বিনিয়োগকারী, স্থানীয় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিমা কোম্পানির বিনিয়োগের সুযোগ কমেছে। তবে, চলতি বছর রাইট শেয়ারের অনুমোদন বাড়িয়েছে বিএসইসি। বছরটিতে দুটি কোম্পানির ৩২৮ কোটি টাকার রাইট শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগের বছরে মাত্র ৯৩ কোটি টাকার রাইট শেয়ার ইস্যুর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল।
সূচক ও লেনদেন নেমেছে তলানিতে
চলতি বছরের শুরু থেকে গত ২৪ ডিসেম্বর (বুধবার) পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫ হাজার ২১৮ পয়েন্ট থেকে কমে ৪ হাজার ৮৮৩ পয়েন্টে নেমেছে। অবশ্য, ২০২৪ সালে সূচক ১০৩০ পয়েন্ট কমেছিল। এছাড়া, চলতি বছরের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক্সচেঞ্জটির শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ১ হাজার ০৮ পয়েন্টে এবং বাছাই করা শেয়ার নিয়ে গঠিত ডিএস ৩০ সূচক ১৮৮২ পয়েন্টে নেমেছে। অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই বছরের শুরু থেকে ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯১২ পয়েন্ট কমে ১৩ হাজার ৫৬১ পয়েন্টে নেমেছে।
এদিকে, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ডিএসইতে গড়ে প্রতিদিন লেনদেন হয়েছে মাত্র ৪৪০ কোটি টাকা। গত বছর এক্সচেঞ্জটিতে প্রতিদিন গড়ে ৬৩১ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে ডিএসইর গড় লেনদেন কমেছে ১৯১ কোটি টাকা। আর সিএসইতে গত নভেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরে প্রতিদিন গড়ে ১৭ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। আগের বছরে গড় লেনদেন হয়েছিল ২৯ কোটি টাকা।
নিষ্ক্রিয় ৬৬ হাজার বিনিয়োগকারী
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে গত ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুঁজিবাজারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৬৫ হাজার ৯৬২টি বিও হিসাবধারী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সরাসরি বিও হিসাব বন্ধ হওয়ায় বাজার ছেড়েছেন ৪৩ হাজার ২৮৩ জন বিনিয়োগকারী। এছাড়া ২২ হাজার ৬৭৯ জন বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব শেয়ার শূন্য হয়েছে আলোচিত সময়ে।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ ডিসেম্বর শেষে পুঁজিবাজারে মোট বিও হিসাবের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ১৬৯টি। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর যা ছিল ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৪৫২টি। আর গত ১৮ নভেম্বর শেষে শেয়ারশূন্য বিও হিসাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫৩টি। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৯৭৪টি।
বন্ধ হচ্ছে ব্রোকারেজ হাউজের শাখা ও মূল অফিস
বিও হিসাবধারীদের লেনদেন সুবিধা দিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে নিবন্ধিত ট্রেক সনদ নিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যভুক্ত হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে ব্রোকারেজ হাউজগুলো। এখন পর্যন্ত স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেক হোল্ডার হিসেবে ব্যবসা শুরু করেছে ৩০৭টি ব্রোকারেজ হাউজ।
এর মধ্যে গ্রাহক হিসাবে ঘাটতি থাকাসহ বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৫টি ব্রোকারেজ হাউজের কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। সচল থাকা বাকি ৩০২টি ব্রোকারেজ হাউজের মূল অফিস ও শাখা অফিসের সংখ্যা প্রায় ১৫০০টি। এর মধ্যে অনেকেই বাজারে লেনদেন কম থাকায় লোকসান এড়াতে শাখা অফিস বন্ধ রাখার পাশাপাশি মূল অফিসের কার্যক্রমও কৌশলে বন্ধ রাখছে।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মূল অফিস ও শাখা অফিসের অধিকাংশই রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রাম অঞ্চলে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সবশেষ তথ্য পর্যন্ত ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মূল অফিস ও শাখা অফিস বন্ধ হয়েছে অন্তত ১১৭টি। বাজারে লেনদেন কম হওয়া, সনদ নবায়ন না হওয়া এবং অফিস সংস্কারের কথা জানিয়ে বন্ধ রাখা হচ্ছে এসব হাউজ। এর মধ্যে বিকল্প লেনদেন অফিস না থাকায় কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজের হিসাবধারী এখন শেয়ার লেনদেনও করতে পারছে না।
ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়া
চলতি বছর পুঁজিবাজার থেকে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক তালিকাচ্যুত করা হয়েছে। অথচ, ওই ব্যাংকগুলোতে উদ্যোক্তা-পরিচালক এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর বাইরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বড়ো অংশের মালিকানা ছিল। তালিকাচ্যুত পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে এক ব্যাংক গঠনের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের অর্থের পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছে সরকার। কিন্তু, পুঁজিবাজারের মাধ্যমে ওই পাঁচটি ব্যাংকে বিনিয়োগ করা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ওই পাঁচটি ব্যাংকের বিনিয়োগের বিপরীতে কিছুই না পান, তাহলে সেটি পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরকার যেহেতু আমানতকারীদের অর্থের পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছে, সেহেতু অন্য শ্রেণির কথা বাদ দিলেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।
নতুন ‘টিক সাইজ’ চালু
চলতি বছর ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন বা বন্ধের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে ৮টি। ওই ৮টি প্রতিষ্ঠানে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শেয়ারের মালিকানা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দখলে রয়েছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও এগুলোর অবসায়নের আলোচনা চলছে বছরের শুরু থেকেই। ফলে শেয়ারগুলোর দাম কমতে কমতে টাকার শেয়ার পয়সায় নেমে যায়।
পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এ বছরই কোনো শেয়ার ১ টাকার নিচে নেমেছে। এতে লেনদেন প্রক্রিয়ায় বিঘ্নও ঘটেছে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে। কেননা, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ১ টাকার উপরের সব ধরনের ইক্যুইটি সিকিউরিটিজের ‘টিক সাইজ’ ১০ পয়সা নির্ধারিত রয়েছে। অন্যদিকে, সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমা রয়েছে ১০ শতাংশ। ৯০ পয়সা দরের শেয়ারে ১০ শতাংশ পরিবর্তন মানে ৯ পয়সা। কিন্তু ‘টিক সাইজ’ যেহেতু ১০ পয়সা, তাই ৯ পয়সা বাড়া বা কমার সুযোগ ছিল না।
তাছাড়া, ১০ পয়সা বাড়িয়ে শেয়ারদর ১ টাকা বা ১০ পয়সা কমিয়ে ৮০ পয়সা করাও সম্ভব নয়– তাহলে সার্কিট ব্রেকারের লিমিট ভাঙবে, নিয়মের লঙ্ঘন হবে। ফলে স্টক এক্সচেঞ্জ ১ টাকার নিচে লেনদেন হওয়া শেয়ারের জন্য নতু ‘টিক সাইজ’ নির্ধারণ করেছে। এখন এক টাকার নিচে নেমে যাওয়া শেয়ারের লেনদেন ৮৯, ৮৮, ৮৭, ৮৬, ৮৫ পয়সা– এ ধরনের সূক্ষ্ম দরেও অর্ডার দেয়া যাচ্ছে।

সংকট আর হতাশায় বিনিয়োগকারীদের বছর পার
মরিয়ম সেঁজুতি

গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দেশে পরিবর্তনের আবহ তৈরি হয়। শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা ভেবেছিলেন, বহুদিন ধরে যে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছিল সেগুলো এবার হবে। আর তাতে বাজারে জবাবদিহিতা বাড়বে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিমত্তা বাড়বে, বাজার হবে আরো ন্যায্য ও স্বচ্ছ। অর্থাৎ দেশের শেয়ারবাজারে ২০২৫ সাল শুরু হয়েছিল আশাবাদের উজ্জ্বল বার্তা নিয়ে।
কিন্তু বছর গড়াতেই সেই আশার জায়গাটি পরিণত হয় অনিশ্চয়তা, সংকট আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হতাশায়।
পুরো বছরজুড়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে কোনো কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) আবেদন জমা পড়েনি। শুধু আইপিও নয়, পুরো বছরজুড়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) কোনো কোম্পানিও কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর অফারের (কিউআইও) মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে আগ্রহ দেখায়নি।
এছাড়া, বছরজুড়ে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি বিনিয়োগকারী, স্থানীয় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিমা কোম্পানির বিনিয়োগের সুযোগও ছিল খুবই নগণ্য। কেননা, বছরটিতে করপোরেট বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডের অনুমোদন মিলেছে হাতে গোনা কয়েকটি।
বাস্তবে কিছু সংস্কারের দেখা মিলেছে। বিশেষ করে মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও মার্জিন ঋণের নতুন নিয়ম করা হয়েছে। নগদ লভ্যাংশ দেয়ার পদ্ধতি সহজ করা হয়েছে। বিও হিসাবের বার্ষিক ফি কমানো হয়েছে।
এছাড়া বাজারে অনিয়মের অভিযোগে আগে যাদের ধরা যেত না, তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু সংস্কারের শুরুটা সুখকর ছিল না। জোর করে শেয়ার বিক্রি, বিনিয়োগ কমে যাওয়া ও শেয়ারের দর পড়তে থাকায় অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়েন।
সংস্কারের নামে ব্যাংক একীভূতকরণ, লোকসানি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন এবং কঠোর নীতিমালার প্রভাব সরাসরি এসে পড়ে শেয়ারবাজারে। এসব সিদ্ধান্তের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে মূলত ক্ষুদ্র ও মধ্যম বিনিয়োগকারীদেরই। বছরের শেষ প্রান্তে এসে অসংখ্য বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিও ক্ষতবিক্ষত, আস্থা ভঙ্গুর এবং বাজারে অংশগ্রহণের আগ্রহ তলানিতে।
অর্থবছর জুড়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ছিল চরম অস্থিরতায়। বছরের শুরুতে সূচক যেখানে ৫ হাজার ২০০ পয়েন্টের ওপরে অবস্থান করছিল, সেখানে ব্যাংক একীভূতকরণ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের ঘোষণা আসার পর তা দ্রুত ৫ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে যায়। বাজারের এই টানা দরপতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে তোলে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ)-এর প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলামের মতে, সংস্কারের প্রাথমিক ধাক্কা সবসময়ই কষ্টকর হয়। তিনি বলেন, বাজার এখনো সেই কঠিন সময় অতিক্রম করছে। তবে মার্জিন ঋণের নতুন নিয়মের কারণে ‘ফোর্সড সেল’ বা বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রির চাপ বাজারকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলেছে, যা দরপতনকে ত্বরান্বিত করেছে।
সংস্কার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের অনুভূতি ছিল মিশ্র। অনেকেই মনে করেন, বাজারের পুরনো দুর্বলতাগুলো আগে ঠিক করা দরকার ছিল। তবে সংস্কার কত দ্রুত হবে ও এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত কার ওপর বর্তাবে এই অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের দ্বিধায় ফেলেছিল।
সর্বসাধারণের বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত আইপিও বন্ধ থাকায় পুরো বছরজুড়ে পুঁজিবাজারে অস্থিরতা বিরাজমান ছিল। সূচক ও লেনদেন তলানিতে নামার পাশাপাশি, বিনিয়োগকারীদের বাজার ছেড়ে যাওয়ার সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য হারে। বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখতে বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও হিসাব) রক্ষণাবেক্ষণের ফি বা মাশুল এক-তৃতীয়াংশে নামানো হলেও বাজার ছেড়ে যাওয়ার গতি থামানো যায়নি। শুধু বিনিয়োগকারী নয়, বছরটিতে পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মূল অফিসের পাশাপাশি শাখা অফিস মিলিয়ে শতাধিক সিকিউরিটিজ লেনদেনের অফিস বন্ধ হয়েছে।
বছর জুড়ে পুঁজির জোগান প্রায় শূন্য
পুঁজিবাজারে সর্বশেষ পুঁজি সংগ্রহ করতে আইপিও নিয়ে হাজির হয়েছিল টেকনো ড্রাগস লিমিটেড। ২০২৪ সালের প্রথমার্ধেই কোম্পানিটি বাজার থেকে ১০০ কোটি টাকা তুলে নেয়। এরপর পুঁজিবাজারে আর কোনো কোম্পানির আইপিও অনুমোদন হয়নি। ওই বছর কেবল একটি আইপিও বাজারে এসেছিল। তবে, বছরটিতে আরো একটি কিউআইও অনুমোদন হয়েছিল। স্বল্প মূলধনের কোম্পানি ক্রাফটসম্যান ফুটওয়ার অ্যান্ড অ্যাক্সেসরিজ লিমিটেড কিউআইও প্রস্তাবের মাধ্যমে ৫ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করেছিল।
দুঃখজনক হলেও চলতি বছরে একটি আইপিও কিংবা কিউআইও প্রস্তাবের অনুমোদন দিতে পারেনি বিএসইসি। কয়েকটি প্রস্তাব জমা পড়লেও তা বাতিল করে দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। আর এখন আইপিও নীতিমালা সংস্কারের কথা বলে কোম্পানিগুলোর থেকে প্রস্তাব আহ্বানও বন্ধ রয়েছে। সংস্থার কাছে বর্তমানে একটিও প্রস্তাব জমা নেই। ফলে বছরের বাকি দিনগুলোতে কোনো আইপিও কিংবা কিউআইও অনুমোদনের সুযোগ নেই।
বন্ড ও ফান্ডের অনুমোদনও কমেছে
গত বছর বিএসইসির অনুমোদন সাপেক্ষে পুঁজিবাজার থেকে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ১১টি প্রতিষ্ঠান ১৬ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছিল। এর মধ্যে ছয়টি ব্যাংক ও পাঁচটি উৎপাদন খাতের কোম্পানি ছিল। চলতি বছর শুধু ছয়টি ব্যাংককে ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, চলতি বছর মাত্র একটি বে-মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার অর্থ সংগ্রহের সীমা নির্ধারণ করা হয় ২৫ কোটি টাকা। গত বছর চারটি ফান্ড ইস্যুর মাধ্যমে ১২৫ কোটি টাকা উত্তোলনের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল।
বন্ড ও ফান্ডের অনুমোদন কমায় চলতি বছর পুঁজিবাজারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি বিনিয়োগকারী, স্থানীয় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিমা কোম্পানির বিনিয়োগের সুযোগ কমেছে। তবে, চলতি বছর রাইট শেয়ারের অনুমোদন বাড়িয়েছে বিএসইসি। বছরটিতে দুটি কোম্পানির ৩২৮ কোটি টাকার রাইট শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগের বছরে মাত্র ৯৩ কোটি টাকার রাইট শেয়ার ইস্যুর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল।
সূচক ও লেনদেন নেমেছে তলানিতে
চলতি বছরের শুরু থেকে গত ২৪ ডিসেম্বর (বুধবার) পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫ হাজার ২১৮ পয়েন্ট থেকে কমে ৪ হাজার ৮৮৩ পয়েন্টে নেমেছে। অবশ্য, ২০২৪ সালে সূচক ১০৩০ পয়েন্ট কমেছিল। এছাড়া, চলতি বছরের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক্সচেঞ্জটির শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ১ হাজার ০৮ পয়েন্টে এবং বাছাই করা শেয়ার নিয়ে গঠিত ডিএস ৩০ সূচক ১৮৮২ পয়েন্টে নেমেছে। অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই বছরের শুরু থেকে ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯১২ পয়েন্ট কমে ১৩ হাজার ৫৬১ পয়েন্টে নেমেছে।
এদিকে, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ডিএসইতে গড়ে প্রতিদিন লেনদেন হয়েছে মাত্র ৪৪০ কোটি টাকা। গত বছর এক্সচেঞ্জটিতে প্রতিদিন গড়ে ৬৩১ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে ডিএসইর গড় লেনদেন কমেছে ১৯১ কোটি টাকা। আর সিএসইতে গত নভেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরে প্রতিদিন গড়ে ১৭ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। আগের বছরে গড় লেনদেন হয়েছিল ২৯ কোটি টাকা।
নিষ্ক্রিয় ৬৬ হাজার বিনিয়োগকারী
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে গত ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুঁজিবাজারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৬৫ হাজার ৯৬২টি বিও হিসাবধারী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সরাসরি বিও হিসাব বন্ধ হওয়ায় বাজার ছেড়েছেন ৪৩ হাজার ২৮৩ জন বিনিয়োগকারী। এছাড়া ২২ হাজার ৬৭৯ জন বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব শেয়ার শূন্য হয়েছে আলোচিত সময়ে।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ ডিসেম্বর শেষে পুঁজিবাজারে মোট বিও হিসাবের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ১৬৯টি। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর যা ছিল ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৪৫২টি। আর গত ১৮ নভেম্বর শেষে শেয়ারশূন্য বিও হিসাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫৩টি। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৯৭৪টি।
বন্ধ হচ্ছে ব্রোকারেজ হাউজের শাখা ও মূল অফিস
বিও হিসাবধারীদের লেনদেন সুবিধা দিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে নিবন্ধিত ট্রেক সনদ নিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যভুক্ত হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে ব্রোকারেজ হাউজগুলো। এখন পর্যন্ত স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেক হোল্ডার হিসেবে ব্যবসা শুরু করেছে ৩০৭টি ব্রোকারেজ হাউজ।
এর মধ্যে গ্রাহক হিসাবে ঘাটতি থাকাসহ বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৫টি ব্রোকারেজ হাউজের কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। সচল থাকা বাকি ৩০২টি ব্রোকারেজ হাউজের মূল অফিস ও শাখা অফিসের সংখ্যা প্রায় ১৫০০টি। এর মধ্যে অনেকেই বাজারে লেনদেন কম থাকায় লোকসান এড়াতে শাখা অফিস বন্ধ রাখার পাশাপাশি মূল অফিসের কার্যক্রমও কৌশলে বন্ধ রাখছে।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মূল অফিস ও শাখা অফিসের অধিকাংশই রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রাম অঞ্চলে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সবশেষ তথ্য পর্যন্ত ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মূল অফিস ও শাখা অফিস বন্ধ হয়েছে অন্তত ১১৭টি। বাজারে লেনদেন কম হওয়া, সনদ নবায়ন না হওয়া এবং অফিস সংস্কারের কথা জানিয়ে বন্ধ রাখা হচ্ছে এসব হাউজ। এর মধ্যে বিকল্প লেনদেন অফিস না থাকায় কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজের হিসাবধারী এখন শেয়ার লেনদেনও করতে পারছে না।
ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়া
চলতি বছর পুঁজিবাজার থেকে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক তালিকাচ্যুত করা হয়েছে। অথচ, ওই ব্যাংকগুলোতে উদ্যোক্তা-পরিচালক এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর বাইরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বড়ো অংশের মালিকানা ছিল। তালিকাচ্যুত পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে এক ব্যাংক গঠনের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের অর্থের পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছে সরকার। কিন্তু, পুঁজিবাজারের মাধ্যমে ওই পাঁচটি ব্যাংকে বিনিয়োগ করা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ওই পাঁচটি ব্যাংকের বিনিয়োগের বিপরীতে কিছুই না পান, তাহলে সেটি পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরকার যেহেতু আমানতকারীদের অর্থের পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছে, সেহেতু অন্য শ্রেণির কথা বাদ দিলেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।
নতুন ‘টিক সাইজ’ চালু
চলতি বছর ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন বা বন্ধের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে ৮টি। ওই ৮টি প্রতিষ্ঠানে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শেয়ারের মালিকানা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দখলে রয়েছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও এগুলোর অবসায়নের আলোচনা চলছে বছরের শুরু থেকেই। ফলে শেয়ারগুলোর দাম কমতে কমতে টাকার শেয়ার পয়সায় নেমে যায়।
পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এ বছরই কোনো শেয়ার ১ টাকার নিচে নেমেছে। এতে লেনদেন প্রক্রিয়ায় বিঘ্নও ঘটেছে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে। কেননা, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ১ টাকার উপরের সব ধরনের ইক্যুইটি সিকিউরিটিজের ‘টিক সাইজ’ ১০ পয়সা নির্ধারিত রয়েছে। অন্যদিকে, সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমা রয়েছে ১০ শতাংশ। ৯০ পয়সা দরের শেয়ারে ১০ শতাংশ পরিবর্তন মানে ৯ পয়সা। কিন্তু ‘টিক সাইজ’ যেহেতু ১০ পয়সা, তাই ৯ পয়সা বাড়া বা কমার সুযোগ ছিল না।
তাছাড়া, ১০ পয়সা বাড়িয়ে শেয়ারদর ১ টাকা বা ১০ পয়সা কমিয়ে ৮০ পয়সা করাও সম্ভব নয়– তাহলে সার্কিট ব্রেকারের লিমিট ভাঙবে, নিয়মের লঙ্ঘন হবে। ফলে স্টক এক্সচেঞ্জ ১ টাকার নিচে লেনদেন হওয়া শেয়ারের জন্য নতু ‘টিক সাইজ’ নির্ধারণ করেছে। এখন এক টাকার নিচে নেমে যাওয়া শেয়ারের লেনদেন ৮৯, ৮৮, ৮৭, ৮৬, ৮৫ পয়সা– এ ধরনের সূক্ষ্ম দরেও অর্ডার দেয়া যাচ্ছে।




