নারায়ণগঞ্জে সাড়ে ৬ হাজার পুকুর উধাও

নারায়ণগঞ্জে সাড়ে ৬ হাজার পুকুর উধাও
রাসেল আহমেদ-রূপগঞ্জ (নারায়গঞ্জ) প্রতিনিধি

নারায়ণগঞ্জ জেলার থানা পুকুর পাড়। জেলার সবার কাছেই একটা পরিচিত নাম এটি। এ পুকুর একসময় সৌন্দর্যবর্ধন করে রেখেছিলো শহরকে। অথচ খোদ সিটি কর্পোরেশন থানা পুকুর ভরাট করে ফেলে। সেখানে গড়ে তুলেছে অট্টালিকা আর ভবন। শুধু থানা পুকুরই নয়। প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত জেলা নারায়ণগঞ্জে পুকুর ভরাট এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। খাল-বিল, নদ-নদীর জেলা বলা হতো নারায়ণগঞ্জকে।
তবে গোটা জেলাজুড়ে পুকুরের আধিক্য ছিলো অনেক বেশি। পুকুরের সঠিক সংখ্যা নিয়ে রয়েছে গরমিল। এসব পুকুর এখন ভরাট চলছে। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অহরহ ভরাট করা হচ্ছে পুকুর। ভরাটের কারণে নারায়ণগঞ্জের জলবায়ুর প্রভাব ও পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। বাড়ছে তাপমাত্রা। ভূ-গর্ভস্থরের পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ভরাটের পাশাপাশি পুকুর খনন ও সংস্থারের নামে টেষ্ট রিলিফ (টিআর) ও কাজের বিনিময়ে খাদ্যের (কাবিটা) দেওয়া বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। শুধু গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের কয়েকটি জেলায় পুকুর খনন ও সংস্কারের জন্য ৬২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিলো। কোনোটা নামকাওয়াস্তে কাজ দেখিয়ে আবার কোনোটার সংস্কার না করেই টাকা নয়ছয় করা হয়েছে- এমনটাই সিটিজেন জার্নালের অনুসন্ধানে তথ্য মিলেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলায় দুই যুগ আগেও পুকুর ছিলো ১০ হাজারের বেশি। তবে এ সংখ্যা নিয়েও রয়েছে নানা মত। একেক দপ্তরের কাছে রয়েছে একেক রকম তথ্য। জেলার ওয়েবসাইটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ জেলায় পুকুর রয়েছে ৮২৩১টি। এর মধ্যে সরকারি পুকুর রয়েছে ৮৭টি। কিন্তু জেলার উপজেলা মৎস্য অফিসগুলো দেয় ভিন্ন তথ্য।
উপজেলার মৎস্য অফিস সূত্রমতে, জেলায় ৭ হাজারের ওপরে পুকুর রয়েছে। বেসরকারি একটি জরিপ সংস্থা বলছে, নারায়ণগঞ্জে দুই হাজারের ওপরে পুকুর রয়েছে। বেশ কয়েকটি উপজেলায় ঘুরে শতাধিক মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলায় দেড় হাজারের ওপরে পুকুর রয়েছে। একমাত্র আড়াইহাজার উপজেলায় এখনো অনেক পুকুর রয়েছে। বাকি উপজেলাগুলোতে কালেভদ্রে পুকুরের দেখা মিলে।
নলকূপে নেই পানি
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের উপজেলার নলকূপগুলোতে এখন আগের মতো পানি নেই। একসময় ১৫০ ফুট গভীরতার পাইপ স্থাপন করলে অনায়াসে স্বচ্ছ পানি উঠতো। এখন ৪০০ থেকে ৪৫০ ফুট পাইপ স্থাপন করার পরও পানি উঠছে না।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর কর্মকর্তারা বলছেন, ভূ-গর্ভস্থের পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণেই নলকূপে পানি উঠছে না। একটা সময় আসবে যখন পানির হাহাকার দেখা দিবে। এর কারণ হিসেবে তারা পুকুর ও জলাশয় ভরাটকে দায়ী করছেন। ফলে নারায়ণগঞ্জে গভীর নলকূপ বাড়ছে বছরের পর বছর ধরে।
রূপগঞ্জ উপজেলার জনস্বাস্থ্য অফিসের সূত্রমতে, এ উপজেলায় ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩৩০টি নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২৫১টি ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৯০টি এবং গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৪৩টি নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব নলকূপের অধিকাংশই অকেজো হয়ে গেছে কিংবা পানি উঠছে না।

আড়াইহাজার জনস্বাস্থ্য অফিস সূত্রমতে, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজস্ব প্রকল্পের আওতায় ২০০টি সাবমারসিবল পাম্পযুক্ত নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাকী উপজেলাগুলোতে একই চিত্র বিরাজমান বলে জানা গেছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, পানি উঠবে কোথা থেকে। নলকূপ নিয়েও নয়ছয় হয়। পুকুরগুলো ভরাটের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে।
রূপগঞ্জ উপজেলা জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা মুকিত হোসেন বলেন, নারায়ণগঞ্জে পানির স্তর নামার গতি অস্বাভাবিক ভাবে কমেছে। ১৯৯৫ সালে ছিলো ২৫ মিটার, ২০০৫ সালে ছিলো ৪৫ মিটার, ২০১০ সালে ছিলো ৬০ মিটার, ২০২৩ সালে ৭৫ মিটার। এভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে নেমে যেতে পারে ১২০ মিটারে।
পানির পেছনে যাচ্ছে হাজার হাজার টাকা
নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক পরিবার কিনে খাচ্ছেন পানি। এতে মাসে গড়ে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। আবার অনেক বাড়িতে বাসাভাড়া ছাড়াও পানি বাবদ আলাদা চার্জ দিতে হয়। কিন্তু সেবার মান নেই বললেই চলে।
হাজীগঞ্জ এলাকায় বসবাস করেন মনির হোসেন। পেশায় ছোটখাটো চাকুরীজীবি। মাসের মাইনে দিয়ে কোনোমতে চলে যায় সংসার। এখন তার বাড়তি খরচ পানি কেনা। তিনি বলেন, পানির পেছনে খরচ হচ্ছে হাজার টাকা। ওয়াসার যে পানি তা খাওয়াতো দূরের কথা ব্যবহারেরও অযোগ্য। ছোটবেলা দেখতাম মা পুকুরের পানি এনে ফুটিয়ে খাওয়াতো। এ পানি দিয়ে রান্নাবান্না, গোসল সব চলতো। পুকুরগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় দিন দিন পানির সংকট দেখা দিচ্ছে।
ওয়াসার পানি নিয়ে সংশয়
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরে বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছে। ওয়াসার পানি ব্যবহার করে অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার করছে। ওয়াসার পানি শুধু পান করার অযোগ্যই নয়, এ পানি দিয়ে গোসল কিংবা মুখ ধোওয়া সমস্যা হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকা ওয়াসা নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের পানি সরবরাহ কার্যক্রম শুরু করে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ৭১.৮৮ কোটি ব্যয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। পানির সংকট মোকাবেলায় সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। অথচ লাখ লাখ বাসিন্দা মাস শেষে বিল গুণছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলার আমলাপাড়া এলাকার ৬২ বছরের বাসিন্দা করম আলী বলেন, বাজান ছোটকালে আমরা পুষ্কনিতে গোসল করছি। কোনো বিল দেওন লাগে নাই। অহন বিল দেই। হেরপরেও পানি পাই না ঠিক মতন। পাইলেও পানি ভালা না। পুষ্কনি থাকলেই ভালা অইতো।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, একটু সমস্যাতো হবেই। আমরা চেষ্টা করছি যেনো এটা দ্রুত সমাধান করা যায়।
জলবায়ু ও পরিবেশ বিপর্যয়
পুকুর ভরাটের কারণে জলবায়ুর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এতে করে জলসংকট বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় তাপমাত্রা বাড়ে। পুকুর জল সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্থানীয় জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
মুড়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইসহাক মিয়া বলেন, পুকুর ভরাট হলে পানি সঞ্চয়ের ক্ষমতা কমে যায়, ফলে জলসংকট দেখা দেয়। পুকুর জলীয় বাষ্প তৈরি করে, যা বায়ুমন্ডলে তাপমাত্রাকে প্রভাবিত করে। পুকুর কমে গেলে স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হতে পারে। জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তাই পুকুর কমে গেলে জীববৈচিত্র্য হ্রাস পায়। সেচ ব্যবস্থা দুর্বল হয়, যা কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পুকুর ভরাটের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন হয়। পুকুর ভরাটের ফলে পরিবেশে কার্বন ডাই অক্সাইড এর পরিমাণ বেড়ে যায়, যা গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

নারায়ণগঞ্জের তাপমাত্রার ইতিহাস দেখা গেছে, জেলায় গড়ে তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে কোনো সময় ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। এখন থেকে দুই যুগ আগে নারায়ণগঞ্জে গড় তাপমাত্রা ছিলো ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর এখানে গড় বৃষ্টিপাত ২৩৭৬ মিলিমিটার। এর কারণ হিসাবে পুকুর ও জলাশয় ভরাটকে দায়ী করছেন ভূগোলবিদ ইসহাক মিয়া।
কমে গেছে মাছের চাহিদা
জেলা ও উপজেলার মৎস্য অফিসগুলো সূত্রমতে, নারায়ণঞ্জ জেলায় বাৎসরিক মাছের চাহিদা ৫৪ হাজার ৮৩৭ মেট্রিক টন। বাৎসরিক মাছের মোট উৎপাদন ১৮ হাজার ৬৬০ মেট্রিক টন। বাৎসরিক ঘাটতি রয়েছে ৩৬ হাজার ১৭৭ মেট্রিক টন। মৎস্য অফিসার ও মৎস্যজীবিরা বলছেন, পুকুরগুলোতে একসময় মাছের চাষ হতো। এতে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করা হতো। যতগুলো পুকুরর ভরাট করা হয়েছে তাতে নারায়ণগঞ্জে মাছের ঘাটতি অনেকটা লাগব হতো।
রূপগঞ্জ উপজেলা মৎস্য অফিসার আলমগীর হোসেন বলেন, একটা মাঝারি সাইজের পুকুরে সারা বছরে সাড়ে ৫ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। সে হিসাবে সাড়ে ৬ হাজার পুকুরে গড়ে ৩৩ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন সম্ভব হতো। ঘাটতি থাকতো ৩ হাজার মেট্রিক টন মাছ।
পুকুরে মাছ চাষ করেন এমন একজন তালাশকুর এলাকার জয়নাল মিয়া। তিনি বলেন, সারা বছরে যাবতীয় খরচ পড়ে ৪ থেকে সোয়া ৪ লাখ টাকার মতো। একটা পুকুরে সারা বছরে ৫ থেকে ৭ হাজার কেজি মাছ উৎপাদন হয়। একেবারে কমে ১৩০ টাকা দরে বিক্রি করা হলে দাম আসে সাড়ে ৭ লাখ টাকা। লাভ আসে ২ লাখ ৯০ হাজার টাকার মতো।
মৎস্যখামারী জয়নালের হিসাব অনুযায়ী, সাড়ে ৬ হাজার পুকুর থেকে গড়ে বছরে আয় হতো ১৭৪ কোটি টাকা।
পুকুর ভরাটে বালু বাণিজ্য
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুকুর ভরাটকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বালু বাণিজ্যের সিন্ডিকেট। উপজেলার প্রত্যেক এলাকায় এক শ্রেণির ঠিকাদার পুকুর ভরাটে উদ্বুদ্ধ করে। ‘পুকুর রেখে লাভ নেই, ভরাট করে ভবন কিংবা মার্কেট নির্মাণ করলে আয় হবে’ এমন লোভনীয় প্রলোভন দেখিয়ে পুকুর ভরাট করে।
বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এমন একজন ইকবাল হোসেন। কথা হয় তার সঙ্গে। তার হিসাব মতে, একবিঘা আয়তন ও দশ ফুট গভীর একটা পুকুর ভরাট করতে কমপক্ষে এক লাখ ৪০ হাজার ফুট বালুর প্রয়োজন হয়। এক ফুট বালুর জন্য সব মিলিয়ে খরচ পড়ে ১২ টাকা। সে ক্ষেত্রে একবিঘা আয়তনের পুকুর ভরাট করতে খরচ পড়ে ১৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা। সাড়ে ৬ হাজার পুকুর ভরাট করতে লেনদেন হয়েছে এক হাজার ৯২ কোটি টাকা।
স্থানীয়রা বলছেন, শহরায়ন, নগরায়ন ও অসেচতনতার কারলেই ক্রমে পুকুর ভরাট হয়ে যাচ্ছে। জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে পুকুর ভরাট করে গড়ে উঠছে বসতি।
আইন কী বলে?
জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি সব পুকুর ভরাটের একটা নীতিমালা ব্রিটিশ আমল থেকেই আছে। প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী. কোন পুকুর, জলাশয় ভরাট করা বেআইনি। আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গায় শ্রেণি পরিবর্তন বা অন্য কোনভাবে ব্যবহার, ভাড়া. ইজারা বা হস্তান্তর বেআইনি। কোন ব্যক্তি এই বিধান লঙ্ঘন করলে আইনের ৮ ও ১২ ধারা অনুযায়ী পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (২০১০ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী, যেকোন ধরনের জলাশয় ভরাট করা নিষিদ্ধ।
নারায়ণগঞ্জ জেলার আইনজীবি অ্যাডভোকেট আবুল বাশার রুবেল বলেন, নীতিমালা অনুসারে সরকারি ও বেসরকারি মালিকানাধীন কোন পুকুর ইচ্ছা করলেই ভরাট করা যাবে না। আইন লঙ্ঘন করলে শাস্তির বিধান রয়েছে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে সমস্যা
নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চলখ্যাত এলাকা। জেলা শহরসহ উপজেলাগুলোতে দেশের বড় বড় শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, নারায়ণগঞ্জে মোট শিল্প ইউনিট সংখ্যা ২৪০৯টি। রয়েছে ৩৬টি গার্মেন্টস, ১৭৫টি টেক্সটাইল, ১৮৯৫টি নিট ফ্যাক্টরি। প্রায়শ এসব শিল্পকারখানা কিংবা গার্মেন্ট শিল্পে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। শুধু শিল্পকারখানা নয়। বাসাবাড়ি কিংবা মার্কেটেও আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।
ফায়ার সার্ভিসের একটি সূত্র দাবি করেছে, গত ৫ বছরে নারায়ণগঞ্জে ১৪৩২টি আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। গত ২০২১ সালে নারায়ণগঞ্জে ৬৯৪টি আগুনের ঘটনা ঘটে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিলো ১৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। গত ২০২২ সালে ৫৯৩টি আগুনের ঘটনা ঘটে। এতে ক্ষতি হয় ৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এসব আগুনের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, আশপাশে ডোবা কিংবা পুকুর না থাকার কারণে ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়েছে। অধিকাশ শিল্পকারখানা কিংবা গার্মেন্টের সামনে নেই কোন পুকুর। ফলে আগুন লাগলে অগ্নিনির্বাপনের জন্য কোন পানির ব্যবস্থা থাকে না। পুকুর ভরাটের কারণে ফায়ার সার্ভিসের ওপড় বেশ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পুকুরগুলো অগ্নিনির্বাপণে ব্যবহৃত পানির প্রধান উৎস হিসাবে কাজ করে। তাই পুকুর ভরাট হলে আগুন নেভানোর জন্য পানির অভাব দেখা দেয়। ফলে ফায়ার সার্ভিসের কার্যকারিতা কমে যায়।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আরেফিন বলেন, পানির সংকটির কারণে আগুণ নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়। পুকুর বা জলাশয় থাকলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সহজ হয়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হয়।
পুকুর খনন-সংস্কারে দুর্নীতি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি পুকুর সংস্কারে টেষ্ট রিলিফ (টিআর) বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রতি অর্থবছরে। প্রতি অর্থবছরে একেক উপজেলায় চার থেকে পাঁচটি পুকুর সংস্কারের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হতো। এসব বরাদ্দের তালিকা প্রণয়ন করতো মৎস্য অফিস, উপজেলা জনস্বাস্থ্য অফিস, প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস ও উপজেলা প্রকৌশলী অফিস। বিগত ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে নারায়ণগঞ্জেও তিনটি উপজেলার পুকুর সংস্কারে সাড়ে ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরমধ্যে রূপগঞ্জ উপজেলার কিন্নরী রেষ্ট হাউজের পুকুর সংস্কারে ২ লাখ টাকা টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। আড়াইহাজারের রামচন্দ্রদি আশ্রায়ণ প্রকল্প সংলগ্ন সরকারি পুকুর সংস্কারে এক লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এছাড়া সোনারগাঁও উপজেলার পিরোজপুরের ইসলামপুর আশ্রায়ণ প্রকল্পের পুকুর সংস্কারের দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরেজমিনে তিনটি পুকুরে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোন খনন বা সংস্কারই হয়নি। বরাদ্দ এসেছে এটাও কেউ জানতো না। এই টাকা নেতারা গিলে ফেলেছে। ঢাকার পাশে ধামরাই, কেরানীগঞ্জ ও দোহার উপজেলার জন্য সাড়ে ৯ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছিলো। বিগত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের টেষ্ট রিলিফ (টিআর) খাত খতিয়ে দেখা গেছে, এ অর্থবছরে রাজধানী ও আশপাশের কয়েকটি জেলায় পুকুর সংস্কারে লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
ঢাকার নবাবগঞ্জ দিঘীরপাড়া খাস পুকুর, জালেশ্বর পুকুর খনন ও ধামরাই পুকুর সংস্কারে সাড়ে ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গাজীপুরের আউচপাড়া খাস পুকুর সংস্কার বাবদ ৩ লাখ টাকা, নরসিংদী জেলার সাগরদী খাস পুকুর, রায়পুরা ধুকুন্দিরচর পুকুর, মনোহরদী জামালপুর পুকুর ও শিবপুর আলিায়াবাদ পুকুর সংস্কার বাবদ ৪ লাখ টাকা, মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলা ভূমি অফিসের খাস পুকুর, সদর উপজেলার পঞ্চসার খাস পুকুর, আবদুল্লাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের পুকুর সংস্কার বাবদ ৬ লাখ টাকা, মানিকগঞ্জ জেলার দাশড়া খাস পুকুর, সাটুরিয়া ধানকোড়া খাস পুকুর, সাটুরিয়া জগন্নাথপুর খাস পুকুর, সিংগাইর আঠালিয়া খাস পুকুর, সিংগাইর আঠালিয়া খাস পুকুর-২ সংস্কার বাবদ ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা, টাঙ্গাইল জেলার ডিসি পুকুর, নাগরপুর উপেন্দ্রে সরোবর পুকুর, আকুর টাকুর পুকুর, ধুল পুকুর, ধুল পুকুর-২ সংস্কার বাবদ ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
একইভাবে কিশোরগঞ্জ জেলায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা, ফরিদপুর জেলায় ৬ লাখ ২৮ হাজার, মাদারীপুর জেলায় ৬ লাখ টাকা, শরীয়তপুর জেলায় ৩ লাখ, গোপালগঞ্জ জেলায় ৩ লাখ, রাজবাড়ি জেলায় ৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এটাতো শুধু ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের চিত্র। গত ২০২৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সহকারী কমিশনার (উন্নয়ন) সৈয়দা সালেহা নূর স্বাক্ষরিত টিআর প্রকল্পের প্রথম কিস্তি উপবরাদ্দ প্রদান করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক্সেভেটর দিয়ে পুকুর খনন, একটি সিড়িঁ বাঁধানো ঘাট, চারপাশে রেলিং ও ব্লক বসানো কাজে সর্বসমেত ৬০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এ প্রতিবেদক খোঁজ নিয়েছে ব্লক নেওয়া প্রতিষ্ঠান ও এক্সেভেটরের মালিকের সঙ্গে। তবে তারা এ বিষয়ে কোন কথা বা ভাউচার কপি দিতে রাজি হননি। তাদের কথায় অনেকটা গরমিল ছিলো।
যা বললেন কর্মকর্তারা
রূপগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, আমার সময়ে পুকুর সংস্কারে কোন বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তবে পুরনো ফাইল খুঁজলে হয়তো পাওয়া যাবে। পুকুর ভরাট পরিবেশসহ সবদিক দিয়ে ক্ষতি। কিন্তু আমরা বুঝাতে গেলেও তারা বুঝতে চায় না।
রূপগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প অফিসার আইমিন সুলতানা বলেন, আমি নতুন এসেছি। জানা নেই।
রূপগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আওলাদ হোসেন বলেন, উপজেলা পুকুরের তথ্য আছে। তবে কতো টাকার কাজ হয়েছে সেটা আমি জানি না। কারণ আমার পূর্ববর্তী অফিসারের সময় এটার সংস্কার হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. ফজলুল কাবীর বলেন, কেউ যদি তার পুকুর ভরাট করে ফেলে আমাদের কি করার থাকে বলেন ? আমরা বুঝানোর চেষ্টা করি। কে শুনে কার কথা!
নারায়ণগঞ্জ জেলার পরিবেশকর্মী ও কবি আরিফ বুলবুল বলেন, আইন আছে। কিন্তু প্রয়োগ নেই। একবারেই এ আইন মানা হচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনও বেশ কিছু পুকুর ভরাট করেছিলো।
নারায়ণগঞ্জ জেলার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ এইচ এম রাশেদ বলেন, সাধারণ ব্যক্তিগত পুকুর ভরাটে আমরা কোন অভিযোগ পাই না। তবে পেলে ব্যবস্থা নিবো। পুকুর ভরাটের কারণে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। তাপমাত্রা বাড়ছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলার থানা পুকুর পাড়। জেলার সবার কাছেই একটা পরিচিত নাম এটি। এ পুকুর একসময় সৌন্দর্যবর্ধন করে রেখেছিলো শহরকে। অথচ খোদ সিটি কর্পোরেশন থানা পুকুর ভরাট করে ফেলে। সেখানে গড়ে তুলেছে অট্টালিকা আর ভবন। শুধু থানা পুকুরই নয়। প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত জেলা নারায়ণগঞ্জে পুকুর ভরাট এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। খাল-বিল, নদ-নদীর জেলা বলা হতো নারায়ণগঞ্জকে।
তবে গোটা জেলাজুড়ে পুকুরের আধিক্য ছিলো অনেক বেশি। পুকুরের সঠিক সংখ্যা নিয়ে রয়েছে গরমিল। এসব পুকুর এখন ভরাট চলছে। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অহরহ ভরাট করা হচ্ছে পুকুর। ভরাটের কারণে নারায়ণগঞ্জের জলবায়ুর প্রভাব ও পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। বাড়ছে তাপমাত্রা। ভূ-গর্ভস্থরের পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ভরাটের পাশাপাশি পুকুর খনন ও সংস্থারের নামে টেষ্ট রিলিফ (টিআর) ও কাজের বিনিময়ে খাদ্যের (কাবিটা) দেওয়া বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। শুধু গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের কয়েকটি জেলায় পুকুর খনন ও সংস্কারের জন্য ৬২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিলো। কোনোটা নামকাওয়াস্তে কাজ দেখিয়ে আবার কোনোটার সংস্কার না করেই টাকা নয়ছয় করা হয়েছে- এমনটাই সিটিজেন জার্নালের অনুসন্ধানে তথ্য মিলেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলায় দুই যুগ আগেও পুকুর ছিলো ১০ হাজারের বেশি। তবে এ সংখ্যা নিয়েও রয়েছে নানা মত। একেক দপ্তরের কাছে রয়েছে একেক রকম তথ্য। জেলার ওয়েবসাইটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ জেলায় পুকুর রয়েছে ৮২৩১টি। এর মধ্যে সরকারি পুকুর রয়েছে ৮৭টি। কিন্তু জেলার উপজেলা মৎস্য অফিসগুলো দেয় ভিন্ন তথ্য।
উপজেলার মৎস্য অফিস সূত্রমতে, জেলায় ৭ হাজারের ওপরে পুকুর রয়েছে। বেসরকারি একটি জরিপ সংস্থা বলছে, নারায়ণগঞ্জে দুই হাজারের ওপরে পুকুর রয়েছে। বেশ কয়েকটি উপজেলায় ঘুরে শতাধিক মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলায় দেড় হাজারের ওপরে পুকুর রয়েছে। একমাত্র আড়াইহাজার উপজেলায় এখনো অনেক পুকুর রয়েছে। বাকি উপজেলাগুলোতে কালেভদ্রে পুকুরের দেখা মিলে।
নলকূপে নেই পানি
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের উপজেলার নলকূপগুলোতে এখন আগের মতো পানি নেই। একসময় ১৫০ ফুট গভীরতার পাইপ স্থাপন করলে অনায়াসে স্বচ্ছ পানি উঠতো। এখন ৪০০ থেকে ৪৫০ ফুট পাইপ স্থাপন করার পরও পানি উঠছে না।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর কর্মকর্তারা বলছেন, ভূ-গর্ভস্থের পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণেই নলকূপে পানি উঠছে না। একটা সময় আসবে যখন পানির হাহাকার দেখা দিবে। এর কারণ হিসেবে তারা পুকুর ও জলাশয় ভরাটকে দায়ী করছেন। ফলে নারায়ণগঞ্জে গভীর নলকূপ বাড়ছে বছরের পর বছর ধরে।
রূপগঞ্জ উপজেলার জনস্বাস্থ্য অফিসের সূত্রমতে, এ উপজেলায় ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩৩০টি নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২৫১টি ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৯০টি এবং গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৪৩টি নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব নলকূপের অধিকাংশই অকেজো হয়ে গেছে কিংবা পানি উঠছে না।

আড়াইহাজার জনস্বাস্থ্য অফিস সূত্রমতে, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজস্ব প্রকল্পের আওতায় ২০০টি সাবমারসিবল পাম্পযুক্ত নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাকী উপজেলাগুলোতে একই চিত্র বিরাজমান বলে জানা গেছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, পানি উঠবে কোথা থেকে। নলকূপ নিয়েও নয়ছয় হয়। পুকুরগুলো ভরাটের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে।
রূপগঞ্জ উপজেলা জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা মুকিত হোসেন বলেন, নারায়ণগঞ্জে পানির স্তর নামার গতি অস্বাভাবিক ভাবে কমেছে। ১৯৯৫ সালে ছিলো ২৫ মিটার, ২০০৫ সালে ছিলো ৪৫ মিটার, ২০১০ সালে ছিলো ৬০ মিটার, ২০২৩ সালে ৭৫ মিটার। এভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে নেমে যেতে পারে ১২০ মিটারে।
পানির পেছনে যাচ্ছে হাজার হাজার টাকা
নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক পরিবার কিনে খাচ্ছেন পানি। এতে মাসে গড়ে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। আবার অনেক বাড়িতে বাসাভাড়া ছাড়াও পানি বাবদ আলাদা চার্জ দিতে হয়। কিন্তু সেবার মান নেই বললেই চলে।
হাজীগঞ্জ এলাকায় বসবাস করেন মনির হোসেন। পেশায় ছোটখাটো চাকুরীজীবি। মাসের মাইনে দিয়ে কোনোমতে চলে যায় সংসার। এখন তার বাড়তি খরচ পানি কেনা। তিনি বলেন, পানির পেছনে খরচ হচ্ছে হাজার টাকা। ওয়াসার যে পানি তা খাওয়াতো দূরের কথা ব্যবহারেরও অযোগ্য। ছোটবেলা দেখতাম মা পুকুরের পানি এনে ফুটিয়ে খাওয়াতো। এ পানি দিয়ে রান্নাবান্না, গোসল সব চলতো। পুকুরগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় দিন দিন পানির সংকট দেখা দিচ্ছে।
ওয়াসার পানি নিয়ে সংশয়
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরে বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছে। ওয়াসার পানি ব্যবহার করে অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার করছে। ওয়াসার পানি শুধু পান করার অযোগ্যই নয়, এ পানি দিয়ে গোসল কিংবা মুখ ধোওয়া সমস্যা হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকা ওয়াসা নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের পানি সরবরাহ কার্যক্রম শুরু করে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ৭১.৮৮ কোটি ব্যয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। পানির সংকট মোকাবেলায় সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। অথচ লাখ লাখ বাসিন্দা মাস শেষে বিল গুণছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলার আমলাপাড়া এলাকার ৬২ বছরের বাসিন্দা করম আলী বলেন, বাজান ছোটকালে আমরা পুষ্কনিতে গোসল করছি। কোনো বিল দেওন লাগে নাই। অহন বিল দেই। হেরপরেও পানি পাই না ঠিক মতন। পাইলেও পানি ভালা না। পুষ্কনি থাকলেই ভালা অইতো।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, একটু সমস্যাতো হবেই। আমরা চেষ্টা করছি যেনো এটা দ্রুত সমাধান করা যায়।
জলবায়ু ও পরিবেশ বিপর্যয়
পুকুর ভরাটের কারণে জলবায়ুর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এতে করে জলসংকট বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় তাপমাত্রা বাড়ে। পুকুর জল সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্থানীয় জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
মুড়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইসহাক মিয়া বলেন, পুকুর ভরাট হলে পানি সঞ্চয়ের ক্ষমতা কমে যায়, ফলে জলসংকট দেখা দেয়। পুকুর জলীয় বাষ্প তৈরি করে, যা বায়ুমন্ডলে তাপমাত্রাকে প্রভাবিত করে। পুকুর কমে গেলে স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হতে পারে। জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তাই পুকুর কমে গেলে জীববৈচিত্র্য হ্রাস পায়। সেচ ব্যবস্থা দুর্বল হয়, যা কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পুকুর ভরাটের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন হয়। পুকুর ভরাটের ফলে পরিবেশে কার্বন ডাই অক্সাইড এর পরিমাণ বেড়ে যায়, যা গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

নারায়ণগঞ্জের তাপমাত্রার ইতিহাস দেখা গেছে, জেলায় গড়ে তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে কোনো সময় ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। এখন থেকে দুই যুগ আগে নারায়ণগঞ্জে গড় তাপমাত্রা ছিলো ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর এখানে গড় বৃষ্টিপাত ২৩৭৬ মিলিমিটার। এর কারণ হিসাবে পুকুর ও জলাশয় ভরাটকে দায়ী করছেন ভূগোলবিদ ইসহাক মিয়া।
কমে গেছে মাছের চাহিদা
জেলা ও উপজেলার মৎস্য অফিসগুলো সূত্রমতে, নারায়ণঞ্জ জেলায় বাৎসরিক মাছের চাহিদা ৫৪ হাজার ৮৩৭ মেট্রিক টন। বাৎসরিক মাছের মোট উৎপাদন ১৮ হাজার ৬৬০ মেট্রিক টন। বাৎসরিক ঘাটতি রয়েছে ৩৬ হাজার ১৭৭ মেট্রিক টন। মৎস্য অফিসার ও মৎস্যজীবিরা বলছেন, পুকুরগুলোতে একসময় মাছের চাষ হতো। এতে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করা হতো। যতগুলো পুকুরর ভরাট করা হয়েছে তাতে নারায়ণগঞ্জে মাছের ঘাটতি অনেকটা লাগব হতো।
রূপগঞ্জ উপজেলা মৎস্য অফিসার আলমগীর হোসেন বলেন, একটা মাঝারি সাইজের পুকুরে সারা বছরে সাড়ে ৫ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। সে হিসাবে সাড়ে ৬ হাজার পুকুরে গড়ে ৩৩ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন সম্ভব হতো। ঘাটতি থাকতো ৩ হাজার মেট্রিক টন মাছ।
পুকুরে মাছ চাষ করেন এমন একজন তালাশকুর এলাকার জয়নাল মিয়া। তিনি বলেন, সারা বছরে যাবতীয় খরচ পড়ে ৪ থেকে সোয়া ৪ লাখ টাকার মতো। একটা পুকুরে সারা বছরে ৫ থেকে ৭ হাজার কেজি মাছ উৎপাদন হয়। একেবারে কমে ১৩০ টাকা দরে বিক্রি করা হলে দাম আসে সাড়ে ৭ লাখ টাকা। লাভ আসে ২ লাখ ৯০ হাজার টাকার মতো।
মৎস্যখামারী জয়নালের হিসাব অনুযায়ী, সাড়ে ৬ হাজার পুকুর থেকে গড়ে বছরে আয় হতো ১৭৪ কোটি টাকা।
পুকুর ভরাটে বালু বাণিজ্য
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুকুর ভরাটকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বালু বাণিজ্যের সিন্ডিকেট। উপজেলার প্রত্যেক এলাকায় এক শ্রেণির ঠিকাদার পুকুর ভরাটে উদ্বুদ্ধ করে। ‘পুকুর রেখে লাভ নেই, ভরাট করে ভবন কিংবা মার্কেট নির্মাণ করলে আয় হবে’ এমন লোভনীয় প্রলোভন দেখিয়ে পুকুর ভরাট করে।
বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এমন একজন ইকবাল হোসেন। কথা হয় তার সঙ্গে। তার হিসাব মতে, একবিঘা আয়তন ও দশ ফুট গভীর একটা পুকুর ভরাট করতে কমপক্ষে এক লাখ ৪০ হাজার ফুট বালুর প্রয়োজন হয়। এক ফুট বালুর জন্য সব মিলিয়ে খরচ পড়ে ১২ টাকা। সে ক্ষেত্রে একবিঘা আয়তনের পুকুর ভরাট করতে খরচ পড়ে ১৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা। সাড়ে ৬ হাজার পুকুর ভরাট করতে লেনদেন হয়েছে এক হাজার ৯২ কোটি টাকা।
স্থানীয়রা বলছেন, শহরায়ন, নগরায়ন ও অসেচতনতার কারলেই ক্রমে পুকুর ভরাট হয়ে যাচ্ছে। জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে পুকুর ভরাট করে গড়ে উঠছে বসতি।
আইন কী বলে?
জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি সব পুকুর ভরাটের একটা নীতিমালা ব্রিটিশ আমল থেকেই আছে। প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী. কোন পুকুর, জলাশয় ভরাট করা বেআইনি। আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গায় শ্রেণি পরিবর্তন বা অন্য কোনভাবে ব্যবহার, ভাড়া. ইজারা বা হস্তান্তর বেআইনি। কোন ব্যক্তি এই বিধান লঙ্ঘন করলে আইনের ৮ ও ১২ ধারা অনুযায়ী পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (২০১০ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী, যেকোন ধরনের জলাশয় ভরাট করা নিষিদ্ধ।
নারায়ণগঞ্জ জেলার আইনজীবি অ্যাডভোকেট আবুল বাশার রুবেল বলেন, নীতিমালা অনুসারে সরকারি ও বেসরকারি মালিকানাধীন কোন পুকুর ইচ্ছা করলেই ভরাট করা যাবে না। আইন লঙ্ঘন করলে শাস্তির বিধান রয়েছে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে সমস্যা
নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চলখ্যাত এলাকা। জেলা শহরসহ উপজেলাগুলোতে দেশের বড় বড় শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, নারায়ণগঞ্জে মোট শিল্প ইউনিট সংখ্যা ২৪০৯টি। রয়েছে ৩৬টি গার্মেন্টস, ১৭৫টি টেক্সটাইল, ১৮৯৫টি নিট ফ্যাক্টরি। প্রায়শ এসব শিল্পকারখানা কিংবা গার্মেন্ট শিল্পে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। শুধু শিল্পকারখানা নয়। বাসাবাড়ি কিংবা মার্কেটেও আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।
ফায়ার সার্ভিসের একটি সূত্র দাবি করেছে, গত ৫ বছরে নারায়ণগঞ্জে ১৪৩২টি আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। গত ২০২১ সালে নারায়ণগঞ্জে ৬৯৪টি আগুনের ঘটনা ঘটে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিলো ১৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। গত ২০২২ সালে ৫৯৩টি আগুনের ঘটনা ঘটে। এতে ক্ষতি হয় ৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এসব আগুনের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, আশপাশে ডোবা কিংবা পুকুর না থাকার কারণে ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়েছে। অধিকাশ শিল্পকারখানা কিংবা গার্মেন্টের সামনে নেই কোন পুকুর। ফলে আগুন লাগলে অগ্নিনির্বাপনের জন্য কোন পানির ব্যবস্থা থাকে না। পুকুর ভরাটের কারণে ফায়ার সার্ভিসের ওপড় বেশ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পুকুরগুলো অগ্নিনির্বাপণে ব্যবহৃত পানির প্রধান উৎস হিসাবে কাজ করে। তাই পুকুর ভরাট হলে আগুন নেভানোর জন্য পানির অভাব দেখা দেয়। ফলে ফায়ার সার্ভিসের কার্যকারিতা কমে যায়।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আরেফিন বলেন, পানির সংকটির কারণে আগুণ নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়। পুকুর বা জলাশয় থাকলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সহজ হয়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হয়।
পুকুর খনন-সংস্কারে দুর্নীতি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি পুকুর সংস্কারে টেষ্ট রিলিফ (টিআর) বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রতি অর্থবছরে। প্রতি অর্থবছরে একেক উপজেলায় চার থেকে পাঁচটি পুকুর সংস্কারের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হতো। এসব বরাদ্দের তালিকা প্রণয়ন করতো মৎস্য অফিস, উপজেলা জনস্বাস্থ্য অফিস, প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস ও উপজেলা প্রকৌশলী অফিস। বিগত ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে নারায়ণগঞ্জেও তিনটি উপজেলার পুকুর সংস্কারে সাড়ে ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরমধ্যে রূপগঞ্জ উপজেলার কিন্নরী রেষ্ট হাউজের পুকুর সংস্কারে ২ লাখ টাকা টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। আড়াইহাজারের রামচন্দ্রদি আশ্রায়ণ প্রকল্প সংলগ্ন সরকারি পুকুর সংস্কারে এক লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এছাড়া সোনারগাঁও উপজেলার পিরোজপুরের ইসলামপুর আশ্রায়ণ প্রকল্পের পুকুর সংস্কারের দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরেজমিনে তিনটি পুকুরে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোন খনন বা সংস্কারই হয়নি। বরাদ্দ এসেছে এটাও কেউ জানতো না। এই টাকা নেতারা গিলে ফেলেছে। ঢাকার পাশে ধামরাই, কেরানীগঞ্জ ও দোহার উপজেলার জন্য সাড়ে ৯ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছিলো। বিগত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের টেষ্ট রিলিফ (টিআর) খাত খতিয়ে দেখা গেছে, এ অর্থবছরে রাজধানী ও আশপাশের কয়েকটি জেলায় পুকুর সংস্কারে লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
ঢাকার নবাবগঞ্জ দিঘীরপাড়া খাস পুকুর, জালেশ্বর পুকুর খনন ও ধামরাই পুকুর সংস্কারে সাড়ে ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গাজীপুরের আউচপাড়া খাস পুকুর সংস্কার বাবদ ৩ লাখ টাকা, নরসিংদী জেলার সাগরদী খাস পুকুর, রায়পুরা ধুকুন্দিরচর পুকুর, মনোহরদী জামালপুর পুকুর ও শিবপুর আলিায়াবাদ পুকুর সংস্কার বাবদ ৪ লাখ টাকা, মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলা ভূমি অফিসের খাস পুকুর, সদর উপজেলার পঞ্চসার খাস পুকুর, আবদুল্লাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের পুকুর সংস্কার বাবদ ৬ লাখ টাকা, মানিকগঞ্জ জেলার দাশড়া খাস পুকুর, সাটুরিয়া ধানকোড়া খাস পুকুর, সাটুরিয়া জগন্নাথপুর খাস পুকুর, সিংগাইর আঠালিয়া খাস পুকুর, সিংগাইর আঠালিয়া খাস পুকুর-২ সংস্কার বাবদ ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা, টাঙ্গাইল জেলার ডিসি পুকুর, নাগরপুর উপেন্দ্রে সরোবর পুকুর, আকুর টাকুর পুকুর, ধুল পুকুর, ধুল পুকুর-২ সংস্কার বাবদ ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
একইভাবে কিশোরগঞ্জ জেলায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা, ফরিদপুর জেলায় ৬ লাখ ২৮ হাজার, মাদারীপুর জেলায় ৬ লাখ টাকা, শরীয়তপুর জেলায় ৩ লাখ, গোপালগঞ্জ জেলায় ৩ লাখ, রাজবাড়ি জেলায় ৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এটাতো শুধু ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের চিত্র। গত ২০২৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সহকারী কমিশনার (উন্নয়ন) সৈয়দা সালেহা নূর স্বাক্ষরিত টিআর প্রকল্পের প্রথম কিস্তি উপবরাদ্দ প্রদান করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক্সেভেটর দিয়ে পুকুর খনন, একটি সিড়িঁ বাঁধানো ঘাট, চারপাশে রেলিং ও ব্লক বসানো কাজে সর্বসমেত ৬০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এ প্রতিবেদক খোঁজ নিয়েছে ব্লক নেওয়া প্রতিষ্ঠান ও এক্সেভেটরের মালিকের সঙ্গে। তবে তারা এ বিষয়ে কোন কথা বা ভাউচার কপি দিতে রাজি হননি। তাদের কথায় অনেকটা গরমিল ছিলো।
যা বললেন কর্মকর্তারা
রূপগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, আমার সময়ে পুকুর সংস্কারে কোন বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তবে পুরনো ফাইল খুঁজলে হয়তো পাওয়া যাবে। পুকুর ভরাট পরিবেশসহ সবদিক দিয়ে ক্ষতি। কিন্তু আমরা বুঝাতে গেলেও তারা বুঝতে চায় না।
রূপগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প অফিসার আইমিন সুলতানা বলেন, আমি নতুন এসেছি। জানা নেই।
রূপগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আওলাদ হোসেন বলেন, উপজেলা পুকুরের তথ্য আছে। তবে কতো টাকার কাজ হয়েছে সেটা আমি জানি না। কারণ আমার পূর্ববর্তী অফিসারের সময় এটার সংস্কার হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. ফজলুল কাবীর বলেন, কেউ যদি তার পুকুর ভরাট করে ফেলে আমাদের কি করার থাকে বলেন ? আমরা বুঝানোর চেষ্টা করি। কে শুনে কার কথা!
নারায়ণগঞ্জ জেলার পরিবেশকর্মী ও কবি আরিফ বুলবুল বলেন, আইন আছে। কিন্তু প্রয়োগ নেই। একবারেই এ আইন মানা হচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনও বেশ কিছু পুকুর ভরাট করেছিলো।
নারায়ণগঞ্জ জেলার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ এইচ এম রাশেদ বলেন, সাধারণ ব্যক্তিগত পুকুর ভরাটে আমরা কোন অভিযোগ পাই না। তবে পেলে ব্যবস্থা নিবো। পুকুর ভরাটের কারণে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। তাপমাত্রা বাড়ছে।

নারায়ণগঞ্জে সাড়ে ৬ হাজার পুকুর উধাও
রাসেল আহমেদ-রূপগঞ্জ (নারায়গঞ্জ) প্রতিনিধি

নারায়ণগঞ্জ জেলার থানা পুকুর পাড়। জেলার সবার কাছেই একটা পরিচিত নাম এটি। এ পুকুর একসময় সৌন্দর্যবর্ধন করে রেখেছিলো শহরকে। অথচ খোদ সিটি কর্পোরেশন থানা পুকুর ভরাট করে ফেলে। সেখানে গড়ে তুলেছে অট্টালিকা আর ভবন। শুধু থানা পুকুরই নয়। প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত জেলা নারায়ণগঞ্জে পুকুর ভরাট এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। খাল-বিল, নদ-নদীর জেলা বলা হতো নারায়ণগঞ্জকে।
তবে গোটা জেলাজুড়ে পুকুরের আধিক্য ছিলো অনেক বেশি। পুকুরের সঠিক সংখ্যা নিয়ে রয়েছে গরমিল। এসব পুকুর এখন ভরাট চলছে। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অহরহ ভরাট করা হচ্ছে পুকুর। ভরাটের কারণে নারায়ণগঞ্জের জলবায়ুর প্রভাব ও পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। বাড়ছে তাপমাত্রা। ভূ-গর্ভস্থরের পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ভরাটের পাশাপাশি পুকুর খনন ও সংস্থারের নামে টেষ্ট রিলিফ (টিআর) ও কাজের বিনিময়ে খাদ্যের (কাবিটা) দেওয়া বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। শুধু গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের কয়েকটি জেলায় পুকুর খনন ও সংস্কারের জন্য ৬২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিলো। কোনোটা নামকাওয়াস্তে কাজ দেখিয়ে আবার কোনোটার সংস্কার না করেই টাকা নয়ছয় করা হয়েছে- এমনটাই সিটিজেন জার্নালের অনুসন্ধানে তথ্য মিলেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলায় দুই যুগ আগেও পুকুর ছিলো ১০ হাজারের বেশি। তবে এ সংখ্যা নিয়েও রয়েছে নানা মত। একেক দপ্তরের কাছে রয়েছে একেক রকম তথ্য। জেলার ওয়েবসাইটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ জেলায় পুকুর রয়েছে ৮২৩১টি। এর মধ্যে সরকারি পুকুর রয়েছে ৮৭টি। কিন্তু জেলার উপজেলা মৎস্য অফিসগুলো দেয় ভিন্ন তথ্য।
উপজেলার মৎস্য অফিস সূত্রমতে, জেলায় ৭ হাজারের ওপরে পুকুর রয়েছে। বেসরকারি একটি জরিপ সংস্থা বলছে, নারায়ণগঞ্জে দুই হাজারের ওপরে পুকুর রয়েছে। বেশ কয়েকটি উপজেলায় ঘুরে শতাধিক মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলায় দেড় হাজারের ওপরে পুকুর রয়েছে। একমাত্র আড়াইহাজার উপজেলায় এখনো অনেক পুকুর রয়েছে। বাকি উপজেলাগুলোতে কালেভদ্রে পুকুরের দেখা মিলে।
নলকূপে নেই পানি
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের উপজেলার নলকূপগুলোতে এখন আগের মতো পানি নেই। একসময় ১৫০ ফুট গভীরতার পাইপ স্থাপন করলে অনায়াসে স্বচ্ছ পানি উঠতো। এখন ৪০০ থেকে ৪৫০ ফুট পাইপ স্থাপন করার পরও পানি উঠছে না।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর কর্মকর্তারা বলছেন, ভূ-গর্ভস্থের পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণেই নলকূপে পানি উঠছে না। একটা সময় আসবে যখন পানির হাহাকার দেখা দিবে। এর কারণ হিসেবে তারা পুকুর ও জলাশয় ভরাটকে দায়ী করছেন। ফলে নারায়ণগঞ্জে গভীর নলকূপ বাড়ছে বছরের পর বছর ধরে।
রূপগঞ্জ উপজেলার জনস্বাস্থ্য অফিসের সূত্রমতে, এ উপজেলায় ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩৩০টি নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২৫১টি ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৯০টি এবং গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৪৩টি নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব নলকূপের অধিকাংশই অকেজো হয়ে গেছে কিংবা পানি উঠছে না।

আড়াইহাজার জনস্বাস্থ্য অফিস সূত্রমতে, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজস্ব প্রকল্পের আওতায় ২০০টি সাবমারসিবল পাম্পযুক্ত নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাকী উপজেলাগুলোতে একই চিত্র বিরাজমান বলে জানা গেছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, পানি উঠবে কোথা থেকে। নলকূপ নিয়েও নয়ছয় হয়। পুকুরগুলো ভরাটের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে।
রূপগঞ্জ উপজেলা জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা মুকিত হোসেন বলেন, নারায়ণগঞ্জে পানির স্তর নামার গতি অস্বাভাবিক ভাবে কমেছে। ১৯৯৫ সালে ছিলো ২৫ মিটার, ২০০৫ সালে ছিলো ৪৫ মিটার, ২০১০ সালে ছিলো ৬০ মিটার, ২০২৩ সালে ৭৫ মিটার। এভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে নেমে যেতে পারে ১২০ মিটারে।
পানির পেছনে যাচ্ছে হাজার হাজার টাকা
নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক পরিবার কিনে খাচ্ছেন পানি। এতে মাসে গড়ে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। আবার অনেক বাড়িতে বাসাভাড়া ছাড়াও পানি বাবদ আলাদা চার্জ দিতে হয়। কিন্তু সেবার মান নেই বললেই চলে।
হাজীগঞ্জ এলাকায় বসবাস করেন মনির হোসেন। পেশায় ছোটখাটো চাকুরীজীবি। মাসের মাইনে দিয়ে কোনোমতে চলে যায় সংসার। এখন তার বাড়তি খরচ পানি কেনা। তিনি বলেন, পানির পেছনে খরচ হচ্ছে হাজার টাকা। ওয়াসার যে পানি তা খাওয়াতো দূরের কথা ব্যবহারেরও অযোগ্য। ছোটবেলা দেখতাম মা পুকুরের পানি এনে ফুটিয়ে খাওয়াতো। এ পানি দিয়ে রান্নাবান্না, গোসল সব চলতো। পুকুরগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় দিন দিন পানির সংকট দেখা দিচ্ছে।
ওয়াসার পানি নিয়ে সংশয়
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরে বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছে। ওয়াসার পানি ব্যবহার করে অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার করছে। ওয়াসার পানি শুধু পান করার অযোগ্যই নয়, এ পানি দিয়ে গোসল কিংবা মুখ ধোওয়া সমস্যা হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকা ওয়াসা নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের পানি সরবরাহ কার্যক্রম শুরু করে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ৭১.৮৮ কোটি ব্যয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। পানির সংকট মোকাবেলায় সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। অথচ লাখ লাখ বাসিন্দা মাস শেষে বিল গুণছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলার আমলাপাড়া এলাকার ৬২ বছরের বাসিন্দা করম আলী বলেন, বাজান ছোটকালে আমরা পুষ্কনিতে গোসল করছি। কোনো বিল দেওন লাগে নাই। অহন বিল দেই। হেরপরেও পানি পাই না ঠিক মতন। পাইলেও পানি ভালা না। পুষ্কনি থাকলেই ভালা অইতো।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, একটু সমস্যাতো হবেই। আমরা চেষ্টা করছি যেনো এটা দ্রুত সমাধান করা যায়।
জলবায়ু ও পরিবেশ বিপর্যয়
পুকুর ভরাটের কারণে জলবায়ুর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এতে করে জলসংকট বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় তাপমাত্রা বাড়ে। পুকুর জল সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্থানীয় জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
মুড়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইসহাক মিয়া বলেন, পুকুর ভরাট হলে পানি সঞ্চয়ের ক্ষমতা কমে যায়, ফলে জলসংকট দেখা দেয়। পুকুর জলীয় বাষ্প তৈরি করে, যা বায়ুমন্ডলে তাপমাত্রাকে প্রভাবিত করে। পুকুর কমে গেলে স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হতে পারে। জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তাই পুকুর কমে গেলে জীববৈচিত্র্য হ্রাস পায়। সেচ ব্যবস্থা দুর্বল হয়, যা কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পুকুর ভরাটের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন হয়। পুকুর ভরাটের ফলে পরিবেশে কার্বন ডাই অক্সাইড এর পরিমাণ বেড়ে যায়, যা গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

নারায়ণগঞ্জের তাপমাত্রার ইতিহাস দেখা গেছে, জেলায় গড়ে তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে কোনো সময় ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। এখন থেকে দুই যুগ আগে নারায়ণগঞ্জে গড় তাপমাত্রা ছিলো ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর এখানে গড় বৃষ্টিপাত ২৩৭৬ মিলিমিটার। এর কারণ হিসাবে পুকুর ও জলাশয় ভরাটকে দায়ী করছেন ভূগোলবিদ ইসহাক মিয়া।
কমে গেছে মাছের চাহিদা
জেলা ও উপজেলার মৎস্য অফিসগুলো সূত্রমতে, নারায়ণঞ্জ জেলায় বাৎসরিক মাছের চাহিদা ৫৪ হাজার ৮৩৭ মেট্রিক টন। বাৎসরিক মাছের মোট উৎপাদন ১৮ হাজার ৬৬০ মেট্রিক টন। বাৎসরিক ঘাটতি রয়েছে ৩৬ হাজার ১৭৭ মেট্রিক টন। মৎস্য অফিসার ও মৎস্যজীবিরা বলছেন, পুকুরগুলোতে একসময় মাছের চাষ হতো। এতে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করা হতো। যতগুলো পুকুরর ভরাট করা হয়েছে তাতে নারায়ণগঞ্জে মাছের ঘাটতি অনেকটা লাগব হতো।
রূপগঞ্জ উপজেলা মৎস্য অফিসার আলমগীর হোসেন বলেন, একটা মাঝারি সাইজের পুকুরে সারা বছরে সাড়ে ৫ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। সে হিসাবে সাড়ে ৬ হাজার পুকুরে গড়ে ৩৩ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন সম্ভব হতো। ঘাটতি থাকতো ৩ হাজার মেট্রিক টন মাছ।
পুকুরে মাছ চাষ করেন এমন একজন তালাশকুর এলাকার জয়নাল মিয়া। তিনি বলেন, সারা বছরে যাবতীয় খরচ পড়ে ৪ থেকে সোয়া ৪ লাখ টাকার মতো। একটা পুকুরে সারা বছরে ৫ থেকে ৭ হাজার কেজি মাছ উৎপাদন হয়। একেবারে কমে ১৩০ টাকা দরে বিক্রি করা হলে দাম আসে সাড়ে ৭ লাখ টাকা। লাভ আসে ২ লাখ ৯০ হাজার টাকার মতো।
মৎস্যখামারী জয়নালের হিসাব অনুযায়ী, সাড়ে ৬ হাজার পুকুর থেকে গড়ে বছরে আয় হতো ১৭৪ কোটি টাকা।
পুকুর ভরাটে বালু বাণিজ্য
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুকুর ভরাটকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বালু বাণিজ্যের সিন্ডিকেট। উপজেলার প্রত্যেক এলাকায় এক শ্রেণির ঠিকাদার পুকুর ভরাটে উদ্বুদ্ধ করে। ‘পুকুর রেখে লাভ নেই, ভরাট করে ভবন কিংবা মার্কেট নির্মাণ করলে আয় হবে’ এমন লোভনীয় প্রলোভন দেখিয়ে পুকুর ভরাট করে।
বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এমন একজন ইকবাল হোসেন। কথা হয় তার সঙ্গে। তার হিসাব মতে, একবিঘা আয়তন ও দশ ফুট গভীর একটা পুকুর ভরাট করতে কমপক্ষে এক লাখ ৪০ হাজার ফুট বালুর প্রয়োজন হয়। এক ফুট বালুর জন্য সব মিলিয়ে খরচ পড়ে ১২ টাকা। সে ক্ষেত্রে একবিঘা আয়তনের পুকুর ভরাট করতে খরচ পড়ে ১৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা। সাড়ে ৬ হাজার পুকুর ভরাট করতে লেনদেন হয়েছে এক হাজার ৯২ কোটি টাকা।
স্থানীয়রা বলছেন, শহরায়ন, নগরায়ন ও অসেচতনতার কারলেই ক্রমে পুকুর ভরাট হয়ে যাচ্ছে। জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে পুকুর ভরাট করে গড়ে উঠছে বসতি।
আইন কী বলে?
জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি সব পুকুর ভরাটের একটা নীতিমালা ব্রিটিশ আমল থেকেই আছে। প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী. কোন পুকুর, জলাশয় ভরাট করা বেআইনি। আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গায় শ্রেণি পরিবর্তন বা অন্য কোনভাবে ব্যবহার, ভাড়া. ইজারা বা হস্তান্তর বেআইনি। কোন ব্যক্তি এই বিধান লঙ্ঘন করলে আইনের ৮ ও ১২ ধারা অনুযায়ী পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (২০১০ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী, যেকোন ধরনের জলাশয় ভরাট করা নিষিদ্ধ।
নারায়ণগঞ্জ জেলার আইনজীবি অ্যাডভোকেট আবুল বাশার রুবেল বলেন, নীতিমালা অনুসারে সরকারি ও বেসরকারি মালিকানাধীন কোন পুকুর ইচ্ছা করলেই ভরাট করা যাবে না। আইন লঙ্ঘন করলে শাস্তির বিধান রয়েছে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে সমস্যা
নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চলখ্যাত এলাকা। জেলা শহরসহ উপজেলাগুলোতে দেশের বড় বড় শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, নারায়ণগঞ্জে মোট শিল্প ইউনিট সংখ্যা ২৪০৯টি। রয়েছে ৩৬টি গার্মেন্টস, ১৭৫টি টেক্সটাইল, ১৮৯৫টি নিট ফ্যাক্টরি। প্রায়শ এসব শিল্পকারখানা কিংবা গার্মেন্ট শিল্পে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। শুধু শিল্পকারখানা নয়। বাসাবাড়ি কিংবা মার্কেটেও আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।
ফায়ার সার্ভিসের একটি সূত্র দাবি করেছে, গত ৫ বছরে নারায়ণগঞ্জে ১৪৩২টি আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। গত ২০২১ সালে নারায়ণগঞ্জে ৬৯৪টি আগুনের ঘটনা ঘটে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিলো ১৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। গত ২০২২ সালে ৫৯৩টি আগুনের ঘটনা ঘটে। এতে ক্ষতি হয় ৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এসব আগুনের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, আশপাশে ডোবা কিংবা পুকুর না থাকার কারণে ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়েছে। অধিকাশ শিল্পকারখানা কিংবা গার্মেন্টের সামনে নেই কোন পুকুর। ফলে আগুন লাগলে অগ্নিনির্বাপনের জন্য কোন পানির ব্যবস্থা থাকে না। পুকুর ভরাটের কারণে ফায়ার সার্ভিসের ওপড় বেশ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পুকুরগুলো অগ্নিনির্বাপণে ব্যবহৃত পানির প্রধান উৎস হিসাবে কাজ করে। তাই পুকুর ভরাট হলে আগুন নেভানোর জন্য পানির অভাব দেখা দেয়। ফলে ফায়ার সার্ভিসের কার্যকারিতা কমে যায়।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আরেফিন বলেন, পানির সংকটির কারণে আগুণ নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়। পুকুর বা জলাশয় থাকলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সহজ হয়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হয়।
পুকুর খনন-সংস্কারে দুর্নীতি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি পুকুর সংস্কারে টেষ্ট রিলিফ (টিআর) বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রতি অর্থবছরে। প্রতি অর্থবছরে একেক উপজেলায় চার থেকে পাঁচটি পুকুর সংস্কারের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হতো। এসব বরাদ্দের তালিকা প্রণয়ন করতো মৎস্য অফিস, উপজেলা জনস্বাস্থ্য অফিস, প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস ও উপজেলা প্রকৌশলী অফিস। বিগত ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে নারায়ণগঞ্জেও তিনটি উপজেলার পুকুর সংস্কারে সাড়ে ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরমধ্যে রূপগঞ্জ উপজেলার কিন্নরী রেষ্ট হাউজের পুকুর সংস্কারে ২ লাখ টাকা টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। আড়াইহাজারের রামচন্দ্রদি আশ্রায়ণ প্রকল্প সংলগ্ন সরকারি পুকুর সংস্কারে এক লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এছাড়া সোনারগাঁও উপজেলার পিরোজপুরের ইসলামপুর আশ্রায়ণ প্রকল্পের পুকুর সংস্কারের দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরেজমিনে তিনটি পুকুরে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোন খনন বা সংস্কারই হয়নি। বরাদ্দ এসেছে এটাও কেউ জানতো না। এই টাকা নেতারা গিলে ফেলেছে। ঢাকার পাশে ধামরাই, কেরানীগঞ্জ ও দোহার উপজেলার জন্য সাড়ে ৯ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছিলো। বিগত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের টেষ্ট রিলিফ (টিআর) খাত খতিয়ে দেখা গেছে, এ অর্থবছরে রাজধানী ও আশপাশের কয়েকটি জেলায় পুকুর সংস্কারে লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
ঢাকার নবাবগঞ্জ দিঘীরপাড়া খাস পুকুর, জালেশ্বর পুকুর খনন ও ধামরাই পুকুর সংস্কারে সাড়ে ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গাজীপুরের আউচপাড়া খাস পুকুর সংস্কার বাবদ ৩ লাখ টাকা, নরসিংদী জেলার সাগরদী খাস পুকুর, রায়পুরা ধুকুন্দিরচর পুকুর, মনোহরদী জামালপুর পুকুর ও শিবপুর আলিায়াবাদ পুকুর সংস্কার বাবদ ৪ লাখ টাকা, মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলা ভূমি অফিসের খাস পুকুর, সদর উপজেলার পঞ্চসার খাস পুকুর, আবদুল্লাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের পুকুর সংস্কার বাবদ ৬ লাখ টাকা, মানিকগঞ্জ জেলার দাশড়া খাস পুকুর, সাটুরিয়া ধানকোড়া খাস পুকুর, সাটুরিয়া জগন্নাথপুর খাস পুকুর, সিংগাইর আঠালিয়া খাস পুকুর, সিংগাইর আঠালিয়া খাস পুকুর-২ সংস্কার বাবদ ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা, টাঙ্গাইল জেলার ডিসি পুকুর, নাগরপুর উপেন্দ্রে সরোবর পুকুর, আকুর টাকুর পুকুর, ধুল পুকুর, ধুল পুকুর-২ সংস্কার বাবদ ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
একইভাবে কিশোরগঞ্জ জেলায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা, ফরিদপুর জেলায় ৬ লাখ ২৮ হাজার, মাদারীপুর জেলায় ৬ লাখ টাকা, শরীয়তপুর জেলায় ৩ লাখ, গোপালগঞ্জ জেলায় ৩ লাখ, রাজবাড়ি জেলায় ৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এটাতো শুধু ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের চিত্র। গত ২০২৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সহকারী কমিশনার (উন্নয়ন) সৈয়দা সালেহা নূর স্বাক্ষরিত টিআর প্রকল্পের প্রথম কিস্তি উপবরাদ্দ প্রদান করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক্সেভেটর দিয়ে পুকুর খনন, একটি সিড়িঁ বাঁধানো ঘাট, চারপাশে রেলিং ও ব্লক বসানো কাজে সর্বসমেত ৬০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এ প্রতিবেদক খোঁজ নিয়েছে ব্লক নেওয়া প্রতিষ্ঠান ও এক্সেভেটরের মালিকের সঙ্গে। তবে তারা এ বিষয়ে কোন কথা বা ভাউচার কপি দিতে রাজি হননি। তাদের কথায় অনেকটা গরমিল ছিলো।
যা বললেন কর্মকর্তারা
রূপগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, আমার সময়ে পুকুর সংস্কারে কোন বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তবে পুরনো ফাইল খুঁজলে হয়তো পাওয়া যাবে। পুকুর ভরাট পরিবেশসহ সবদিক দিয়ে ক্ষতি। কিন্তু আমরা বুঝাতে গেলেও তারা বুঝতে চায় না।
রূপগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প অফিসার আইমিন সুলতানা বলেন, আমি নতুন এসেছি। জানা নেই।
রূপগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আওলাদ হোসেন বলেন, উপজেলা পুকুরের তথ্য আছে। তবে কতো টাকার কাজ হয়েছে সেটা আমি জানি না। কারণ আমার পূর্ববর্তী অফিসারের সময় এটার সংস্কার হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. ফজলুল কাবীর বলেন, কেউ যদি তার পুকুর ভরাট করে ফেলে আমাদের কি করার থাকে বলেন ? আমরা বুঝানোর চেষ্টা করি। কে শুনে কার কথা!
নারায়ণগঞ্জ জেলার পরিবেশকর্মী ও কবি আরিফ বুলবুল বলেন, আইন আছে। কিন্তু প্রয়োগ নেই। একবারেই এ আইন মানা হচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনও বেশ কিছু পুকুর ভরাট করেছিলো।
নারায়ণগঞ্জ জেলার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ এইচ এম রাশেদ বলেন, সাধারণ ব্যক্তিগত পুকুর ভরাটে আমরা কোন অভিযোগ পাই না। তবে পেলে ব্যবস্থা নিবো। পুকুর ভরাটের কারণে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। তাপমাত্রা বাড়ছে।




