শিরোনাম

‘হ্যাঁ-না’ ভোটে সরকারি সিদ্ধান্তে বেঁকে বসলো কমিশন

নিজস্ব প্রতিবেদক
‘হ্যাঁ-না’ ভোটে সরকারি সিদ্ধান্তে বেঁকে বসলো কমিশন
গণভোট নিয়ে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা। ছবি: সংগৃহীত

সরকারি কর্মচারীরা গণভোটে কোনো পক্ষে প্রচার করতে পারবে না– নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এমন নির্দেশনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভিন্নমত সৃষ্টি হয়েছে।

এতদিন সব সরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের আহ্বান জানিয়ে এসেছেন। ডিসি, এডিসি, এসপি-ওসিসহ সব প্রশাসনিক কর্মকর্তা, এমনকী ইসির নিজস্ব অফিসগুলোতেও গণেভোটের ব্যানার দৃশ্যমান। সেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোটের স্থানে সবুজ রং দিয়ে ‘টিক’ চিহ্ন এবং ‘না’-এর ঘরে ‘লাল ক্রস’ দেওয়া রয়েছে।

তবে নির্বাচন কমিশন এটা করতে পারে কি না– সম্প্রতি সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে টনক নড়ে ইসির। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) কমিশন এক প্রজ্ঞাপনে বলেছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি গণভোট বিষয়ে জনগণকে অবহিত ও সচেতন করতে পারবেন। তবে তিনি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে বা ‘না’-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য জনগণকে কোনোভাবে আহ্বান জানাতে পারবেন না।

এদিন সব রিটার্নিং কর্মকর্তাকে দেওয়া চিঠিতে ইসি আরও বলেছে, এ ধরনের কার্যক্রম গণভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে, যা গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৮৬ অনুযায়ী একটি দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের এ বিধান অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সিটিজেন জার্নালকে বলেন, গণভোট অধ্যাদেশের ২১ নম্বর ক্যাটাগরিতে বলা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো পক্ষ অবলম্বন করতে পারবেন না, কোনো প্রচার-প্রচারণার সুযোগ নেই। শুধু এ বিষয়টি আমরা স্পষ্ট করে দিয়েছি।

নির্বাচনকালীন সময় অর্থাৎ তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের পরের ৪৮ ঘণ্টা সরকারে সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ইসির অধীনে চলে আসেন। তাই ইসির নির্দেশনা পাওয়ায় পর ডিএম-ডিসি থেকে শুরু করে নিম্নস্তরের যত কর্মচারী প্রজাতন্ত্রের হয়ে কাজ করেন তারা সবাই ‘গণভোট কেন, কী’– এ বিষয়ে ভোটারদের অবহিত করতে পারবেন। তবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে প্রচার করলে তা শাস্তিযোগ্য বা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে বলে স্পষ্টত জানিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সিটিজেন জার্নালকে বলেন, গণভোট অধ্যাদেশের ২১ নম্বর ক্যাটাগরিতে বলা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো পক্ষ অবলম্বন করতে পারবেন না, কোনো প্রচার-প্রচারণার সুযোগ নেই। শুধু এ বিষয়টি আমরা স্পষ্ট করে দিয়েছি।

তিনি বলেন, গণভোট বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানুষকে অবহিত করতে পারবেন, সচেতন করতে পারবেন; কিন্তু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার বিষয়ে কোনো অবস্থান নিতে পারবেন না।

ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, এটা পরিষ্কার যে, সরকারি কর্মচারীরা বর্তমানে ইসির অধীনে চলে এসেছে। তাদের বদলি থেকে প্রমোশন– ইত্যাদি ইসির নিয়ন্ত্রণে বা অনুমতি সাপেক্ষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় করতে পারে। গণভোট যেহেতু একটা নির্বাচন, ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে, যা ইসির অধীনে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে, সে জন্য সরকারি কর্মচারীরা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে কাউকে প্ররোচিত করে ভোট চাইতে পারবেন না। তবে যেহেতু এটা সরকারের একটা সংস্কারের বিষয় তাই কর্মকর্তা কর্মচারীরা এর ভালো-মন্দ দিক ভোটারদের কাছে অবহিত বা তাদেরকে সচেতন করতে পারবেন।

ইসির এ নির্দেশনা পাওয়ায় পর অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছে। আগামীকাল শনিবার ইসির এ নির্দেশনার বিরুদ্ধে আদালতের রিট করা হবে বলে জানা গেছে।

গণভোটের জন্য বরাদ্দ রাখা ১ হাজার ৭০ কোটি টাকার মধ্যে প্রচারের জন্য অধিকাংশ অর্থাৎ ১৪০ কোটি টাকা পেয়েছে ৬টি মন্ত্রণালয়। ইসি সূত্রে জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রালয়ের ডিও লেটারে বলা হয়েছে– প্রচারের জন্য এ টাকা ব্যয় করা হবে। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি কর্মচারীরা যদি প্রচার করতে না পারেন তাহলে এসব মন্ত্রণালয় কাদের নিয়ে প্রচারণা চালাবে?

ইসি সংস্কার কমিটির প্রধান ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সিটিজেন জার্নালকে বলেন, এটা সরকারি সিদ্ধান্ত যে গণভোটের মাধ্যমে সরকার দেশ ও সংবিধান সংস্কার করতে চায়। গণভোটের ব্যালটে সুনির্দিষ্ট করে মাত্র চারটি বিষয় লেখা থাকবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ভোটারদের সমর্থন আছে কি-না, সেই প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন ভোটাররা। তিনি বলেন, সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট, দফায় দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের পর গণভোটে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সরকার চায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হোক, তাহলে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হবে।

এদিকে গণভোটের জন্য বরাদ্দ রাখা ১ হাজার ৭০ কোটি টাকার মধ্যে প্রচারের জন্য অধিকাংশ অর্থাৎ ১৪০ কোটি টাকা পেয়েছে ৬টি মন্ত্রণালয়। ইসি সূত্রে জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রালয়ের ডিও লেটারে বলা হয়েছে– প্রচারের জন্য এ টাকা ব্যয় করা হবে। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি কর্মচারীরা যদি প্রচার করতে না পারেন তাহলে এসব মন্ত্রণালয় কাদের নিয়ে প্রচারণা চালাবে?

শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) তথ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, তারা টেলিভিশন ও রেডিওতে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের ভালো-মন্দ দিক অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার সুবিধা সম্পর্কে ভোটারদের অবহিত করছেন। এ মন্ত্রণালয় প্রচারের জন্য ইসি থেকে ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা নিয়েছে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৪৬ কোটি টাকা প্রচারের জন্য ব্যয় হিসেবে ইসির কাছ থেকে পেয়েছে। এ অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে– সিটিজেন জার্নালের পক্ষ থেকে এমন প্রশ্ন করা হয় ইসির বাজেট শাখার ডেপুটি সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলামকে। তিনি এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন এরইমধ্যে জানিয়েছেন, মসজিদ, মন্দির, গির্জাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা থেকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের ভালো দিক ও মন্দ দিক প্রচার করছেন। এ ছাড়া মাঠে-ময়দানেও ভোটারদের অবহিত করার কাজ চলছে।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৩০ লাখ ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা ইসির কাছে চেয়েছে।

ইসির সঙ্গে সরকারের কোনো বিশেষ মতদ্বৈততা ঘটতে পারে বলে মনে করেন না জেসমিন টুলি। তিনি বলেন, ইসি তো একটা স্বাধীন ইলেকট্ররাল বডি। তাদের নির্দেশ মানতে মন্ত্রণালয়গুলো বাধ্য এই সময়ে।

ইসির বাজেট শাখার ডেপুটি সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ডিও লেটার বা অনুমোদনসাপেক্ষে ইসির বরাদ্দ থেকে ৬টি মন্ত্রণালয়কে ১৪০ কোটি টাকা গণভোটের জন্য দেয়া হয়েছে। তারা কীভাবে প্রচার করবে তা বলেনি। তিনি জানান, কেন্দ্রে কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানোর জন্য ৭২ কোটি টাকা নিয়েছে এলজিইডি মন্ত্রণালয়।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিটির সদস্য ও সাবেক ইসির অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, সরকারি কোনো কর্মচারী কর্মকর্তা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিন– এমন প্রচার করতে পারবে না বলে ইসি একটি নির্দেশনা দিয়েছে। এটা গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫–এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২–এর অনুচ্ছেদ ৮৬ অনুযায়ী একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।

তিনি বলেন, এটা ঠিক যে এ নির্দেশনায় ফলে কিছুটা সমস্যায় পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের হাতিয়ার তো নিজস্ব কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। অথচ শুনছি ৫-৬টি মন্ত্রণালয় গণভোটের পক্ষে প্রচার করবে বলে ১৪০ কোটি টাকা নিয়েছে ইসির গণভোট বরাদ্দ থেকে। এখন তাহলে প্রশ্ন জাগে এই টাকা তারা কীভাবে খরচ করবে। কর্মচারীরা তো প্রচার করতে পারবেন না। সেটা ইসির খোঁজ নিয়ে দেখা উচিত। এর ফলে মন্ত্রণালয়গুলো যে কিছুটা সমস্যায় পড়েছে তা বলাই বাহুল্য।

তবে এ বিষয়ে ইসির সঙ্গে সরকারের কোনো বিশেষ মতদ্বৈততা ঘটতে পারে বলে মনে করেন না জেসমিন টুলি। তিনি বলেন, ইসি তো একটা স্বাধীন ইলেকট্ররাল বডি। তাদের নির্দেশ মানতে মন্ত্রণালয়গুলো বাধ্য এই সময়ে।

ইসি কেন সরাসরি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি না দিয়ে তাদের রিটানিং কর্মকর্তাদের চিঠি দিল– এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ইসি আসলে কী চাচ্ছে? তাদের ভোটের কাজে যারা জড়িত তাদের জন্য এ বার্তা, নাকি প্রজাতন্ত্রের সব কর্মচারীদের জন্য এ বার্তা তা তারা ভাল বলতে পারবেন। তবে স্পষ্ট এ নির্দেশনার ফলে বিভিন্ন প্রচারের জন্য অর্থ নেওয়া মন্ত্রণায়গুলো কীভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

উল্লেখ্য, সারাদেশে গণভোট নিয়ে প্রচারণা করছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রথমে সরকারের পক্ষ থেকে শুধু গণভোট নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে প্রচারণা শুরু হয়। পরে অবশ্য সেই অবস্থা থেকে সরে এসে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা শুরু করে।

সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস রেডিও-টেলিভিশনে প্রচারের জন্য একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন। সেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে দেশ এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে।

খোদ প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টা পরিষদ– সবাই যদি প্রচারের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন তাহলে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ইসির নির্দেশনা কতটা মানবে– তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

/এফসি/