শিরোনাম

লিয়াংশানের ই বার্ণিশ: পাহাড়ের রঙে লেখা এক সংস্কৃতি

সিটিজেন-ডেস্ক­
লিয়াংশানের ই বার্ণিশ: পাহাড়ের রঙে লেখা এক সংস্কৃতি

চীনের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের সিছুয়ান প্রদেশের লিয়াংশান পাহাড়ে গেলে চোখে পড়বে কালো, লাল আর হলুদের এক অনন্য নীরব ভাষা। কাঠের পাত্রে আঁকা এই রঙিন নকশাগুলো শুধু শৈল্পিক সৌন্দর্যের নিদর্শন নয়, এগুলো বহন করে ই জাতির হাজার বছরের ইতিহাস, বিশ্বাস আর জীবনচর্চা।

এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু– লিয়াংশান ই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের সিদে জেলা, যা পরিচিত ‘ই বার্ণিশের বাসনপত্রের আদি থানা’ নামে।

চীনের ষষ্ঠ বৃহত্তম সংখ্যালঘু জাতি 'ই জনগোষ্ঠী' প্রাচীনকাল থেকেই কাঠের সাধারণ পাত্র বানিয়ে সেগুলোতে কালো বার্ণিশ লাগাত। ধীরে ধীরে সেই শিল্পে যুক্ত হয় কাঁচা বার্ণিশ, সিঁদুর, অলঙ্কারসহ প্রাকৃতিক উপাদান। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উন্নত হতে হতে ই বার্ণিশ আজ রূপ নিয়েছে এক সূক্ষ্ম, পরিমার্জিত শিল্পরূপে। এই ঐতিহ্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালে ই বার্ণিশকে চীনের জাতীয় অস্পষ্ট সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

bigStoryContent

শ্রম, ধৈর্য আর প্রকৃতির মেলবন্ধন

একটি ই বার্ণিশের পাত্র তৈরিতে পেরোতে হয় কয়েক ডজন ধাপ। কাঁচা বার্ণিশ সংগ্রহ থেকে শুরু করে কাঠ বাছাই, পাত্রের দেহ গঠন, নকশা আঁকা এবং স্তরে স্তরে বার্ণিশ করা– সবকিছুই সময়সাপেক্ষ ও নিখুঁত দক্ষতার দাবি রাখে।

মূলত বার্চ ও আজেলিয়া কাঠ ব্যবহার করা হয়, আর রঙের উৎস ল্যাকোয়ার গাছের শ্লেষ্মা ও খনিজ অলঙ্কার। ফলে এই পাত্রগুলো শুধু সুন্দরই নয়—অ্যাসিড, তাপ ও ফাটল প্রতিরোধীও।

রঙে লেখা ই জাতির আত্মা

ই বার্ণিশের প্রধান তিন রঙ—কালো, লাল ও হলুদ। কালো গাম্ভীর্য ও মহিমার প্রতীক, লাল আবেগ ও সাহসের, আর হলুদ আলো ও ভবিষ্যতের।

এই রঙগুলো শুধু পাত্রেই নয়, ই জনগণের পোশাক ও দৈনন্দিন জীবনেও প্রবলভাবে উপস্থিত। নকশায় দেখা যায় সূর্য, চাঁদ, তারা, পর্বত, নদী, পশুপাখি, উদ্ভিদ ও আদিম টোটেমের প্রতিচ্ছবি। বিমূর্ত রূপান্তর, প্রতিসাম্য ও সূক্ষ্ম রেখার ব্যবহার ই শিল্পের স্বাক্ষর।

জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা শিল্প

bigStoryContent

ই বার্ণিশের পাত্র শুধু সংগ্রহশালার বস্তু নয়। টেবিলওয়্যার, মদের পাত্র, চা সেট, ঘরের সাজসজ্জা– ই জাতির জীবনের প্রায় প্রতিটি অধ্যায়ে এই শিল্প জড়িয়ে আছে। নান্দনিকতা ও ব্যবহারিক মূল্য মিলিয়ে এটি আজ ই সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

পাহাড় ছেড়ে বিশ্বমঞ্চে

লিয়াংশানের পাহাড়ঘেরা গ্রামগুলো থেকে বেরিয়ে ই বার্ণিশের পাত্র পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের নানা দেশে। অনন্য নকশা, গভীর রঙ আর প্রাচীন ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে এই শিল্প ধীরে ধীরে বিশ্ববাজারে নিজের পরিচয় গড়ে তুলছে।

পাহাড়ের গভীরে জন্ম নেওয়া এই শিল্প আজ নতুন প্রাণশক্তিতে ভর করে জানিয়ে দিচ্ছে–রঙের ভেতরেও একটি জাতির ইতিহাস লেখা।