পদে পদে আইন ভেঙে গুলশানে হচ্ছে শান্তার বাণিজ্যিক ভবন

পদে পদে আইন ভেঙে গুলশানে হচ্ছে শান্তার বাণিজ্যিক ভবন
সেলিনা আক্তার

দেশের সবচেয়ে অভিজাত ও নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক এলাকা রাজধানীর গুলশান। এই এলাকার এক নম্বর গোল চত্বরে গেলে দেখা মেলে টিন দিয়ে ঘেরা বিশাল জায়গা। এই অংশে সিনেমা হল নির্মাণের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বরাদ্দ দেওয়া তিনটি প্লটে এখন শান্তা হোল্ডিংসের বাণিজ্যিক ভবন তৈরির তোড়জোড় চলছে। যার প্লট নম্বর ৩৭, ৪১ ও ৪৩।
কিন্তু এসব প্লটে সিনেমা হলের কোনো চিহ্ন নেই। অথচ গত পাঁচ দশকে বিশেষ শর্তে দেওয়া এই জমিগুলোর ব্যবহারের ধরন কৌশলে আংশিক বদলে দেওয়া হয়েছে । বরাদ্দপত্রের শর্তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, নির্ধারিত উদ্দেশ্য ছাড়া অর্থাৎ সিনেমা হল তৈরি ছাড়া এই জমি অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
এদিকে, চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বাণীচিত্র লিমিটেডের পক্ষে পরিচালক ফ্লোরিন গনি রহমান ও জিয়া ইয়ামিন শান্তা হোল্ডিংসের নামে প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন। গণপূর্ত উপদেষ্টা ও রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে তারা শর্ত ভঙ্গ করে এসব প্লট বন্ধক দিয়ে ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা জানান। পাশাপাশি শান্তার সঙ্গে চুক্তি বাতিলের জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এরই মধ্যে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আর ঊর্ধ্বতন মহল মিলে শান্তা হোল্ডিংসকে বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নেওয়ার কাজটি হাতে নিয়েছে বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার দপ্তরে গেলে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেননি। পরে রাজউক চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বিস্তারিত লিখে পাঠানো হলে তা দেখেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। এরপর টানা তিন দিন ফোন করা হলে রিসিভ করেননি।
নথি ঘেঁটে দেখা যায়, বরাদ্দের পর থেকে দফায় দফায় ভঙ্গ করা হয়েছে আইন। নকশা পরিবর্তন, আম-মোক্তারনামা, সমঝোতার আড়ালে বরাদ্দের মূল উদ্দেশ্য আড়াল করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন নগর পরিকল্পনার আদর্শ মান ক্ষুণ্ন হয়েছে, অন্যদিকে সরকার হারিয়েছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

আম-মোক্তারনামা দিয়েই ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেয় শান্তা
আম-মোক্তারনামার ক্ষমতার ব্যবহার করেই প্লট বন্ধক রেখে ২০০ কোটি টাকার অধিক ঋণ নিয়েছে শান্তা হোল্ডিংস লিমিটেড– এমন অভিযোগ তুলে ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাজউকের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করেন বাণীচিত্র প্রতিষ্ঠান লিমিটেডের পরিচালক ফ্লোরিন গনি রহমান।
ওই আবেদনে বলা হয়, আম-মোক্তারনামার শর্ত সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে বরাদ্দগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের কোনো পূর্বানুমতি ছাড়াই ১৪, ৩৭, ৪১ ও ৪৩ নম্বর প্লট বন্ধক রাখে শান্তা হোল্ডিংস। অথচ চুক্তি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ঋণের সীমা নির্ধারিত ছিল ১০০ কোটি টাকা, কিন্তু সেই সীমা অমান্য করে দ্বিগুণেরও বেশি অর্থ ঋণ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া প্লটগুলোর প্রকৃত দখল গ্রহণ কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি ছাড়াই আম-মোক্তারনামার ক্ষমতার অপব্যবহার করে এসব ঋণ ও আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করা হয়েছে। এই বিষয়ে বানীচিত্র একাধিকবার ঋণসংক্রান্ত তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাইলেও শান্তা হোল্ডিংস সেসব গোপন রাখে। বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে পাঠানো নোটিশেরও কোনো জবাব দেয়নি শান্তা হোল্ডিংস। ফলে পুরো বিষয়টি বরাদ্দগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক ও আইনি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জানতে চাইলে বাণীচিত্র লিমিটেডের পরিচালক ফ্লোরিন গনি রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আপনার কথা বিস্তারিত শুনলাম। এ বিষয়ে যদি কিছু বলতে হয়, তবে আমার মনোনীত আইনজীবী ছাড়া কোনো মন্তব্য করতে পারবো না।’
যেভাবে বরাদ্দ হয়েছিল
রাজউকের নথি অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গুলশান (দক্ষিণ) বাণিজ্যিক এলাকার ৩৭, ৪১ ও ৪৩ নম্বর প্লট ৯৯ বছরের জন্য ‘বাণীচিত্র’ ও ‘চলচ্চিত্র’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানকে তৎকালীন ডিআইটি (বর্তমানে রাজউক) বরাদ্দ দেয়। প্রতিষ্ঠান দুটি মূলত দেশীয় চলচ্চিত্রের পরিবেশক হিসেবে ব্যবসা করছে। উদ্দেশ্য ছিল তিনটি সিনেমা হল নির্মাণ। জমির মোট পরিমাণ ছিল ৩৫ দশমিক ৭৫ কাঠা, যা ২৫ হাজার ৭৪০ বর্গফুটের মতো। পুরো মূল্য পরিশোধের পর ওই বছরের অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ৯ জুলাই জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। একই বছরের ২ ডিসেম্বর বরাদ্দের দলিল নিবন্ধন করা হয়।
বিধি না মেনে নকশার আংশিক পরিবর্তন: সীমিত ছাড়ে বড় রূপান্তর
গুরুত্বপূর্ণ এ এলাকার জমি ব্যবহারে শ্রেণি পরিবর্তনের চেষ্টা হয়েছে একাধিকবার। বরাদ্দগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান সিনেমা হলের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি চায় ১৯৯৪ সালে। পরে রাজউকের বোর্ড সভায় বিষয়টি বিবেচনা করে জানিয়ে দেওয়া হয়, বরাদ্দের শর্তের বাইরে অন্য কোনো ব্যবহার অনুমোদনের সুযোগ নেই।
প্রথম দফায় আইন ভেঙে বাণিজ্যিক ব্যবহারে ব্যর্থ হলেও ১৯৯৮ সালে বিষয়টি আবার রাজউকের বোর্ড সভায় ওঠে। সেই সময়কার সদস্য (পরিকল্পনা), সদস্য (প্রশাসন ও ভূমি) ও সদস্য (এস্টেট) সমন্বয়ে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৯৯৯ সালে সীমিত শর্তে অনুমতি পেতে সক্ষম হয় বরাদ্দগ্রহীতা। শর্ত ছিল— ভবনের কোনো একটি অংশে যেন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের জন্য হলরুম রাখা হয়। এই শর্তকে ভিত্তি করে নকশার ছাড়পত্র ও অনুমোদন নেয় সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু কথা রাখেননি ভূমি মালিকরা। সেখানে পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে দোকান হিসেবে পজিশন হস্তান্তর করেন।
চোখ পড়েছে শান্তা হোল্ডিংসের
নথি ঘেঁটে দেখা যায়, প্লটের নিয়ন্ত্রণে প্রথম বড় পরিবর্তন আসে ২০০৪ সালে। ওই বছরই বরাদ্দগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজউক অ্যাডভান্সড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি লিমিটেডকে আম-মোক্তার নিয়োগের অনুমতি দেয়। তবে ২০০৬ সাল থেকে এই প্লটগুলোর দিকে নজর পড়ে দেশের শীর্ষ আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান শান্তা প্রোপার্টিজ লিমিটেডের (বর্তমানে শান্তা হোল্ডিংস)।
আগের আম-মোক্তারনামা বাতিল, অনাপত্তিপত্র দাখিল ও একাধিক আবেদনের দীর্ঘ সময় পার করে অবশেষে ২০১৫ সালের ৭ এপ্রিল রাজউক শান্তা প্রোপার্টিজকে আম-মোক্তার হিসেবে অনুমোদন দেয়। সে বছরই দেয় ইমারত নির্মাণের জন্য নকশা অনুমোদনের ছাড়পত্র।
এরই মধ্যে বিদ্যমান স্থাপনা নিয়ে রাজউকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, সিনেমা হল নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া জমিতে যে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, এর বড় একটি অংশ বরাদ্দের শর্ত ও অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে করা হয়েছে। এরপরই রাজউক ওই ভবনের অবৈধ অংশ চিহ্নিত করে ভাঙার নোটিশ দেয়। এই নোটিশই পুরো পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেয়। বিষয়টি মামলা পর্যন্ত গড়ালে ভাঙার নোটিশের বিরুদ্ধে করা রিট আবেদনের শুনানিতে আদালত বরাদ্দের শর্ত ও অনুমোদিত নকশার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়।
জানা যায়, ২০২৩ সালের আগস্টে অনিয়মের অভিযোগ তুলে শান্তা হোল্ডিংসকে নোটিশ অব টার্মিনেশনের মাধ্যমে আম-মোক্তারনামা বাতিলের ঘোষণা করে বাণীচিত্র ও চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি একপর্যায়ে বিগত সরকারের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত গড়ায়।
রাজউক-শান্তা’র দৌড়ঝাপ
প্রায় ৩৬ কাঠা জমির ওপর বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য তৎপরতা শুরু হয় বেশ কয়েক বছর আগেই। বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে বরাদ্দ দেওয়া প্লটে কাজটি বাস্তবায়ন খুব একটা সহজ না। এজন্য রাজউকের দায়িত্বশীল চেয়ারগুলোতে যারা এসেছেন তাদের ম্যানেজ করতে তৎপর ছিলেন শান্তা হোল্ডিংসের কর্মকর্তারা। একপর্যায়ে বিগত সরকারের পক্ষ ও রাজউক থেকে তৎকালীন সদস্য (এস্টেট) মো. নূরুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পরও কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি।
এরপর রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সিদ্দিুকর রহমানও এতে সম্পৃক্ত হন। তিনিও কিছু পদক্ষেপ নিয়ে পিছু হটেন। এর মধ্যে চলমান মামলা নিষ্পত্তি না করেই ৩৭, ৪১ ও ৪৩ নম্বর প্লটের সঙ্গে ১৪ নম্বরের প্লট সংযুক্ত করে শান্তা হোল্ডিংস বহুতল বাণিজ্যিক ভবন তৈরির পরিকল্পনা করে। এজন্য ২০২৩ সালের ১৬ জুলাই এই চারটি প্লট একত্রীকরণের আবেদনও করে শান্তা হোল্ডিংস। বিষয়টি জানতে পেরে বাণীচিত্র লিমিটেডের পরিচালক জিয়া ইয়ামিন ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন। বিভিন্ন কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে শান্তা হোল্ডিংসের কর্মকর্তারা যখন কোনো ব্যবস্থা করতে পারছিলেন না তখন অনেকটা আর্শীবাদ হয়ে ধরা দেয় রাজউকের নতুন সংশ্লিষ্ট পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) মো. মিজানুর রহমান।

এরপর চেয়ারম্যান আর পরিচালকের সমন্বয়ে শুরু হলো রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে ‘জটিল ফাইল’ হিসেবে পরিচিত শান্তা হোল্ডিংসের নতুন তৎপরতা। শান্তার হয়ে নিয়োজিত লোকজন আর রাজউকের কতিপয় কর্মকর্তার তৎপরতায় ফাইল চালাচলি শুরু হয়। ইতোমধ্যে কয়েকটি দপ্তর ঘুরে বর্তমানে আইন শাখায় মতামতের জন্য গেছে বলে জানা যায়। ফাইলের পেছনে নিরলস শ্রম দেওয়া করিৎকর্মা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান এখন এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যার সত্যতা মেলে ১৯ জানুয়ারি দুপুরে। এ প্রতিবেদক যখন এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে পরিচালকের দপ্তরে, তখন পরিচালক মিজানুর রহমান বাণীচিত্র লিমিটেডের লোকজনের সঙ্গে এ নিয়ে বৈঠক করছিলেন।
এক মাস ধরে আমি এই পদে কাজ করছি। প্লটগুলোর বরাদ্দের বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা নেই। তাই এই সম্পর্কে কিছু বলতে পারছি না।’
মো. মিজানুর রহমান পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১), রাজউক
ওই বৈঠক শেষে এই বিষয়ে জানতে চাইলে মিজানুর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘এক মাস হয়েছে আমি এই পদে কাজ করছি। প্লটগুলোর বরাদ্দের বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা নেই। তাই এই সম্পর্কে কিছু বলতে পারছি না।’
রাজউকের সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) শেখ মতিউর রহমানের কাছে জানতে চাইলে নিজ দপ্তরে সিটিজেন জার্নালকে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে জানতে হলে লিখিত আকারে জমা দেন। এর বাইরে আমি কিছু বলতে পারবো না।’
তবে একাধিক কর্মকর্তা জানান, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ অনুযায়ী, আম-মোক্তারনামা বাতিলের নোটিশ জারির পর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সেই আম-মোক্তারনামা কার্যকর থাকে না। একইসঙ্গে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী, বরাদ্দের শর্ত লঙ্ঘন করে উন্নয়ন কার্যক্রম চালানো আইনত দণ্ডনীয়। নথিতে দেখা যায়, এই প্লট ঘিরে একাধিক আরবিট্রেশন ও রিভিশন মামলা এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
সরকার হারাবে শত কোটি টাকার রাজস্ব
রাজউকের একাধিক অথরাইজড অফিসার জানান, রাজউকের কর্মকর্তা ও শান্তা হোল্ডিংসের লোকজন ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বরের আগে নকশার উপস্থাপন দেখিয়ে ফার (ফ্লোর এরিয়া রেশিও) সুবিধাভোগী হবে। সেক্ষেত্রে বৃহদায়তন প্রকল্প কমিটি তাদের ইচ্ছামাফিক বহুতল ভবনের অনুমোদন দিতে পারবে। আবাসন প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী কমবেশি ৩টি বেজমেন্টসহ ৪০ তলা পর্যন্ত নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনার কথা জানা যায়। সেই হিসাবে প্রতি তলায় কমবেশি ১২ হাজার বর্গফুট হলে মোট ৩৬ কাঠা এ প্লটের আয়তন ৪ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুট।

সিটিজেন জার্নালের পক্ষ থেকে শান্তা হোল্ডিংসের তেজগাঁওয়ের বিক্রয় শাখায় যোগাযোগ করা হলে বিক্রয় ব্যবস্থাপক মো. ইয়াসিন পাটওয়ারী বলেন, ‘গুলশান এক নম্বরের জায়গায় স্পেস আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি শুরু হয়নি। তবে ক্রেতা এলে আমরা প্রকল্পটি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য শেয়ার করছি। যারা কিনতে আগ্রহী তাদের সঙ্গে দরদাম নিয়েও আলাপ হচ্ছে। প্রকল্পের গ্রাউন্ড ওয়াল তৈরির কাজ চলছে। এখানে ৩০ তলার চেয়েও বড় ভবন নির্মাণ করা হবে, যা পুরোটাই হবে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য। নিচে শো-রুম থাকবে আর উপরে অফিস স্পেস।’
আমাদের নকশা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। ভবনটি তৈরি হলে প্রত্যক ফ্লোরে আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ হাজার স্কয়ার ফুট জায়গা বরাদ্দ দেওয়া যাবে। শুরুতে প্রতি স্কয়ার ফুটের দাম হবে ৪০ হাজার টাকার মতো
মো. ইয়াসিন পাটওয়ারী বিক্রয় ব্যবস্থাপক, শান্তা হোল্ডিংস
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নকশা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। ভবনটি তৈরি হলে প্রত্যক ফ্লোরে আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ হাজার স্কয়ার ফুট জায়গা বরাদ্দ দেওয়া যাবে। শুরুতে প্রতি স্কয়ার ফুটের দাম হবে ৪০ হাজার টাকার মতো।’
আমাদের অনুসন্ধান ও শান্তা হোল্ডিংসের দেওয়া তথ্যানুসারে, প্রতি তলার আয়তন ১২ হাজার বর্গফুট ধরলে ৪০ তলা ভবনে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুট। বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হলে যার দাম হবে প্রায় ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা।
নকশা অনুমোদনে যারা
রাজউকের নকশা অনুমোদন সংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী ৪০টি ফ্ল্যাট বা ৫ হাজার বর্গফুটের বেশি হলে তা বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন (বিসি) কমিটির বৃহদায়তন প্রকল্পের দায়িত্বে হবে। এ প্রকল্পে রাজউকের সদস্য (পরিকল্পনা) বশিরুল হক ভূইয়া আহ্বায়ক ও পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১) মো. মনিরুল হক সদস্যসচিব। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন) মো. নূরুল ইসলাম, নগর পরিকল্পনাবিদ নূরে খোদা, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ডিজাইন), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের একজন সদস্য, ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট বাংলাদেশ এর সদস্য এবং সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য রাজউকের নকশা অনুমোদনের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১) ও সদস্য সচিব (বৃহদায়তন প্রকল্প) মো. মনিরুল হকের মোবাইলে বুধবার (২৮ জানুয়ারি) ফোন করা হলে তিনি ধরেননি। বিস্তারিত লিখে তার মোবাইলে বেশ কয়েকবার খুদেবার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি।
যা দেখা গেলো
সরেজমিন গুলশান এক নম্বরের গোলচত্বর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ভাঙা শপিং কমপ্লেক্সের পিলার এখনো সেখানে আছে। সেই অবস্থায় পুরো জায়গাটি টিন দিয়ে ঘিরে রেখে নিজেদের বিলবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে শান্তা হোল্ডিংস। নিরাপত্তার জন্য রয়েছে সিকিউরিটি গার্ড। টিনের বেড়ার দরজায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ‘অনুমোদিত ব্যক্তির প্রবেশ’ লেখা সাইনবোর্ড। ভেতরে রাখা হয়েছে অবকাঠামো নির্মাণ করার জন্য রড ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। আছে নির্মাণ সংক্রান্ত কাজে ব্যবহৃত নানা ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি।

এই প্লটগুলোর বিপরীত দিকে রয়েছে জব্বার টাওয়ার। এই টাওয়ারের নিচে ভ্রাম্যমাণ সিগারেটের দোকান নিয়ে বসেছেন সুমন। প্লটগুলোতে শান্তা হোল্ডিংসের কর্মতৎপরতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন দেখি এখানে বিল্ডিং তৈরির জন্য জিনিসপত্র ট্রাকভর্তি করে ভেতরে নেওয়া হয়। শুনেছি বরাদ্দ দেওয়ার কাজও শুরু করছে।’
আম-মোক্তারনামা বাতিলের মামলা নিষ্পত্তি না হলে প্লট একত্রীকরণের আবেদন গ্রহণের সুযোগ নেই, শুরুতেই তা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। ওই প্লটগুলোতে শান্তা হোল্ডিংসের বিলবোর্ড টানানো বা গ্রাউন্ড ওয়াল তৈরির কাজের কোনো এখতিয়ার নেই। আমি এই পদে যোগদান করেছি ১৫ দিন হলো। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিলে সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে
মো. হাসানুর রেজা অথরাইজড কর্মকর্তা (জোন-৪), রাজউক
এ বিষয়ে সোমবার (২৬ জানুয়ারি) বিকালে রাজউকের জোন-৪-এর অথরাইজড কর্মকর্তা মো. হাসানুর রেজার মোবাইলে কল করে জানতে চাইলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আম-মোক্তারনামা বাতিলের মামলা নিষ্পত্তি না হলে প্লট একত্রীকরণের আবেদন গ্রহণ করার সুযোগ নেই। শুরুতেই তা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। ওই প্লটগুলোতে শান্তা হোল্ডিংসের বিলবোর্ড টানানো বা গ্রাউন্ড ওয়াল তৈরির কাজের কোনো এখতিয়ার নেই। আমি এই পদে যোগদান করেছি ১৫ দিন হলো। লিখিত অভিযোগ জমা দিলে সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।’
গুলশান গোল চত্বরে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ নিয়ে কথা বলার জন্য শান্তা হোল্ডিংসের নির্বাহী পরিচালক (গ্রুপ ফাইন্যান্স) এম. আনিসুল হকের মুঠোফোনে বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় কল করা হলেও তিনি ধরেননি। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তার মুঠোফোনে খুদেবার্তা পাঠানো হলে সাড়া দিয়ে লেখেন, ‘আমি এখন বাংলাদেশে নেই।’

দেশের সবচেয়ে অভিজাত ও নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক এলাকা রাজধানীর গুলশান। এই এলাকার এক নম্বর গোল চত্বরে গেলে দেখা মেলে টিন দিয়ে ঘেরা বিশাল জায়গা। এই অংশে সিনেমা হল নির্মাণের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বরাদ্দ দেওয়া তিনটি প্লটে এখন শান্তা হোল্ডিংসের বাণিজ্যিক ভবন তৈরির তোড়জোড় চলছে। যার প্লট নম্বর ৩৭, ৪১ ও ৪৩।
কিন্তু এসব প্লটে সিনেমা হলের কোনো চিহ্ন নেই। অথচ গত পাঁচ দশকে বিশেষ শর্তে দেওয়া এই জমিগুলোর ব্যবহারের ধরন কৌশলে আংশিক বদলে দেওয়া হয়েছে । বরাদ্দপত্রের শর্তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, নির্ধারিত উদ্দেশ্য ছাড়া অর্থাৎ সিনেমা হল তৈরি ছাড়া এই জমি অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
এদিকে, চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বাণীচিত্র লিমিটেডের পক্ষে পরিচালক ফ্লোরিন গনি রহমান ও জিয়া ইয়ামিন শান্তা হোল্ডিংসের নামে প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন। গণপূর্ত উপদেষ্টা ও রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে তারা শর্ত ভঙ্গ করে এসব প্লট বন্ধক দিয়ে ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা জানান। পাশাপাশি শান্তার সঙ্গে চুক্তি বাতিলের জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এরই মধ্যে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আর ঊর্ধ্বতন মহল মিলে শান্তা হোল্ডিংসকে বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নেওয়ার কাজটি হাতে নিয়েছে বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার দপ্তরে গেলে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেননি। পরে রাজউক চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বিস্তারিত লিখে পাঠানো হলে তা দেখেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। এরপর টানা তিন দিন ফোন করা হলে রিসিভ করেননি।
নথি ঘেঁটে দেখা যায়, বরাদ্দের পর থেকে দফায় দফায় ভঙ্গ করা হয়েছে আইন। নকশা পরিবর্তন, আম-মোক্তারনামা, সমঝোতার আড়ালে বরাদ্দের মূল উদ্দেশ্য আড়াল করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন নগর পরিকল্পনার আদর্শ মান ক্ষুণ্ন হয়েছে, অন্যদিকে সরকার হারিয়েছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

আম-মোক্তারনামা দিয়েই ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেয় শান্তা
আম-মোক্তারনামার ক্ষমতার ব্যবহার করেই প্লট বন্ধক রেখে ২০০ কোটি টাকার অধিক ঋণ নিয়েছে শান্তা হোল্ডিংস লিমিটেড– এমন অভিযোগ তুলে ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাজউকের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করেন বাণীচিত্র প্রতিষ্ঠান লিমিটেডের পরিচালক ফ্লোরিন গনি রহমান।
ওই আবেদনে বলা হয়, আম-মোক্তারনামার শর্ত সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে বরাদ্দগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের কোনো পূর্বানুমতি ছাড়াই ১৪, ৩৭, ৪১ ও ৪৩ নম্বর প্লট বন্ধক রাখে শান্তা হোল্ডিংস। অথচ চুক্তি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ঋণের সীমা নির্ধারিত ছিল ১০০ কোটি টাকা, কিন্তু সেই সীমা অমান্য করে দ্বিগুণেরও বেশি অর্থ ঋণ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া প্লটগুলোর প্রকৃত দখল গ্রহণ কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি ছাড়াই আম-মোক্তারনামার ক্ষমতার অপব্যবহার করে এসব ঋণ ও আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করা হয়েছে। এই বিষয়ে বানীচিত্র একাধিকবার ঋণসংক্রান্ত তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাইলেও শান্তা হোল্ডিংস সেসব গোপন রাখে। বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে পাঠানো নোটিশেরও কোনো জবাব দেয়নি শান্তা হোল্ডিংস। ফলে পুরো বিষয়টি বরাদ্দগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক ও আইনি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জানতে চাইলে বাণীচিত্র লিমিটেডের পরিচালক ফ্লোরিন গনি রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আপনার কথা বিস্তারিত শুনলাম। এ বিষয়ে যদি কিছু বলতে হয়, তবে আমার মনোনীত আইনজীবী ছাড়া কোনো মন্তব্য করতে পারবো না।’
যেভাবে বরাদ্দ হয়েছিল
রাজউকের নথি অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গুলশান (দক্ষিণ) বাণিজ্যিক এলাকার ৩৭, ৪১ ও ৪৩ নম্বর প্লট ৯৯ বছরের জন্য ‘বাণীচিত্র’ ও ‘চলচ্চিত্র’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানকে তৎকালীন ডিআইটি (বর্তমানে রাজউক) বরাদ্দ দেয়। প্রতিষ্ঠান দুটি মূলত দেশীয় চলচ্চিত্রের পরিবেশক হিসেবে ব্যবসা করছে। উদ্দেশ্য ছিল তিনটি সিনেমা হল নির্মাণ। জমির মোট পরিমাণ ছিল ৩৫ দশমিক ৭৫ কাঠা, যা ২৫ হাজার ৭৪০ বর্গফুটের মতো। পুরো মূল্য পরিশোধের পর ওই বছরের অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ৯ জুলাই জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। একই বছরের ২ ডিসেম্বর বরাদ্দের দলিল নিবন্ধন করা হয়।
বিধি না মেনে নকশার আংশিক পরিবর্তন: সীমিত ছাড়ে বড় রূপান্তর
গুরুত্বপূর্ণ এ এলাকার জমি ব্যবহারে শ্রেণি পরিবর্তনের চেষ্টা হয়েছে একাধিকবার। বরাদ্দগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান সিনেমা হলের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি চায় ১৯৯৪ সালে। পরে রাজউকের বোর্ড সভায় বিষয়টি বিবেচনা করে জানিয়ে দেওয়া হয়, বরাদ্দের শর্তের বাইরে অন্য কোনো ব্যবহার অনুমোদনের সুযোগ নেই।
প্রথম দফায় আইন ভেঙে বাণিজ্যিক ব্যবহারে ব্যর্থ হলেও ১৯৯৮ সালে বিষয়টি আবার রাজউকের বোর্ড সভায় ওঠে। সেই সময়কার সদস্য (পরিকল্পনা), সদস্য (প্রশাসন ও ভূমি) ও সদস্য (এস্টেট) সমন্বয়ে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৯৯৯ সালে সীমিত শর্তে অনুমতি পেতে সক্ষম হয় বরাদ্দগ্রহীতা। শর্ত ছিল— ভবনের কোনো একটি অংশে যেন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের জন্য হলরুম রাখা হয়। এই শর্তকে ভিত্তি করে নকশার ছাড়পত্র ও অনুমোদন নেয় সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু কথা রাখেননি ভূমি মালিকরা। সেখানে পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে দোকান হিসেবে পজিশন হস্তান্তর করেন।
চোখ পড়েছে শান্তা হোল্ডিংসের
নথি ঘেঁটে দেখা যায়, প্লটের নিয়ন্ত্রণে প্রথম বড় পরিবর্তন আসে ২০০৪ সালে। ওই বছরই বরাদ্দগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজউক অ্যাডভান্সড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি লিমিটেডকে আম-মোক্তার নিয়োগের অনুমতি দেয়। তবে ২০০৬ সাল থেকে এই প্লটগুলোর দিকে নজর পড়ে দেশের শীর্ষ আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান শান্তা প্রোপার্টিজ লিমিটেডের (বর্তমানে শান্তা হোল্ডিংস)।
আগের আম-মোক্তারনামা বাতিল, অনাপত্তিপত্র দাখিল ও একাধিক আবেদনের দীর্ঘ সময় পার করে অবশেষে ২০১৫ সালের ৭ এপ্রিল রাজউক শান্তা প্রোপার্টিজকে আম-মোক্তার হিসেবে অনুমোদন দেয়। সে বছরই দেয় ইমারত নির্মাণের জন্য নকশা অনুমোদনের ছাড়পত্র।
এরই মধ্যে বিদ্যমান স্থাপনা নিয়ে রাজউকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, সিনেমা হল নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া জমিতে যে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, এর বড় একটি অংশ বরাদ্দের শর্ত ও অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে করা হয়েছে। এরপরই রাজউক ওই ভবনের অবৈধ অংশ চিহ্নিত করে ভাঙার নোটিশ দেয়। এই নোটিশই পুরো পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেয়। বিষয়টি মামলা পর্যন্ত গড়ালে ভাঙার নোটিশের বিরুদ্ধে করা রিট আবেদনের শুনানিতে আদালত বরাদ্দের শর্ত ও অনুমোদিত নকশার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়।
জানা যায়, ২০২৩ সালের আগস্টে অনিয়মের অভিযোগ তুলে শান্তা হোল্ডিংসকে নোটিশ অব টার্মিনেশনের মাধ্যমে আম-মোক্তারনামা বাতিলের ঘোষণা করে বাণীচিত্র ও চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি একপর্যায়ে বিগত সরকারের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত গড়ায়।
রাজউক-শান্তা’র দৌড়ঝাপ
প্রায় ৩৬ কাঠা জমির ওপর বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য তৎপরতা শুরু হয় বেশ কয়েক বছর আগেই। বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে বরাদ্দ দেওয়া প্লটে কাজটি বাস্তবায়ন খুব একটা সহজ না। এজন্য রাজউকের দায়িত্বশীল চেয়ারগুলোতে যারা এসেছেন তাদের ম্যানেজ করতে তৎপর ছিলেন শান্তা হোল্ডিংসের কর্মকর্তারা। একপর্যায়ে বিগত সরকারের পক্ষ ও রাজউক থেকে তৎকালীন সদস্য (এস্টেট) মো. নূরুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পরও কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি।
এরপর রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সিদ্দিুকর রহমানও এতে সম্পৃক্ত হন। তিনিও কিছু পদক্ষেপ নিয়ে পিছু হটেন। এর মধ্যে চলমান মামলা নিষ্পত্তি না করেই ৩৭, ৪১ ও ৪৩ নম্বর প্লটের সঙ্গে ১৪ নম্বরের প্লট সংযুক্ত করে শান্তা হোল্ডিংস বহুতল বাণিজ্যিক ভবন তৈরির পরিকল্পনা করে। এজন্য ২০২৩ সালের ১৬ জুলাই এই চারটি প্লট একত্রীকরণের আবেদনও করে শান্তা হোল্ডিংস। বিষয়টি জানতে পেরে বাণীচিত্র লিমিটেডের পরিচালক জিয়া ইয়ামিন ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন। বিভিন্ন কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে শান্তা হোল্ডিংসের কর্মকর্তারা যখন কোনো ব্যবস্থা করতে পারছিলেন না তখন অনেকটা আর্শীবাদ হয়ে ধরা দেয় রাজউকের নতুন সংশ্লিষ্ট পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) মো. মিজানুর রহমান।

এরপর চেয়ারম্যান আর পরিচালকের সমন্বয়ে শুরু হলো রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে ‘জটিল ফাইল’ হিসেবে পরিচিত শান্তা হোল্ডিংসের নতুন তৎপরতা। শান্তার হয়ে নিয়োজিত লোকজন আর রাজউকের কতিপয় কর্মকর্তার তৎপরতায় ফাইল চালাচলি শুরু হয়। ইতোমধ্যে কয়েকটি দপ্তর ঘুরে বর্তমানে আইন শাখায় মতামতের জন্য গেছে বলে জানা যায়। ফাইলের পেছনে নিরলস শ্রম দেওয়া করিৎকর্মা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান এখন এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যার সত্যতা মেলে ১৯ জানুয়ারি দুপুরে। এ প্রতিবেদক যখন এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে পরিচালকের দপ্তরে, তখন পরিচালক মিজানুর রহমান বাণীচিত্র লিমিটেডের লোকজনের সঙ্গে এ নিয়ে বৈঠক করছিলেন।
এক মাস ধরে আমি এই পদে কাজ করছি। প্লটগুলোর বরাদ্দের বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা নেই। তাই এই সম্পর্কে কিছু বলতে পারছি না।’
মো. মিজানুর রহমান পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১), রাজউক
ওই বৈঠক শেষে এই বিষয়ে জানতে চাইলে মিজানুর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘এক মাস হয়েছে আমি এই পদে কাজ করছি। প্লটগুলোর বরাদ্দের বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা নেই। তাই এই সম্পর্কে কিছু বলতে পারছি না।’
রাজউকের সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) শেখ মতিউর রহমানের কাছে জানতে চাইলে নিজ দপ্তরে সিটিজেন জার্নালকে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে জানতে হলে লিখিত আকারে জমা দেন। এর বাইরে আমি কিছু বলতে পারবো না।’
তবে একাধিক কর্মকর্তা জানান, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ অনুযায়ী, আম-মোক্তারনামা বাতিলের নোটিশ জারির পর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সেই আম-মোক্তারনামা কার্যকর থাকে না। একইসঙ্গে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী, বরাদ্দের শর্ত লঙ্ঘন করে উন্নয়ন কার্যক্রম চালানো আইনত দণ্ডনীয়। নথিতে দেখা যায়, এই প্লট ঘিরে একাধিক আরবিট্রেশন ও রিভিশন মামলা এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
সরকার হারাবে শত কোটি টাকার রাজস্ব
রাজউকের একাধিক অথরাইজড অফিসার জানান, রাজউকের কর্মকর্তা ও শান্তা হোল্ডিংসের লোকজন ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বরের আগে নকশার উপস্থাপন দেখিয়ে ফার (ফ্লোর এরিয়া রেশিও) সুবিধাভোগী হবে। সেক্ষেত্রে বৃহদায়তন প্রকল্প কমিটি তাদের ইচ্ছামাফিক বহুতল ভবনের অনুমোদন দিতে পারবে। আবাসন প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী কমবেশি ৩টি বেজমেন্টসহ ৪০ তলা পর্যন্ত নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনার কথা জানা যায়। সেই হিসাবে প্রতি তলায় কমবেশি ১২ হাজার বর্গফুট হলে মোট ৩৬ কাঠা এ প্লটের আয়তন ৪ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুট।

সিটিজেন জার্নালের পক্ষ থেকে শান্তা হোল্ডিংসের তেজগাঁওয়ের বিক্রয় শাখায় যোগাযোগ করা হলে বিক্রয় ব্যবস্থাপক মো. ইয়াসিন পাটওয়ারী বলেন, ‘গুলশান এক নম্বরের জায়গায় স্পেস আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি শুরু হয়নি। তবে ক্রেতা এলে আমরা প্রকল্পটি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য শেয়ার করছি। যারা কিনতে আগ্রহী তাদের সঙ্গে দরদাম নিয়েও আলাপ হচ্ছে। প্রকল্পের গ্রাউন্ড ওয়াল তৈরির কাজ চলছে। এখানে ৩০ তলার চেয়েও বড় ভবন নির্মাণ করা হবে, যা পুরোটাই হবে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য। নিচে শো-রুম থাকবে আর উপরে অফিস স্পেস।’
আমাদের নকশা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। ভবনটি তৈরি হলে প্রত্যক ফ্লোরে আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ হাজার স্কয়ার ফুট জায়গা বরাদ্দ দেওয়া যাবে। শুরুতে প্রতি স্কয়ার ফুটের দাম হবে ৪০ হাজার টাকার মতো
মো. ইয়াসিন পাটওয়ারী বিক্রয় ব্যবস্থাপক, শান্তা হোল্ডিংস
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নকশা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। ভবনটি তৈরি হলে প্রত্যক ফ্লোরে আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ হাজার স্কয়ার ফুট জায়গা বরাদ্দ দেওয়া যাবে। শুরুতে প্রতি স্কয়ার ফুটের দাম হবে ৪০ হাজার টাকার মতো।’
আমাদের অনুসন্ধান ও শান্তা হোল্ডিংসের দেওয়া তথ্যানুসারে, প্রতি তলার আয়তন ১২ হাজার বর্গফুট ধরলে ৪০ তলা ভবনে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুট। বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হলে যার দাম হবে প্রায় ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা।
নকশা অনুমোদনে যারা
রাজউকের নকশা অনুমোদন সংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী ৪০টি ফ্ল্যাট বা ৫ হাজার বর্গফুটের বেশি হলে তা বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন (বিসি) কমিটির বৃহদায়তন প্রকল্পের দায়িত্বে হবে। এ প্রকল্পে রাজউকের সদস্য (পরিকল্পনা) বশিরুল হক ভূইয়া আহ্বায়ক ও পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১) মো. মনিরুল হক সদস্যসচিব। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন) মো. নূরুল ইসলাম, নগর পরিকল্পনাবিদ নূরে খোদা, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ডিজাইন), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের একজন সদস্য, ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট বাংলাদেশ এর সদস্য এবং সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য রাজউকের নকশা অনুমোদনের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১) ও সদস্য সচিব (বৃহদায়তন প্রকল্প) মো. মনিরুল হকের মোবাইলে বুধবার (২৮ জানুয়ারি) ফোন করা হলে তিনি ধরেননি। বিস্তারিত লিখে তার মোবাইলে বেশ কয়েকবার খুদেবার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি।
যা দেখা গেলো
সরেজমিন গুলশান এক নম্বরের গোলচত্বর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ভাঙা শপিং কমপ্লেক্সের পিলার এখনো সেখানে আছে। সেই অবস্থায় পুরো জায়গাটি টিন দিয়ে ঘিরে রেখে নিজেদের বিলবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে শান্তা হোল্ডিংস। নিরাপত্তার জন্য রয়েছে সিকিউরিটি গার্ড। টিনের বেড়ার দরজায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ‘অনুমোদিত ব্যক্তির প্রবেশ’ লেখা সাইনবোর্ড। ভেতরে রাখা হয়েছে অবকাঠামো নির্মাণ করার জন্য রড ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। আছে নির্মাণ সংক্রান্ত কাজে ব্যবহৃত নানা ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি।

এই প্লটগুলোর বিপরীত দিকে রয়েছে জব্বার টাওয়ার। এই টাওয়ারের নিচে ভ্রাম্যমাণ সিগারেটের দোকান নিয়ে বসেছেন সুমন। প্লটগুলোতে শান্তা হোল্ডিংসের কর্মতৎপরতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন দেখি এখানে বিল্ডিং তৈরির জন্য জিনিসপত্র ট্রাকভর্তি করে ভেতরে নেওয়া হয়। শুনেছি বরাদ্দ দেওয়ার কাজও শুরু করছে।’
আম-মোক্তারনামা বাতিলের মামলা নিষ্পত্তি না হলে প্লট একত্রীকরণের আবেদন গ্রহণের সুযোগ নেই, শুরুতেই তা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। ওই প্লটগুলোতে শান্তা হোল্ডিংসের বিলবোর্ড টানানো বা গ্রাউন্ড ওয়াল তৈরির কাজের কোনো এখতিয়ার নেই। আমি এই পদে যোগদান করেছি ১৫ দিন হলো। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিলে সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে
মো. হাসানুর রেজা অথরাইজড কর্মকর্তা (জোন-৪), রাজউক
এ বিষয়ে সোমবার (২৬ জানুয়ারি) বিকালে রাজউকের জোন-৪-এর অথরাইজড কর্মকর্তা মো. হাসানুর রেজার মোবাইলে কল করে জানতে চাইলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আম-মোক্তারনামা বাতিলের মামলা নিষ্পত্তি না হলে প্লট একত্রীকরণের আবেদন গ্রহণ করার সুযোগ নেই। শুরুতেই তা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। ওই প্লটগুলোতে শান্তা হোল্ডিংসের বিলবোর্ড টানানো বা গ্রাউন্ড ওয়াল তৈরির কাজের কোনো এখতিয়ার নেই। আমি এই পদে যোগদান করেছি ১৫ দিন হলো। লিখিত অভিযোগ জমা দিলে সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।’
গুলশান গোল চত্বরে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ নিয়ে কথা বলার জন্য শান্তা হোল্ডিংসের নির্বাহী পরিচালক (গ্রুপ ফাইন্যান্স) এম. আনিসুল হকের মুঠোফোনে বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় কল করা হলেও তিনি ধরেননি। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তার মুঠোফোনে খুদেবার্তা পাঠানো হলে সাড়া দিয়ে লেখেন, ‘আমি এখন বাংলাদেশে নেই।’

পদে পদে আইন ভেঙে গুলশানে হচ্ছে শান্তার বাণিজ্যিক ভবন
সেলিনা আক্তার

দেশের সবচেয়ে অভিজাত ও নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক এলাকা রাজধানীর গুলশান। এই এলাকার এক নম্বর গোল চত্বরে গেলে দেখা মেলে টিন দিয়ে ঘেরা বিশাল জায়গা। এই অংশে সিনেমা হল নির্মাণের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বরাদ্দ দেওয়া তিনটি প্লটে এখন শান্তা হোল্ডিংসের বাণিজ্যিক ভবন তৈরির তোড়জোড় চলছে। যার প্লট নম্বর ৩৭, ৪১ ও ৪৩।
কিন্তু এসব প্লটে সিনেমা হলের কোনো চিহ্ন নেই। অথচ গত পাঁচ দশকে বিশেষ শর্তে দেওয়া এই জমিগুলোর ব্যবহারের ধরন কৌশলে আংশিক বদলে দেওয়া হয়েছে । বরাদ্দপত্রের শর্তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, নির্ধারিত উদ্দেশ্য ছাড়া অর্থাৎ সিনেমা হল তৈরি ছাড়া এই জমি অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
এদিকে, চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বাণীচিত্র লিমিটেডের পক্ষে পরিচালক ফ্লোরিন গনি রহমান ও জিয়া ইয়ামিন শান্তা হোল্ডিংসের নামে প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন। গণপূর্ত উপদেষ্টা ও রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে তারা শর্ত ভঙ্গ করে এসব প্লট বন্ধক দিয়ে ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা জানান। পাশাপাশি শান্তার সঙ্গে চুক্তি বাতিলের জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এরই মধ্যে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আর ঊর্ধ্বতন মহল মিলে শান্তা হোল্ডিংসকে বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নেওয়ার কাজটি হাতে নিয়েছে বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার দপ্তরে গেলে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেননি। পরে রাজউক চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বিস্তারিত লিখে পাঠানো হলে তা দেখেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। এরপর টানা তিন দিন ফোন করা হলে রিসিভ করেননি।
নথি ঘেঁটে দেখা যায়, বরাদ্দের পর থেকে দফায় দফায় ভঙ্গ করা হয়েছে আইন। নকশা পরিবর্তন, আম-মোক্তারনামা, সমঝোতার আড়ালে বরাদ্দের মূল উদ্দেশ্য আড়াল করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন নগর পরিকল্পনার আদর্শ মান ক্ষুণ্ন হয়েছে, অন্যদিকে সরকার হারিয়েছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

আম-মোক্তারনামা দিয়েই ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেয় শান্তা
আম-মোক্তারনামার ক্ষমতার ব্যবহার করেই প্লট বন্ধক রেখে ২০০ কোটি টাকার অধিক ঋণ নিয়েছে শান্তা হোল্ডিংস লিমিটেড– এমন অভিযোগ তুলে ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাজউকের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করেন বাণীচিত্র প্রতিষ্ঠান লিমিটেডের পরিচালক ফ্লোরিন গনি রহমান।
ওই আবেদনে বলা হয়, আম-মোক্তারনামার শর্ত সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে বরাদ্দগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের কোনো পূর্বানুমতি ছাড়াই ১৪, ৩৭, ৪১ ও ৪৩ নম্বর প্লট বন্ধক রাখে শান্তা হোল্ডিংস। অথচ চুক্তি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ঋণের সীমা নির্ধারিত ছিল ১০০ কোটি টাকা, কিন্তু সেই সীমা অমান্য করে দ্বিগুণেরও বেশি অর্থ ঋণ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া প্লটগুলোর প্রকৃত দখল গ্রহণ কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি ছাড়াই আম-মোক্তারনামার ক্ষমতার অপব্যবহার করে এসব ঋণ ও আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করা হয়েছে। এই বিষয়ে বানীচিত্র একাধিকবার ঋণসংক্রান্ত তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাইলেও শান্তা হোল্ডিংস সেসব গোপন রাখে। বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে পাঠানো নোটিশেরও কোনো জবাব দেয়নি শান্তা হোল্ডিংস। ফলে পুরো বিষয়টি বরাদ্দগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক ও আইনি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জানতে চাইলে বাণীচিত্র লিমিটেডের পরিচালক ফ্লোরিন গনি রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আপনার কথা বিস্তারিত শুনলাম। এ বিষয়ে যদি কিছু বলতে হয়, তবে আমার মনোনীত আইনজীবী ছাড়া কোনো মন্তব্য করতে পারবো না।’
যেভাবে বরাদ্দ হয়েছিল
রাজউকের নথি অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গুলশান (দক্ষিণ) বাণিজ্যিক এলাকার ৩৭, ৪১ ও ৪৩ নম্বর প্লট ৯৯ বছরের জন্য ‘বাণীচিত্র’ ও ‘চলচ্চিত্র’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানকে তৎকালীন ডিআইটি (বর্তমানে রাজউক) বরাদ্দ দেয়। প্রতিষ্ঠান দুটি মূলত দেশীয় চলচ্চিত্রের পরিবেশক হিসেবে ব্যবসা করছে। উদ্দেশ্য ছিল তিনটি সিনেমা হল নির্মাণ। জমির মোট পরিমাণ ছিল ৩৫ দশমিক ৭৫ কাঠা, যা ২৫ হাজার ৭৪০ বর্গফুটের মতো। পুরো মূল্য পরিশোধের পর ওই বছরের অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ৯ জুলাই জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। একই বছরের ২ ডিসেম্বর বরাদ্দের দলিল নিবন্ধন করা হয়।
বিধি না মেনে নকশার আংশিক পরিবর্তন: সীমিত ছাড়ে বড় রূপান্তর
গুরুত্বপূর্ণ এ এলাকার জমি ব্যবহারে শ্রেণি পরিবর্তনের চেষ্টা হয়েছে একাধিকবার। বরাদ্দগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান সিনেমা হলের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি চায় ১৯৯৪ সালে। পরে রাজউকের বোর্ড সভায় বিষয়টি বিবেচনা করে জানিয়ে দেওয়া হয়, বরাদ্দের শর্তের বাইরে অন্য কোনো ব্যবহার অনুমোদনের সুযোগ নেই।
প্রথম দফায় আইন ভেঙে বাণিজ্যিক ব্যবহারে ব্যর্থ হলেও ১৯৯৮ সালে বিষয়টি আবার রাজউকের বোর্ড সভায় ওঠে। সেই সময়কার সদস্য (পরিকল্পনা), সদস্য (প্রশাসন ও ভূমি) ও সদস্য (এস্টেট) সমন্বয়ে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৯৯৯ সালে সীমিত শর্তে অনুমতি পেতে সক্ষম হয় বরাদ্দগ্রহীতা। শর্ত ছিল— ভবনের কোনো একটি অংশে যেন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের জন্য হলরুম রাখা হয়। এই শর্তকে ভিত্তি করে নকশার ছাড়পত্র ও অনুমোদন নেয় সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু কথা রাখেননি ভূমি মালিকরা। সেখানে পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে দোকান হিসেবে পজিশন হস্তান্তর করেন।
চোখ পড়েছে শান্তা হোল্ডিংসের
নথি ঘেঁটে দেখা যায়, প্লটের নিয়ন্ত্রণে প্রথম বড় পরিবর্তন আসে ২০০৪ সালে। ওই বছরই বরাদ্দগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজউক অ্যাডভান্সড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি লিমিটেডকে আম-মোক্তার নিয়োগের অনুমতি দেয়। তবে ২০০৬ সাল থেকে এই প্লটগুলোর দিকে নজর পড়ে দেশের শীর্ষ আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান শান্তা প্রোপার্টিজ লিমিটেডের (বর্তমানে শান্তা হোল্ডিংস)।
আগের আম-মোক্তারনামা বাতিল, অনাপত্তিপত্র দাখিল ও একাধিক আবেদনের দীর্ঘ সময় পার করে অবশেষে ২০১৫ সালের ৭ এপ্রিল রাজউক শান্তা প্রোপার্টিজকে আম-মোক্তার হিসেবে অনুমোদন দেয়। সে বছরই দেয় ইমারত নির্মাণের জন্য নকশা অনুমোদনের ছাড়পত্র।
এরই মধ্যে বিদ্যমান স্থাপনা নিয়ে রাজউকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, সিনেমা হল নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া জমিতে যে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, এর বড় একটি অংশ বরাদ্দের শর্ত ও অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে করা হয়েছে। এরপরই রাজউক ওই ভবনের অবৈধ অংশ চিহ্নিত করে ভাঙার নোটিশ দেয়। এই নোটিশই পুরো পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেয়। বিষয়টি মামলা পর্যন্ত গড়ালে ভাঙার নোটিশের বিরুদ্ধে করা রিট আবেদনের শুনানিতে আদালত বরাদ্দের শর্ত ও অনুমোদিত নকশার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়।
জানা যায়, ২০২৩ সালের আগস্টে অনিয়মের অভিযোগ তুলে শান্তা হোল্ডিংসকে নোটিশ অব টার্মিনেশনের মাধ্যমে আম-মোক্তারনামা বাতিলের ঘোষণা করে বাণীচিত্র ও চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি একপর্যায়ে বিগত সরকারের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত গড়ায়।
রাজউক-শান্তা’র দৌড়ঝাপ
প্রায় ৩৬ কাঠা জমির ওপর বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য তৎপরতা শুরু হয় বেশ কয়েক বছর আগেই। বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে বরাদ্দ দেওয়া প্লটে কাজটি বাস্তবায়ন খুব একটা সহজ না। এজন্য রাজউকের দায়িত্বশীল চেয়ারগুলোতে যারা এসেছেন তাদের ম্যানেজ করতে তৎপর ছিলেন শান্তা হোল্ডিংসের কর্মকর্তারা। একপর্যায়ে বিগত সরকারের পক্ষ ও রাজউক থেকে তৎকালীন সদস্য (এস্টেট) মো. নূরুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পরও কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি।
এরপর রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সিদ্দিুকর রহমানও এতে সম্পৃক্ত হন। তিনিও কিছু পদক্ষেপ নিয়ে পিছু হটেন। এর মধ্যে চলমান মামলা নিষ্পত্তি না করেই ৩৭, ৪১ ও ৪৩ নম্বর প্লটের সঙ্গে ১৪ নম্বরের প্লট সংযুক্ত করে শান্তা হোল্ডিংস বহুতল বাণিজ্যিক ভবন তৈরির পরিকল্পনা করে। এজন্য ২০২৩ সালের ১৬ জুলাই এই চারটি প্লট একত্রীকরণের আবেদনও করে শান্তা হোল্ডিংস। বিষয়টি জানতে পেরে বাণীচিত্র লিমিটেডের পরিচালক জিয়া ইয়ামিন ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন। বিভিন্ন কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে শান্তা হোল্ডিংসের কর্মকর্তারা যখন কোনো ব্যবস্থা করতে পারছিলেন না তখন অনেকটা আর্শীবাদ হয়ে ধরা দেয় রাজউকের নতুন সংশ্লিষ্ট পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) মো. মিজানুর রহমান।

এরপর চেয়ারম্যান আর পরিচালকের সমন্বয়ে শুরু হলো রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে ‘জটিল ফাইল’ হিসেবে পরিচিত শান্তা হোল্ডিংসের নতুন তৎপরতা। শান্তার হয়ে নিয়োজিত লোকজন আর রাজউকের কতিপয় কর্মকর্তার তৎপরতায় ফাইল চালাচলি শুরু হয়। ইতোমধ্যে কয়েকটি দপ্তর ঘুরে বর্তমানে আইন শাখায় মতামতের জন্য গেছে বলে জানা যায়। ফাইলের পেছনে নিরলস শ্রম দেওয়া করিৎকর্মা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান এখন এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যার সত্যতা মেলে ১৯ জানুয়ারি দুপুরে। এ প্রতিবেদক যখন এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে পরিচালকের দপ্তরে, তখন পরিচালক মিজানুর রহমান বাণীচিত্র লিমিটেডের লোকজনের সঙ্গে এ নিয়ে বৈঠক করছিলেন।
এক মাস ধরে আমি এই পদে কাজ করছি। প্লটগুলোর বরাদ্দের বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা নেই। তাই এই সম্পর্কে কিছু বলতে পারছি না।’
মো. মিজানুর রহমান পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১), রাজউক
ওই বৈঠক শেষে এই বিষয়ে জানতে চাইলে মিজানুর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘এক মাস হয়েছে আমি এই পদে কাজ করছি। প্লটগুলোর বরাদ্দের বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা নেই। তাই এই সম্পর্কে কিছু বলতে পারছি না।’
রাজউকের সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) শেখ মতিউর রহমানের কাছে জানতে চাইলে নিজ দপ্তরে সিটিজেন জার্নালকে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে জানতে হলে লিখিত আকারে জমা দেন। এর বাইরে আমি কিছু বলতে পারবো না।’
তবে একাধিক কর্মকর্তা জানান, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ অনুযায়ী, আম-মোক্তারনামা বাতিলের নোটিশ জারির পর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সেই আম-মোক্তারনামা কার্যকর থাকে না। একইসঙ্গে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী, বরাদ্দের শর্ত লঙ্ঘন করে উন্নয়ন কার্যক্রম চালানো আইনত দণ্ডনীয়। নথিতে দেখা যায়, এই প্লট ঘিরে একাধিক আরবিট্রেশন ও রিভিশন মামলা এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
সরকার হারাবে শত কোটি টাকার রাজস্ব
রাজউকের একাধিক অথরাইজড অফিসার জানান, রাজউকের কর্মকর্তা ও শান্তা হোল্ডিংসের লোকজন ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বরের আগে নকশার উপস্থাপন দেখিয়ে ফার (ফ্লোর এরিয়া রেশিও) সুবিধাভোগী হবে। সেক্ষেত্রে বৃহদায়তন প্রকল্প কমিটি তাদের ইচ্ছামাফিক বহুতল ভবনের অনুমোদন দিতে পারবে। আবাসন প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী কমবেশি ৩টি বেজমেন্টসহ ৪০ তলা পর্যন্ত নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনার কথা জানা যায়। সেই হিসাবে প্রতি তলায় কমবেশি ১২ হাজার বর্গফুট হলে মোট ৩৬ কাঠা এ প্লটের আয়তন ৪ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুট।

সিটিজেন জার্নালের পক্ষ থেকে শান্তা হোল্ডিংসের তেজগাঁওয়ের বিক্রয় শাখায় যোগাযোগ করা হলে বিক্রয় ব্যবস্থাপক মো. ইয়াসিন পাটওয়ারী বলেন, ‘গুলশান এক নম্বরের জায়গায় স্পেস আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি শুরু হয়নি। তবে ক্রেতা এলে আমরা প্রকল্পটি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য শেয়ার করছি। যারা কিনতে আগ্রহী তাদের সঙ্গে দরদাম নিয়েও আলাপ হচ্ছে। প্রকল্পের গ্রাউন্ড ওয়াল তৈরির কাজ চলছে। এখানে ৩০ তলার চেয়েও বড় ভবন নির্মাণ করা হবে, যা পুরোটাই হবে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য। নিচে শো-রুম থাকবে আর উপরে অফিস স্পেস।’
আমাদের নকশা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। ভবনটি তৈরি হলে প্রত্যক ফ্লোরে আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ হাজার স্কয়ার ফুট জায়গা বরাদ্দ দেওয়া যাবে। শুরুতে প্রতি স্কয়ার ফুটের দাম হবে ৪০ হাজার টাকার মতো
মো. ইয়াসিন পাটওয়ারী বিক্রয় ব্যবস্থাপক, শান্তা হোল্ডিংস
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নকশা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। ভবনটি তৈরি হলে প্রত্যক ফ্লোরে আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ হাজার স্কয়ার ফুট জায়গা বরাদ্দ দেওয়া যাবে। শুরুতে প্রতি স্কয়ার ফুটের দাম হবে ৪০ হাজার টাকার মতো।’
আমাদের অনুসন্ধান ও শান্তা হোল্ডিংসের দেওয়া তথ্যানুসারে, প্রতি তলার আয়তন ১২ হাজার বর্গফুট ধরলে ৪০ তলা ভবনে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুট। বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হলে যার দাম হবে প্রায় ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা।
নকশা অনুমোদনে যারা
রাজউকের নকশা অনুমোদন সংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী ৪০টি ফ্ল্যাট বা ৫ হাজার বর্গফুটের বেশি হলে তা বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন (বিসি) কমিটির বৃহদায়তন প্রকল্পের দায়িত্বে হবে। এ প্রকল্পে রাজউকের সদস্য (পরিকল্পনা) বশিরুল হক ভূইয়া আহ্বায়ক ও পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১) মো. মনিরুল হক সদস্যসচিব। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন) মো. নূরুল ইসলাম, নগর পরিকল্পনাবিদ নূরে খোদা, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ডিজাইন), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের একজন সদস্য, ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট বাংলাদেশ এর সদস্য এবং সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য রাজউকের নকশা অনুমোদনের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১) ও সদস্য সচিব (বৃহদায়তন প্রকল্প) মো. মনিরুল হকের মোবাইলে বুধবার (২৮ জানুয়ারি) ফোন করা হলে তিনি ধরেননি। বিস্তারিত লিখে তার মোবাইলে বেশ কয়েকবার খুদেবার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি।
যা দেখা গেলো
সরেজমিন গুলশান এক নম্বরের গোলচত্বর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ভাঙা শপিং কমপ্লেক্সের পিলার এখনো সেখানে আছে। সেই অবস্থায় পুরো জায়গাটি টিন দিয়ে ঘিরে রেখে নিজেদের বিলবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে শান্তা হোল্ডিংস। নিরাপত্তার জন্য রয়েছে সিকিউরিটি গার্ড। টিনের বেড়ার দরজায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ‘অনুমোদিত ব্যক্তির প্রবেশ’ লেখা সাইনবোর্ড। ভেতরে রাখা হয়েছে অবকাঠামো নির্মাণ করার জন্য রড ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। আছে নির্মাণ সংক্রান্ত কাজে ব্যবহৃত নানা ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি।

এই প্লটগুলোর বিপরীত দিকে রয়েছে জব্বার টাওয়ার। এই টাওয়ারের নিচে ভ্রাম্যমাণ সিগারেটের দোকান নিয়ে বসেছেন সুমন। প্লটগুলোতে শান্তা হোল্ডিংসের কর্মতৎপরতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন দেখি এখানে বিল্ডিং তৈরির জন্য জিনিসপত্র ট্রাকভর্তি করে ভেতরে নেওয়া হয়। শুনেছি বরাদ্দ দেওয়ার কাজও শুরু করছে।’
আম-মোক্তারনামা বাতিলের মামলা নিষ্পত্তি না হলে প্লট একত্রীকরণের আবেদন গ্রহণের সুযোগ নেই, শুরুতেই তা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। ওই প্লটগুলোতে শান্তা হোল্ডিংসের বিলবোর্ড টানানো বা গ্রাউন্ড ওয়াল তৈরির কাজের কোনো এখতিয়ার নেই। আমি এই পদে যোগদান করেছি ১৫ দিন হলো। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিলে সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে
মো. হাসানুর রেজা অথরাইজড কর্মকর্তা (জোন-৪), রাজউক
এ বিষয়ে সোমবার (২৬ জানুয়ারি) বিকালে রাজউকের জোন-৪-এর অথরাইজড কর্মকর্তা মো. হাসানুর রেজার মোবাইলে কল করে জানতে চাইলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আম-মোক্তারনামা বাতিলের মামলা নিষ্পত্তি না হলে প্লট একত্রীকরণের আবেদন গ্রহণ করার সুযোগ নেই। শুরুতেই তা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। ওই প্লটগুলোতে শান্তা হোল্ডিংসের বিলবোর্ড টানানো বা গ্রাউন্ড ওয়াল তৈরির কাজের কোনো এখতিয়ার নেই। আমি এই পদে যোগদান করেছি ১৫ দিন হলো। লিখিত অভিযোগ জমা দিলে সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।’
গুলশান গোল চত্বরে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ নিয়ে কথা বলার জন্য শান্তা হোল্ডিংসের নির্বাহী পরিচালক (গ্রুপ ফাইন্যান্স) এম. আনিসুল হকের মুঠোফোনে বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় কল করা হলেও তিনি ধরেননি। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তার মুঠোফোনে খুদেবার্তা পাঠানো হলে সাড়া দিয়ে লেখেন, ‘আমি এখন বাংলাদেশে নেই।’




